০৩:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
ডিবি হেফাজতে হত্যা মামলার আসামির মৃত্যু, পুলিশের দাবি আত্মহত্যা পিপিপি প্রধান বিলাওয়ালের বক্তব্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে, সতর্ক করলেন রানা সানাউল্লাহ দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি বিক্ষোভে নারকেল বিতরণ, এক ব্যক্তির মানবিক উদ্যোগে সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসার ঢল যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান, ইন্ডিগো বিমানে যাত্রীর বক্তব্য ভাইরাল দিল্লিতে ‘চলো সংসদ’ মিছিল ঘিরে উত্তেজনা: লাঠিচার্জ, কড়া নিরাপত্তা, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় কেন্দ্র এডিবির নাম-লোগো ব্যবহার করে ঋণের প্রতারণা, বাংলাদেশে সতর্কবার্তা জারি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মঙ্গলবার ৮ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না, পাইপলাইন বদলাবে তিতাস সিলেটে হামে মৃত্যু বেড়ে ১০৩, একদিনে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৬৫ ভিসানীতিতে পরিবর্তন- জটিলতায় পড়তে পারেন যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা? পক্ষপাতিত্বের গুজব, রেফারিংয়ে সুবিধার বিতর্কের বিশ্বকাপ জেতা হলো না আর্জেন্টিনার

মিয়ানমারের যুদ্ধে মৃত্যু কি শুধু সংখ্যা, নাকি মানুষের মূল্যও বহন করে?

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে—সংঘাতকে বোঝার চেয়ে মৃত্যুকে গোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। কতজন নিহত হলো, কোন পক্ষ কতজনকে হত্যা করল, কোন হামলায় কত প্রাণ গেল—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো কখনোই পুরো বাস্তবতাকে ধারণ করে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর সংখ্যাই এমন এক রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত হয়েছে, যা মানুষের জীবনের সমান মূল্যকে আড়াল করে দেয়।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রথম দিকেই এমন একটি ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে সেনাবাহিনী ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। বলা হচ্ছিল, নতুন যোদ্ধা প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে বেশি, সামরিক বাহিনীর নিয়োগ কমছে, বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষের ব্যাপক মৃত্যু শাসকগোষ্ঠীর মরিয়া অবস্থার প্রমাণ, আর সহিংসতার মূল দায়ও প্রায় একচেটিয়াভাবে সেনাবাহিনীর।

এই বিশ্লেষণের ভেতরে সত্যের অংশ অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন যুদ্ধের অন্য বাস্তবতাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। যদি কোনো পক্ষের হাতে সংঘটিত অপরাধ নিয়ে নীরবতা থাকে, তাহলে সংঘাতের নৈতিক মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

মিয়ানমারের যুদ্ধকে বোঝার জন্য দুটি প্রশ্ন জরুরি। প্রথমত, মানুষ কীভাবে এবং কেন মারা যাচ্ছে? দ্বিতীয়ত, সব মৃত্যুর প্রতি কি একই ধরনের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?

সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানের পর থেকে নিহতের সংখ্যা এক লাখ অতিক্রম করেছে। সংখ্যাটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংখ্যা আমাদের আসলে কী জানায়?

How the Coup Turned Myanmar Into Asia's Deadliest Conflict | Council on  Foreign Relations

এই এক লাখ মানুষের কতজন বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন? কতজন গোলন্দাজ হামলায়? কতজন স্থলযুদ্ধে? কতজন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার? আবার কতজন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক, আর কতজন যুদ্ধরত পক্ষের সদস্য?

এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর নির্ভরযোগ্য উত্তর আজও অনুপস্থিত।

মিয়ানমারের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে তথ্য সংগ্রহ কখনোই সহজ নয়। সেনাবাহিনীর নিজস্ব ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কতটা নির্ভুল, তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য বদলে যায়, কমে যায় বা অতিরঞ্জিত হয়। বেসামরিক হতাহতের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি নথি আছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং নতুন প্রতিরোধ বাহিনীগুলোও নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি প্রকাশে অনীহ। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজেদের কারণে যদি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়—ভূমিমাইন, ভুল গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে—সেসব তথ্যও সচরাচর প্রকাশ পায় না।

ফলে যুদ্ধের তথ্যভান্ডার অসম্পূর্ণই থেকে যায়। যা পাওয়া যায়, তার বড় অংশই অনুমান, আংশিক তথ্য কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বিবরণ।

আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, মিয়ানমারের সংঘাতকে প্রায়ই ২০২১ সাল থেকে শুরু হয়েছে বলে উপস্থাপন করা হয়। অথচ দেশটি সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। সেই দীর্ঘ ইতিহাসে কত মানুষ নিহত হয়েছে, কতজন অনাহার, রোগ, বাস্তুচ্যুতি কিংবা যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে প্রাণ হারিয়েছে—তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব কখনোই তৈরি হয়নি।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বাদ দিলে বর্তমান সংঘাতের প্রকৃত গভীরতাও আড়ালে থেকে যায়।

যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো, সব মৃত্যুকে সমানভাবে দেখা হয় না। কিছু মৃত্যু দ্রুত আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়, কিছু মৃত্যু প্রায় নথিভুক্তই হয় না।

The war in Myanmar is now Asia's deadliest conflict and a nearly unequalled  humanitarian catastrophe with more than 100,000 killed, according to a  conflict-monitoring group. The rest of the world has decided

সামরিক বাহিনীর হামলায় নিহত বেসামরিক মানুষের মৃত্যু নিঃসন্দেহে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। কিন্তু তাই বলে প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে নিহত কোনো নিরীহ মানুষের মৃত্যু কি কম গুরুত্বপূর্ণ?

নৈতিকতার প্রশ্নে উত্তরটি হওয়া উচিত—না।

কিন্তু বাস্তবে জনপরিসর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে প্রতিরোধ বাহিনীর সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকেও রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখা হয়। যেন যুদ্ধক্ষেত্রে একটি পক্ষের অপরাধ নিয়ে কথা বললে অন্য পক্ষের অপরাধকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি শেষ পর্যন্ত মানবাধিকারের মৌলিক নীতিকেই দুর্বল করে। কারণ আইনের শাসন এবং জবাবদিহি কখনোই পক্ষভেদে পরিবর্তিত হওয়ার কথা নয়। যে-ই অপরাধ করুক, যে-ই বেসামরিক মানুষকে হত্যা করুক, বিচার ও দায়বদ্ধতার দাবি একই হওয়া উচিত।

এই নৈতিক বৈপরীত্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের ক্ষেত্রে।

২০২৪ সাল থেকে হাজার হাজার তরুণকে জোর করে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়েছে। অনেকেই প্রশিক্ষণ শেষ করেই যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই তাদের মানবঢাল বা প্রায় আত্মঘাতী আক্রমণে ব্যবহারের খবর এসেছে।

অথচ একই সময়ে প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে বিপুলসংখ্যক সেনা নিহত হওয়ার সংবাদও অনেক ক্ষেত্রে বিজয়ের ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে।

এখানে একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন উঠে আসে। যে তরুণটি কয়েক মাস আগে জোর করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিল, সে যদি পরে যুদ্ধে নিহত হয়, তবে কি সে কেবল শত্রুপক্ষের একজন সৈনিক? নাকি সে একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় জবরদস্তিরও শিকার?

UN Urged To Hear Myanmar's 'Desperate Pleas' | The ASEAN Post

তার পরিচয় কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। সে কারও সন্তান, ভাই কিংবা বন্ধু।

একইভাবে বহু দশক ধরে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের জোরপূর্বক নিয়োগ, এমনকি শিশুসৈনিক ব্যবহারের ঘটনাও সংঘাতের আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।

সংঘাত বিশ্লেষণে তথ্যভিত্তিক গবেষণার বিকল্প নেই। কিন্তু সংখ্যার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কখনোই মানুষের অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা এবং নৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

মিয়ানমারের যুদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি প্রাণের মূল্য তার রাজনৈতিক পরিচয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। বেসামরিক মানুষ, জোরপূর্বক নিয়োগ পাওয়া তরুণ, বিদ্রোহী যোদ্ধা কিংবা রাষ্ট্রের সৈনিক—প্রত্যেক মৃত্যুর পেছনেই একটি মানবজীবন রয়েছে।

যুদ্ধের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব, যখন আমরা শুধু কতজন মারা গেছে তা নয়, কেন মারা গেছে, কারা দায়ী, আর সব মানুষের জীবনকে সমান মর্যাদায় দেখতে পারছি কি না—সেই প্রশ্নগুলোকেও সমান গুরুত্ব দেব।

জনপ্রিয় সংবাদ

ডিবি হেফাজতে হত্যা মামলার আসামির মৃত্যু, পুলিশের দাবি আত্মহত্যা

মিয়ানমারের যুদ্ধে মৃত্যু কি শুধু সংখ্যা, নাকি মানুষের মূল্যও বহন করে?

১০:০০:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে—সংঘাতকে বোঝার চেয়ে মৃত্যুকে গোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। কতজন নিহত হলো, কোন পক্ষ কতজনকে হত্যা করল, কোন হামলায় কত প্রাণ গেল—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো কখনোই পুরো বাস্তবতাকে ধারণ করে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর সংখ্যাই এমন এক রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত হয়েছে, যা মানুষের জীবনের সমান মূল্যকে আড়াল করে দেয়।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রথম দিকেই এমন একটি ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে সেনাবাহিনী ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। বলা হচ্ছিল, নতুন যোদ্ধা প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে বেশি, সামরিক বাহিনীর নিয়োগ কমছে, বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষের ব্যাপক মৃত্যু শাসকগোষ্ঠীর মরিয়া অবস্থার প্রমাণ, আর সহিংসতার মূল দায়ও প্রায় একচেটিয়াভাবে সেনাবাহিনীর।

এই বিশ্লেষণের ভেতরে সত্যের অংশ অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন যুদ্ধের অন্য বাস্তবতাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। যদি কোনো পক্ষের হাতে সংঘটিত অপরাধ নিয়ে নীরবতা থাকে, তাহলে সংঘাতের নৈতিক মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

মিয়ানমারের যুদ্ধকে বোঝার জন্য দুটি প্রশ্ন জরুরি। প্রথমত, মানুষ কীভাবে এবং কেন মারা যাচ্ছে? দ্বিতীয়ত, সব মৃত্যুর প্রতি কি একই ধরনের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?

সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানের পর থেকে নিহতের সংখ্যা এক লাখ অতিক্রম করেছে। সংখ্যাটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংখ্যা আমাদের আসলে কী জানায়?

How the Coup Turned Myanmar Into Asia's Deadliest Conflict | Council on  Foreign Relations

এই এক লাখ মানুষের কতজন বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন? কতজন গোলন্দাজ হামলায়? কতজন স্থলযুদ্ধে? কতজন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার? আবার কতজন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক, আর কতজন যুদ্ধরত পক্ষের সদস্য?

এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর নির্ভরযোগ্য উত্তর আজও অনুপস্থিত।

মিয়ানমারের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে তথ্য সংগ্রহ কখনোই সহজ নয়। সেনাবাহিনীর নিজস্ব ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কতটা নির্ভুল, তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য বদলে যায়, কমে যায় বা অতিরঞ্জিত হয়। বেসামরিক হতাহতের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি নথি আছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং নতুন প্রতিরোধ বাহিনীগুলোও নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি প্রকাশে অনীহ। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজেদের কারণে যদি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়—ভূমিমাইন, ভুল গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে—সেসব তথ্যও সচরাচর প্রকাশ পায় না।

ফলে যুদ্ধের তথ্যভান্ডার অসম্পূর্ণই থেকে যায়। যা পাওয়া যায়, তার বড় অংশই অনুমান, আংশিক তথ্য কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বিবরণ।

আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, মিয়ানমারের সংঘাতকে প্রায়ই ২০২১ সাল থেকে শুরু হয়েছে বলে উপস্থাপন করা হয়। অথচ দেশটি সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। সেই দীর্ঘ ইতিহাসে কত মানুষ নিহত হয়েছে, কতজন অনাহার, রোগ, বাস্তুচ্যুতি কিংবা যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে প্রাণ হারিয়েছে—তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব কখনোই তৈরি হয়নি।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বাদ দিলে বর্তমান সংঘাতের প্রকৃত গভীরতাও আড়ালে থেকে যায়।

যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো, সব মৃত্যুকে সমানভাবে দেখা হয় না। কিছু মৃত্যু দ্রুত আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়, কিছু মৃত্যু প্রায় নথিভুক্তই হয় না।

The war in Myanmar is now Asia's deadliest conflict and a nearly unequalled  humanitarian catastrophe with more than 100,000 killed, according to a  conflict-monitoring group. The rest of the world has decided

সামরিক বাহিনীর হামলায় নিহত বেসামরিক মানুষের মৃত্যু নিঃসন্দেহে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। কিন্তু তাই বলে প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে নিহত কোনো নিরীহ মানুষের মৃত্যু কি কম গুরুত্বপূর্ণ?

নৈতিকতার প্রশ্নে উত্তরটি হওয়া উচিত—না।

কিন্তু বাস্তবে জনপরিসর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে প্রতিরোধ বাহিনীর সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকেও রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখা হয়। যেন যুদ্ধক্ষেত্রে একটি পক্ষের অপরাধ নিয়ে কথা বললে অন্য পক্ষের অপরাধকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি শেষ পর্যন্ত মানবাধিকারের মৌলিক নীতিকেই দুর্বল করে। কারণ আইনের শাসন এবং জবাবদিহি কখনোই পক্ষভেদে পরিবর্তিত হওয়ার কথা নয়। যে-ই অপরাধ করুক, যে-ই বেসামরিক মানুষকে হত্যা করুক, বিচার ও দায়বদ্ধতার দাবি একই হওয়া উচিত।

এই নৈতিক বৈপরীত্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের ক্ষেত্রে।

২০২৪ সাল থেকে হাজার হাজার তরুণকে জোর করে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়েছে। অনেকেই প্রশিক্ষণ শেষ করেই যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই তাদের মানবঢাল বা প্রায় আত্মঘাতী আক্রমণে ব্যবহারের খবর এসেছে।

অথচ একই সময়ে প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে বিপুলসংখ্যক সেনা নিহত হওয়ার সংবাদও অনেক ক্ষেত্রে বিজয়ের ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে।

এখানে একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন উঠে আসে। যে তরুণটি কয়েক মাস আগে জোর করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিল, সে যদি পরে যুদ্ধে নিহত হয়, তবে কি সে কেবল শত্রুপক্ষের একজন সৈনিক? নাকি সে একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় জবরদস্তিরও শিকার?

UN Urged To Hear Myanmar's 'Desperate Pleas' | The ASEAN Post

তার পরিচয় কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। সে কারও সন্তান, ভাই কিংবা বন্ধু।

একইভাবে বহু দশক ধরে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের জোরপূর্বক নিয়োগ, এমনকি শিশুসৈনিক ব্যবহারের ঘটনাও সংঘাতের আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।

সংঘাত বিশ্লেষণে তথ্যভিত্তিক গবেষণার বিকল্প নেই। কিন্তু সংখ্যার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কখনোই মানুষের অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা এবং নৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

মিয়ানমারের যুদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি প্রাণের মূল্য তার রাজনৈতিক পরিচয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। বেসামরিক মানুষ, জোরপূর্বক নিয়োগ পাওয়া তরুণ, বিদ্রোহী যোদ্ধা কিংবা রাষ্ট্রের সৈনিক—প্রত্যেক মৃত্যুর পেছনেই একটি মানবজীবন রয়েছে।

যুদ্ধের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব, যখন আমরা শুধু কতজন মারা গেছে তা নয়, কেন মারা গেছে, কারা দায়ী, আর সব মানুষের জীবনকে সমান মর্যাদায় দেখতে পারছি কি না—সেই প্রশ্নগুলোকেও সমান গুরুত্ব দেব।