জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তীব্র তাপপ্রবাহ শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্যই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। নতুন এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ুজনিত অতিরিক্ত তাপের সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ।
রোববার প্রকাশিত “Heat, Health and the Increasing Costs of Living — A Call for Action” শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে অ্যাডেলফি গ্লোবাল। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যহানি, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং পারিবারিক ব্যয়ের ওপর তার সরাসরি প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তাপপ্রবাহে কমছে আয়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ার মতো দেশে কৃষি ও নির্মাণখাতের শ্রমিকরা প্রতিবছর তাপজনিত চাপের কারণে গড়ে ২০ দিন বা তারও বেশি কর্মদিবসের সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছেন। এই দুই খাত লাখো মানুষের জীবিকার প্রধান ভিত্তি হওয়ায় আয় কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পরিবারগুলোর ওপর পড়ছে।
বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। বেতনসহ অসুস্থতাজনিত ছুটি বা স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা না থাকায় তাপজনিত অসুস্থতা তাদের দীর্ঘ সময় কাজের বাইরে রাখে এবং অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়।
স্বাস্থ্য ব্যয়ও বাড়ছে
প্রতিবেদনটি দেখিয়েছে, তীব্র তাপের কারণে শুধু আয় কমছে না, একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে। তাপজনিত অসুস্থতার কারণে ব্যক্তিগত চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, আয় কমে যাওয়া এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার এই দ্বিমুখী চাপ বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং শ্রমঘণ্টা হারানোর উচ্চমাত্রা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

আট দেশের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে পরিচালিত এই গবেষণায় জলবায়ুবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণকে একত্র করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি বলছে, তাপপ্রবাহের কারণে কর্মক্ষমতা হ্রাস, অসুস্থতা এবং মৃত্যুর অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু উন্নয়নশীল দেশেই নয়, তুলনামূলকভাবে কম কর্মদিবস হারানো দেশগুলোর অর্থনীতিতেও বড় ক্ষতি ডেকে আনছে। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশেও তাপজনিত মৃত্যুহার বৃদ্ধির কারণে প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হচ্ছে, যার পরিমাণ সর্বোচ্চ ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
জলবায়ু নীতিতে নতুন সতর্কবার্তা
প্রতিবেদনটি বলছে, জীবাশ্ম জ্বালানি—বিশেষ করে তেল, কয়লা ও গ্যাসের ব্যবহার—জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে, যার ফলে তীব্র তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ও বেশি মাত্রায় দেখা দিচ্ছে। চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রেকর্ড তাপপ্রবাহের ঘটনাও এই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও শ্রমনীতি সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, হারানো কর্মসময়ের ক্ষতিপূরণ, রাষ্ট্র-সমর্থিত বীমা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য শ্রম সুরক্ষা সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া জলবায়ু অভিযোজন তহবিলের একটি অংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় এবং চরম তাপপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনমান রক্ষায় ব্যবহার করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে নতুন বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপজনিত কর্মদিবস হারানো, আয় কমে যাওয়া ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















