০২:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
জুনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৬৩, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা চট্টগ্রাম বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে ঢাকার সড়ক অবরোধ, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও চাইলেন শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলায় ইরানের ছয় শহর লক্ষ্যবস্তু, উপকূলীয় সামরিক সক্ষমতায় আঘাত বিশ্ব যখন আমেরিকার ঝুঁকি কমাতে চায় অং সান সু চি কি মারা গেছেন? তিন বছরের বেশি সময়েও রহস্য কাটেনি, বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ‘৩৮ বছরে এলাকায় বন্যার এমন পানি দেখি নাই’ শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরার’ বাস্তবতা কতটা? যুক্তরাষ্ট্রে হিস্পানিকদের পরিচয় নিয়ে নতুন চিত্র, ‘আমেরিকান’ ভাবনায় বিভক্ত জনগোষ্ঠী যুক্তরাজ্যে ভয়াবহ দাবানল, ঘর ছাড়তে বাধ্য শত শত মানুষ ফাইনালের আগে ফাইনাল! বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ফ্রান্স-স্পেন মহারণ

শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরার’ বাস্তবতা কতটা?

রয়টার্সকে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা বেশ আলোড়ন তুলেছে রাজনীতির মাঠে। এনিয়ে ইতোমধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

কিন্তু একদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় খোদ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রমও নিষিদ্ধের মতো প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার ফিরতে পারার মতো পরিস্থিতি আদৌ কতটা রয়েছে, তা নিয়েও আছে নানা ধরনের আলোচনা।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক জনরোষের মুখে দেশ ছাড়তে হয়েছিল আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ নেতাকে। দুই বছর পর এসে সেই পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবার কোনো নজির নেই।

ফলে শেখ হাসিনা জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে যে কথা বলছেন, তার জোরালো ভিত্তি নেই বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতাই দলটির রাজনীতিতে ফেরার একমাত্র উপায় বলে মত তাদের।

এছাড়া শেখ হাসিনা যে সময়সীমা দিয়েছেন, তা আসতে এখনও আরও পাঁচ মাস বাকি।

ফলে তার দেশে ফেরার এই দাবি অনেকের ভাষ্যমতে কেবলই ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’, নাকি আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে সক্রিয় করার কৌশল – তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।

টিএসসিতে মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা  শেখ হাসিনার ম্যুরাল

আওয়ামী লীগ নেতারা এখনও সরকারের পতনের পেছনে ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্বকেই হাজির করছেন

শেখ হাসিনার ফেরার ক্ষেত্রে সামগ্রিক পরিস্থিতি ‘সম্পূর্ণ বৈরি’

গত বছরের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভারতে আশ্রয় নেয়া আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

তার আগে একই বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।

নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর জাতীয় সংসদেও সেই অধ্যাদেশ অনুমোদন হয়। স্বাভাবিকভাবেই দেশের ভেতরে দলটির কার্যক্রম চালানো আইন অনুযায়ী সম্ভব নয়।

ফলে তার বাংলাদেশে ফেরার মতো পরিস্থিতি কি আদৌ তৈরি হয়েছে?

সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জুর মতে, “বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে” ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই দেশের বাইরে।

এছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় যেমন দলটির তৎপরতা চালানো সম্ভব নয়, একইসাথে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে চলা মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার দিকটি মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ বৈরি’ বলেই মনে করছেন তিনি।

“বর্তমান পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য এবং শেখ হাসিনার ফেরার জন্য খুবই খুবই প্রতিকূল”, বলেন মি. মঞ্জু।

এছাড়া প্রায় দুই বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবার পর থেকেই এর সাথে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে মামলা ও গ্রেফতারের খবর এসেছে গণমাধ্যমে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দেশের ভেতরে থাকা অনেক নেতাকর্মীই এখনও আত্মগোপনে রয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন সময় দলকে সক্রিয় করতে বের করা ঝটিকা মিছিল থেকেও আটক হয়েছেন অনেকে।

২০২৪ সালে হাতে ব্যানার নিয়ে আন্দোলনকারীরা

ব্যাপক জনরোষের মুখে পতন হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের

এমন প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার দাবি আদৌ কতটা বাস্তব, উঠছে সে প্রশ্নও।

যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বীর আহমেদ বলেন “শেখ হাসিনার ফেরা আর আওয়ামী লীগের ফেরা দুটা আলাদা জিনিস”।

আইন করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় দলটিকে রাজনীতির মাঠে ফিরতে হলে আইনি মোকাবিলার মাধ্যমেই ফিরতে হবে। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়।

ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে তাকে বিচারের আওতায় আনার দাবির বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই সরব বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

ফলে শেখ হাসিনা আসলে তাকে বাধা দেয়ার কোনো কারণ নেই বলেই মত অধ্যাপক আহমেদের।

এছাড়া গণমাধ্যমে সরাসরি নিজেই ফেরার কথা জানানোর ‘অন্তর্নিহিত তাৎপর্য’ আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, “দেশে ফেরার ক্ষেত্রে উনি হয়তো ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে একটা চাপ সরকারের ওপর ক্রিয়েট করতে পারেন”।

বাম থেকে ডানে - বাংলাদেশের বর্তমানে সক্রিয় তিন দল জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির লোগো

কোনো কোনো দল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারের কথা বলছে, কোনো দল আবার ষড়যন্ত্র দেখছে

দরকার সমঝোতার রাজনীতি

গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দলনকারীদের ওপর গুলি বর্ষণসহ নানা কারণে জনরোষের মুখে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা। অনেকের মতে, প্রাণ বাঁচাতে সেসময় দেশ ছাড়তে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে।

দুই বছর পর এসে সেই পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবার কোনো উদাহরণ নেই।

ফলে রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে যে কথা বলেছেন, তার জোরালো ভিত্তি নেই বলেও মনে করছেন অনেকে।

তারা বলছেন, এমন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সমঝোতাই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার একমাত্র উপায়।

কিন্তু তা করতে হলে যে উপায়ে দলটির নেতাকর্মীদের এগোতে হবে, তার একেবারে ভিন্ন দিকে তারা হাঁটছেন বলেই মত বিশ্লেষকদের।

জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি সরাসরি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে বলে মনে করেন অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ, যার একটি আওয়ামী লীগপন্থি আর অন্যটি আওয়ামী লীগবিরোধী।

“পুরো এন্টি আওয়ামী লীগ গ্রুপটা আওয়ামী লীগকে ফেরত চায় না। এখন তাদেরকেতো আপনার চাওয়াইতে হবে। আপনি ফিরতে হলেতো এদের সাথে থাকতে হবে। তারা যদি আপনাকে দাঁড়াইতে না দেয়, তাহলে আপনি কীভাবে আসবেন? কীভাবে আপনি রাজনীতি করবেন?”, বলছিলেন তিনি।

সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু

সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু

এছাড়া বাংলাদেশে দলটির ৩০ শতাংশ অনুগত সমর্থক আছে বলে ধরে নিলেও বাকি ৭০ শতাংশ তাদের বিরুদ্ধে আছে। ফলে ‘অস্তিত্ব সংকটে’ থাকায় সেই ৩০ শতাংশ এই মুহূর্তে একত্রিত হয়েও শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে পারার বাস্তবতা নেই বলে মনে করেন এই রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক আহমেদ।

“স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরতে হলে সমঝোতার রাজনীতিতে আসতে হবে। কিন্তু কখন কীভাবে সেই রাজনীতিটা হবে, সেটা সময় বলে দেবে”, বলেন অধ্যাপক আহমেদ।

অবশ্য আছে ভিন্নমতও। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু বলছেন, শেখ হাসিনার ফিরতে চাওয়ার পরিকল্পনা তার ‘রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ’।

“সবকিছু অনুকূল হয়ে যাবে, প্রস্তুত হয়ে যাবে, তারপর আন্দোলন হবে- তা নয়। আন্দোলনতো ধারাবাহিক। তিনি যদি এই ডিসেম্বরে না আসতে পারেন, পরিস্থিতি হয়তো এমন হলো যে তিনি আসতে পারলেন না, তিনি আরেকটা তারিখ দিলেন, সেটাও হচ্ছে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা”, বলছিলেন তিনি।

এমনকি গত দুই বছরে মুক্তিযুদ্ধের ওপর যেভাবে আঘাত এসেছে, সেখান থেকে জনসাধারণের অনেকের কাছেই শেখ হাসিনার যেসব রাজনৈতিক ভুল ছিল, সেগুলোর গুরুত্ব কমে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যেতে হবে আইনি পন্থায়

শেখ হাসিনার ফেরার পরিকল্পনা গণমাধ্যমে আসার পরপরই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “আমি মনে করি না এটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু। এটা মূলত একটা প্রোপাগান্ডার অংশ। শেখ হাসিনা যদি, দেশে ফিরে কেবল ফিরবে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য”।

আইনজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো সময় ফিরে আত্মসমর্পন করতে পারবেন শেখ হাসিনা

আইনজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো সময় ফিরে আত্মসমর্পন করতে পারবেন শেখ হাসিনা

এদিকে শেখ হাসিনা “আসছেন না, আসতে পারবেন না” বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. আসাদুজ্জামান রিপন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারাদেশে ৬৬৩টি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে কেবল হত্যা মামলাই হয়েছে ৪৫৩টি, যার একটিতে তাকে দেয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ডাদেশ।

ফলে আইনত আওয়ামী লীগের এই নেতা দেশে ফেরা মাত্রই গ্রেফতার হবেন। যদিও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলছেন, ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনা দণ্ডপ্রাপ্ত।

“ভারত সরকার তাকে দিতে পারে, নাও দিতে পারে। সো উনি স্বাধীনভাবে এসে আত্মসমর্পন করবেন, এটা আমার মনে হয় ঠিক না”, বলেন তিনি।

যদিও আইনজ্ঞরা বলছেন, রায় হবার পর আপিলের নির্ধারিত সময় পার হলেও শেখ হাসিনা যখনই বাংলাদেশে ফিরে আসেন না কেন আত্মসমর্পণ করে সাজার রায়ের বিরুদ্ধে তার আপিল করার সুযোগ আছে।

মি. মঞ্জুর মতে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে অতি দ্রুত বিচারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক মহলেও গ্রহণযোগ্য হয়নি। একইসাথে এই আদালতকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে শেখ হাসিনা যে চ্যালেঞ্জ করেছেন, সেই প্রশ্ন আন্তর্জাতিকভাবেও আছে।

অন্যদিকে অধ্যাপক আহমেদ বলছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরার পর প্রথমেই তাকে আইনি লড়াইয়ে যেতে হবে।

“দলের নিষিদ্ধকরণের বিষয়ে মামলা করতে হবে। এই মুহূর্তে সরকারতো ওই উদ্যোগে যাবেই না। তাকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করবে বলেও আমার মনে হয় না”, বলেন তিনি।

বিবিসি নিউজ বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

জুনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৬৩, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা চট্টগ্রাম বিভাগে

শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরার’ বাস্তবতা কতটা?

০১:১৫:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা বেশ আলোড়ন তুলেছে রাজনীতির মাঠে। এনিয়ে ইতোমধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

কিন্তু একদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় খোদ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রমও নিষিদ্ধের মতো প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার ফিরতে পারার মতো পরিস্থিতি আদৌ কতটা রয়েছে, তা নিয়েও আছে নানা ধরনের আলোচনা।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক জনরোষের মুখে দেশ ছাড়তে হয়েছিল আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ নেতাকে। দুই বছর পর এসে সেই পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবার কোনো নজির নেই।

ফলে শেখ হাসিনা জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে যে কথা বলছেন, তার জোরালো ভিত্তি নেই বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতাই দলটির রাজনীতিতে ফেরার একমাত্র উপায় বলে মত তাদের।

এছাড়া শেখ হাসিনা যে সময়সীমা দিয়েছেন, তা আসতে এখনও আরও পাঁচ মাস বাকি।

ফলে তার দেশে ফেরার এই দাবি অনেকের ভাষ্যমতে কেবলই ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’, নাকি আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে সক্রিয় করার কৌশল – তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।

টিএসসিতে মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা  শেখ হাসিনার ম্যুরাল

আওয়ামী লীগ নেতারা এখনও সরকারের পতনের পেছনে ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্বকেই হাজির করছেন

শেখ হাসিনার ফেরার ক্ষেত্রে সামগ্রিক পরিস্থিতি ‘সম্পূর্ণ বৈরি’

গত বছরের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভারতে আশ্রয় নেয়া আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

তার আগে একই বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।

নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর জাতীয় সংসদেও সেই অধ্যাদেশ অনুমোদন হয়। স্বাভাবিকভাবেই দেশের ভেতরে দলটির কার্যক্রম চালানো আইন অনুযায়ী সম্ভব নয়।

ফলে তার বাংলাদেশে ফেরার মতো পরিস্থিতি কি আদৌ তৈরি হয়েছে?

সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জুর মতে, “বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে” ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই দেশের বাইরে।

এছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় যেমন দলটির তৎপরতা চালানো সম্ভব নয়, একইসাথে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে চলা মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার দিকটি মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ বৈরি’ বলেই মনে করছেন তিনি।

“বর্তমান পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য এবং শেখ হাসিনার ফেরার জন্য খুবই খুবই প্রতিকূল”, বলেন মি. মঞ্জু।

এছাড়া প্রায় দুই বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবার পর থেকেই এর সাথে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে মামলা ও গ্রেফতারের খবর এসেছে গণমাধ্যমে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দেশের ভেতরে থাকা অনেক নেতাকর্মীই এখনও আত্মগোপনে রয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন সময় দলকে সক্রিয় করতে বের করা ঝটিকা মিছিল থেকেও আটক হয়েছেন অনেকে।

২০২৪ সালে হাতে ব্যানার নিয়ে আন্দোলনকারীরা

ব্যাপক জনরোষের মুখে পতন হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের

এমন প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার দাবি আদৌ কতটা বাস্তব, উঠছে সে প্রশ্নও।

যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বীর আহমেদ বলেন “শেখ হাসিনার ফেরা আর আওয়ামী লীগের ফেরা দুটা আলাদা জিনিস”।

আইন করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় দলটিকে রাজনীতির মাঠে ফিরতে হলে আইনি মোকাবিলার মাধ্যমেই ফিরতে হবে। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়।

ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে তাকে বিচারের আওতায় আনার দাবির বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই সরব বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

ফলে শেখ হাসিনা আসলে তাকে বাধা দেয়ার কোনো কারণ নেই বলেই মত অধ্যাপক আহমেদের।

এছাড়া গণমাধ্যমে সরাসরি নিজেই ফেরার কথা জানানোর ‘অন্তর্নিহিত তাৎপর্য’ আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, “দেশে ফেরার ক্ষেত্রে উনি হয়তো ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে একটা চাপ সরকারের ওপর ক্রিয়েট করতে পারেন”।

বাম থেকে ডানে - বাংলাদেশের বর্তমানে সক্রিয় তিন দল জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির লোগো

কোনো কোনো দল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারের কথা বলছে, কোনো দল আবার ষড়যন্ত্র দেখছে

দরকার সমঝোতার রাজনীতি

গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দলনকারীদের ওপর গুলি বর্ষণসহ নানা কারণে জনরোষের মুখে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা। অনেকের মতে, প্রাণ বাঁচাতে সেসময় দেশ ছাড়তে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে।

দুই বছর পর এসে সেই পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবার কোনো উদাহরণ নেই।

ফলে রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে যে কথা বলেছেন, তার জোরালো ভিত্তি নেই বলেও মনে করছেন অনেকে।

তারা বলছেন, এমন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সমঝোতাই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার একমাত্র উপায়।

কিন্তু তা করতে হলে যে উপায়ে দলটির নেতাকর্মীদের এগোতে হবে, তার একেবারে ভিন্ন দিকে তারা হাঁটছেন বলেই মত বিশ্লেষকদের।

জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি সরাসরি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে বলে মনে করেন অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ, যার একটি আওয়ামী লীগপন্থি আর অন্যটি আওয়ামী লীগবিরোধী।

“পুরো এন্টি আওয়ামী লীগ গ্রুপটা আওয়ামী লীগকে ফেরত চায় না। এখন তাদেরকেতো আপনার চাওয়াইতে হবে। আপনি ফিরতে হলেতো এদের সাথে থাকতে হবে। তারা যদি আপনাকে দাঁড়াইতে না দেয়, তাহলে আপনি কীভাবে আসবেন? কীভাবে আপনি রাজনীতি করবেন?”, বলছিলেন তিনি।

সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু

সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু

এছাড়া বাংলাদেশে দলটির ৩০ শতাংশ অনুগত সমর্থক আছে বলে ধরে নিলেও বাকি ৭০ শতাংশ তাদের বিরুদ্ধে আছে। ফলে ‘অস্তিত্ব সংকটে’ থাকায় সেই ৩০ শতাংশ এই মুহূর্তে একত্রিত হয়েও শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে পারার বাস্তবতা নেই বলে মনে করেন এই রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক আহমেদ।

“স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরতে হলে সমঝোতার রাজনীতিতে আসতে হবে। কিন্তু কখন কীভাবে সেই রাজনীতিটা হবে, সেটা সময় বলে দেবে”, বলেন অধ্যাপক আহমেদ।

অবশ্য আছে ভিন্নমতও। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু বলছেন, শেখ হাসিনার ফিরতে চাওয়ার পরিকল্পনা তার ‘রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ’।

“সবকিছু অনুকূল হয়ে যাবে, প্রস্তুত হয়ে যাবে, তারপর আন্দোলন হবে- তা নয়। আন্দোলনতো ধারাবাহিক। তিনি যদি এই ডিসেম্বরে না আসতে পারেন, পরিস্থিতি হয়তো এমন হলো যে তিনি আসতে পারলেন না, তিনি আরেকটা তারিখ দিলেন, সেটাও হচ্ছে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা”, বলছিলেন তিনি।

এমনকি গত দুই বছরে মুক্তিযুদ্ধের ওপর যেভাবে আঘাত এসেছে, সেখান থেকে জনসাধারণের অনেকের কাছেই শেখ হাসিনার যেসব রাজনৈতিক ভুল ছিল, সেগুলোর গুরুত্ব কমে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যেতে হবে আইনি পন্থায়

শেখ হাসিনার ফেরার পরিকল্পনা গণমাধ্যমে আসার পরপরই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “আমি মনে করি না এটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু। এটা মূলত একটা প্রোপাগান্ডার অংশ। শেখ হাসিনা যদি, দেশে ফিরে কেবল ফিরবে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য”।

আইনজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো সময় ফিরে আত্মসমর্পন করতে পারবেন শেখ হাসিনা

আইনজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো সময় ফিরে আত্মসমর্পন করতে পারবেন শেখ হাসিনা

এদিকে শেখ হাসিনা “আসছেন না, আসতে পারবেন না” বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. আসাদুজ্জামান রিপন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারাদেশে ৬৬৩টি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে কেবল হত্যা মামলাই হয়েছে ৪৫৩টি, যার একটিতে তাকে দেয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ডাদেশ।

ফলে আইনত আওয়ামী লীগের এই নেতা দেশে ফেরা মাত্রই গ্রেফতার হবেন। যদিও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলছেন, ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনা দণ্ডপ্রাপ্ত।

“ভারত সরকার তাকে দিতে পারে, নাও দিতে পারে। সো উনি স্বাধীনভাবে এসে আত্মসমর্পন করবেন, এটা আমার মনে হয় ঠিক না”, বলেন তিনি।

যদিও আইনজ্ঞরা বলছেন, রায় হবার পর আপিলের নির্ধারিত সময় পার হলেও শেখ হাসিনা যখনই বাংলাদেশে ফিরে আসেন না কেন আত্মসমর্পণ করে সাজার রায়ের বিরুদ্ধে তার আপিল করার সুযোগ আছে।

মি. মঞ্জুর মতে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে অতি দ্রুত বিচারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক মহলেও গ্রহণযোগ্য হয়নি। একইসাথে এই আদালতকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে শেখ হাসিনা যে চ্যালেঞ্জ করেছেন, সেই প্রশ্ন আন্তর্জাতিকভাবেও আছে।

অন্যদিকে অধ্যাপক আহমেদ বলছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরার পর প্রথমেই তাকে আইনি লড়াইয়ে যেতে হবে।

“দলের নিষিদ্ধকরণের বিষয়ে মামলা করতে হবে। এই মুহূর্তে সরকারতো ওই উদ্যোগে যাবেই না। তাকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করবে বলেও আমার মনে হয় না”, বলেন তিনি।

বিবিসি নিউজ বাংলা