বিশ্ব যখন হরমুজ প্রণালীর দিকে তাকায়, তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে তেলের দাম, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা কিংবা বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্ভাব্য ধাক্কা। কিন্তু এই বিশাল সংকটের আরেকটি মানবিক মুখ প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। সেই মুখটি হলো হাজার হাজার নাবিকের, যারা কোনো যুদ্ধের পক্ষ নয়, কোনো কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ নয়, অথচ যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতার মধ্যে আটকে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালী কেবল একটি জলপথ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য প্রতিদিন এই সরু সমুদ্রপথ অতিক্রম করে। কয়েক মাস আগেও প্রতিদিন শতাধিক জাহাজ এই পথে চলাচল করত। এখন সেই প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। অনেক জাহাজ নোঙর করে অপেক্ষা করছে, অনেককে পথ বদলাতে হয়েছে, আবার অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি, শিল্প, পরিবহন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত এর অভিঘাত পৌঁছায়। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারের এই আলোচনার ভিড়ে যারা সেই পণ্য বহন করছে, তাদের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে কথা হয় খুব কম।
যুদ্ধের মানচিত্রে নাবিকেরা প্রায়ই অদৃশ্য মানুষ। তারা সৈনিক নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীও নয়। তারা শুধু নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু যুদ্ধ যখন সমুদ্রে পৌঁছে যায়, তখন বাণিজ্যিক জাহাজও নিরাপদ থাকে না। বোমা, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ভুল লক্ষ্যবস্তু—সবকিছুর মাঝখানে পড়ে যায় নিরস্ত্র বেসামরিক নাবিকেরা।
কেউ ইঞ্জিনরুমে কাজ করছে, কেউ ডেকে, কেউ রান্নাঘরে, কেউ যোগাযোগব্যবস্থা পরিচালনা করছে। কিন্তু প্রত্যেকেই জানে, যেকোনো মুহূর্তে একটি বিস্ফোরণ তাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। আশ্রয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য জায়গা নেই, নিরাপত্তার কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থা নেই। সমুদ্রের মাঝখানে একটি বিশাল ইস্পাতের জাহাজ কখনো কখনো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়।
আরও কঠিন বাস্তবতা হলো বিচ্ছিন্নতা। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এসব নাবিকের অনেকে পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও করতে পারছে না। তারা জানে না কবে বন্দরে পৌঁছাবে, কবে বাড়ি ফিরবে। যুদ্ধ তাদের শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও বন্দি করে রেখেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্ব প্রথম উপলব্ধি করেছিল, সমুদ্রপথে কর্মরত মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত। তখন হাজার হাজার নাবিক মাসের পর মাস জাহাজে আটকে ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান সংকট দেখাচ্ছে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নাবিকদের কল্যাণ এখনো অগ্রাধিকার পায়নি।
বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় সবকিছুই নির্ভর করে সমুদ্রপথের ওপর। কোটি কোটি টন পণ্য, খাদ্য, জ্বালানি, কাঁচামাল এবং শিল্পপণ্য প্রতিনিয়ত এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছে দেন এই মানুষগুলো। অথচ তাদের অস্তিত্ব যেন কেবল তখনই আলোচনায় আসে, যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে বা কোনো জাহাজ ডুবে যায়।
নাবিকদের জীবন আগের তুলনায় প্রযুক্তিগতভাবে কিছুটা উন্নত হয়েছে ঠিকই। আধুনিক জাহাজে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো, আবাসনের মানও বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে একাকীত্ব। ছোট ক্রু, দ্রুত বন্দরে প্রবেশ ও প্রস্থান, সীমিত তীরে ওঠার সুযোগ এবং কঠোর নিরাপত্তা বিধিনিষেধ তাদের সামাজিক জীবনকে সংকুচিত করেছে।

অনেক বন্দরে এখন নাবিকেরা শহরে যাওয়ার অনুমতিও পান না। মাসের পর মাস সমুদ্রে কাটানোর পরও তারা একটি স্বাভাবিক দিনের স্বাদ নিতে পারেন না। এই দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা মানসিক চাপ বাড়ায়, ক্লান্তি সৃষ্টি করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে দুর্বল করে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণও দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসছে, অধিকাংশ নৌদুর্ঘটনার পেছনে মানবিক ক্লান্তি ও মানসিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে বিশ্বের বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব জাহাজ নিয়ে দ্রুত বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু যারা এই প্রযুক্তি পরিচালনা করে, সেই মানুষগুলোর নিরাপত্তা, বিশ্রাম, মানসিক স্বাস্থ্য ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একই মাত্রার অঙ্গীকার এখনো দেখা যায় না।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা, কৌশল ও ভূরাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাজার বিশ্লেষকেরা তেলের মূল্য, বীমা ব্যয় বা সরবরাহব্যবস্থার হিসাব করেন। কিন্তু সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নাবিকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি একেবারেই ভিন্ন—সে আদৌ জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারবে কি না।
হরমুজের সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি কেবল অবকাঠামো, জাহাজ কিংবা বাণিজ্যচুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি দাঁড়িয়ে আছে লাখো শ্রমজীবী মানুষের পরিশ্রম, সাহস এবং নীরব দায়িত্ববোধের ওপর। তাদের অনেকে এমন বিপদের মুখোমুখি হয়, যার খবর আন্তর্জাতিক শিরোনামও হয় না।
তাই হরমুজ নিয়ে আলোচনা যখন আবার জোরদার হবে, তখন শুধু জ্বালানির মূল্য, খাদ্যশৃঙ্খল বা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, সমুদ্রে আটকে থাকা সেই অদৃশ্য মানুষগুলোর কথাও সমান গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখা উচিত। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির এই অচেনা প্রহরীরাই প্রতিদিন নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে রেখে আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সচল রাখছেন।
লিবি পারভস 



















