নেপালে জেন জি আন্দোলনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। আন্দোলনের প্রথম বার্ষিকীতে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি বলেছেন, শুধু সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয় না। স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন সুশাসন, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন।
গত বছরের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর নেপালজুড়ে ছড়িয়ে পড়া জেন জি আন্দোলনের প্রথম বার্ষিকী মঙ্গলবার পালন করা হচ্ছে। আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে সরকার ৮ সেপ্টেম্বরকে ‘জেন জি শহীদ দিবস’ ঘোষণা করেছে এবং দিনটিকে সরকারি ছুটি হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা থেকে বৃহত্তর আন্দোলন
প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোতে সরকারের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ থেকেই আন্দোলনের সূচনা। তবে দ্রুতই তা দুর্নীতি, রাজনৈতিক সুবিধাভোগ, স্বজনপ্রীতি, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির ঘাটতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিক্ষোভে রূপ নেয়।
কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন শহরে হাজারো তরুণ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। তাদের দাবির মধ্যে ছিল সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিকদের প্রতি আরও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা।
৮ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নেয়। এতে অন্তত ১৯ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। সহিংসতার মাত্রা বাড়তে থাকায় জনরোষও তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

‘সুশাসন ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়’
আন্দোলনের এক বছর পর দেওয়া এক বিবৃতিতে কার্কি নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। তিনি বলেন, গত বছরের ঘটনাগুলো রাজনৈতিক নেতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে সুশাসন উন্নত করা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
কার্কির ভাষ্য, ‘সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও সুশাসন ছাড়া স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।’ অর্থাৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি কেবল সংসদে ক্ষমতাসীনদের আসনসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং নাগরিকদের প্রত্যাশার প্রতি কীভাবে সাড়া দেওয়া হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান, যাতে ভবিষ্যতে এমন সহিংস পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
সহিংসতার ক্ষত ও নতুন সংকট
আন্দোলনের সময় সরকারি-বেসরকারি সম্পদের পাশাপাশি জাতীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও স্মৃতিসৌধের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কার্কি। তার মতে, আন্দোলনের বেদনাদায়ক পরিণতি ভুলে গেলে চলবে না।

গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর গঠিত সরকার এখন আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত দাবিগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। দুর্নীতি, সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ ছিল আন্দোলনের অন্যতম চালিকা শক্তি।
কার্কি সরকারকে সুশাসন জোরদার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে গত ২৬ আগস্টের ভোতেকোশি বন্যা নেপালের সামনে নতুন মানবিক সংকট তৈরি করেছে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার এক বছরের মধ্যেই এই দুর্যোগ সরকারকে আরেকটি বড় পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
কার্কি এই সংকটে ধৈর্য, দায়িত্বশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নাগরিকদের পরস্পরের পাশে দাঁড়ানো এবং দেশকে পুনরুদ্ধারে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















