বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকার সুযোগ সবার হয় না। কিন্তু টেলিভিশনের পর্দা এমন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যেখানে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ একই মুহূর্তে একই দৃশ্য দেখেন, একই গোলে উচ্ছ্বসিত হন, একই পরাজয়ে হতাশ হন। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত মার্ক ও’কনেলের লেখায় ফুটে উঠেছে, আধুনিক বিশ্বে ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি বিরল এক বৈশ্বিক যৌথ অভিজ্ঞতা।
স্টেডিয়ামের বাইরে থেকেও বিশ্বকাপের অংশ
লেখক নিজে বিশ্বকাপে উপস্থিত ছিলেন না। আয়ারল্যান্ড এবারও টুর্নামেন্টে জায়গা না পাওয়ায় তিনি একজন সাধারণ দর্শকের মতোই টেলিভিশনে খেলা দেখেছেন। বাস্তবতা হলো, যত বড়ই হোক বিশ্বকাপের আয়োজন, স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকের সংখ্যা কখনোই টেলিভিশনের সামনে বসা দর্শকদের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ দেখেছিলেন, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এবারের আসর সেই সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। এই পরিসংখ্যানই দেখায়, বিশ্বকাপ মূলত একটি বৈশ্বিক সম্প্রচারিত অভিজ্ঞতা।
টেলিভিশনের পর্দা হয়ে উঠছে শিল্পের বিষয়
বিশ্বকাপের ম্যাচ শুধু দর্শকদের নয়, শিল্পীদেরও অনুপ্রাণিত করছে। অনেক আলোকচিত্রী মাঠে না গিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠা দৃশ্যকে নতুনভাবে ধারণ করছেন।
ব্রাজিলের শিল্পী গ্যাব্রিয়েল রোলিম পরিবর্তিত গেম বয় ক্যামেরা ব্যবহার করে টিভি পর্দার ছবি তুলে সেগুলোকে অ্যানিমেশনে রূপ দিচ্ছেন। মরক্কোর আলোকচিত্রী করিম ওয়াক্কাহা পরাজিত গোলরক্ষক মোস্তাফা শোবেইরের হতাশ মুখ এমনভাবে ধারণ করেছেন, যেখানে ডিজিটাল ঝাপসা ভাব ছবিটিকে আরও আবেগময় করে তুলেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পী জ্যারেড সোয়ারেস টেলিভিশনের দৃশ্য সাদা-কালো কাগজে ছাপিয়ে সেটি ভাঁজ করে আবার ছবি তোলেন। ফলে দর্শকদের আনন্দ কিংবা হতাশা ছবিতে এক নতুন স্পর্শযোগ্য মাত্রা পায়।
একটি দীর্ঘ শিল্প-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
টেলিভিশনের পর্দাকে শিল্পের বিষয় হিসেবে ব্যবহার নতুন নয়। ষাটের দশকে মার্কিন আলোকচিত্রী লি ফ্রিডল্যান্ডারের ‘দ্য লিটল স্ক্রিনস’ সিরিজে হোটেল কক্ষের টেলিভিশন পর্দাকে কেন্দ্র করে ছবি তোলা হয়েছিল। পরে সত্তরের দশকে বেলজিয়ামের আলোকচিত্রী হ্যারি গ্রুয়ার্ট ‘টিভি শটস’ সিরিজে টেলিভিশনে প্রচারিত ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিক, অ্যাপোলো মহাকাশ অভিযান এবং জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানকে নতুন নান্দনিকতায় উপস্থাপন করেন।
এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বর্তমানের শিল্পীরাও টেলিভিশনের পর্দাকে শুধু প্রযুক্তি নয়, একটি আলাদা শিল্পমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
একসঙ্গে দেখার আনন্দ
লেখক লিখেছেন, বিশ্বকাপ চলাকালে তিনি তাঁর ১৩ বছর বয়সী ছেলের সঙ্গে নিয়মিত খেলা দেখেছেন। ছেলের ফুটবল সম্পর্কে নতুন আগ্রহ তাঁকে আরও উৎসাহিত করেছে। অন্যদিকে তাঁর ৮ বছরের মেয়ের কাছে কার্টুন বন্ধ করে সরাসরি ম্যাচ দেখা ছিল বিরক্তিকর। কিন্তু এই বাধ্যতামূলক একসঙ্গে বসে খেলা দেখার মধ্যেই ছিল অন্যরকম আনন্দ।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল চলাকালে লন্ডনে থাকা এক বন্ধুর সঙ্গে বার্তা বিনিময়ের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বন্ধুর পাঠানো বসার ঘরের ছবিতে দেখা যায়, পরাজয়ের হতাশায় সবাই টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে আছে। ডাবলিনে বসে লেখকের পরিবারও তখন একই ম্যাচ দেখছিল। পৃথিবীর অগণিত ঘরেও চলছিল একই দৃশ্য।
একই সময়ে, একই অনুভূতি
আজকের পৃথিবীতে মানুষ সাধারণত নিজ নিজ মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিকেন্দ্রিক তথ্যপ্রবাহে ডুবে থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপ সেই ব্যতিক্রমী সময়, যখন কোটি কোটি মানুষ একই মুহূর্তে একই সম্প্রচার দেখেন।
একই ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, একই রিপ্লে, একই গোল, একই হতাশা ও একই উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এমন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যেখানে স্টেডিয়ামে উপস্থিত না থেকেও মানুষ নিজেদের এই বৈশ্বিক আয়োজনের অংশ বলে অনুভব করতে পারে। এই যৌথ মনোযোগই বিশ্বকাপকে কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি বিরল বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঘটনার মর্যাদা দেয়।
বিশ্বকাপ কোটি মানুষের যৌথ অভিজ্ঞতা, যেখানে টেলিভিশনের পর্দাই পৃথিবীর নানা প্রান্তের দর্শকদের একই মুহূর্তে এক সুতোয় বেঁধে রাখে।
Sarakhon Report 



















