গণতন্ত্রে ভোটাধিকারকে সাধারণত একটি মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু অধিকার মানেই কি দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি? ব্রিটেনে ভোট দেওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে ১৬ বছরে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত সেই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এটি কেবল নির্বাচনী সংস্কারের বিতর্ক নয়; বরং সমাজ কিশোরদের কতটা পরিণত নাগরিক হিসেবে দেখতে প্রস্তুত, সেই বৃহত্তর আলোচনার অংশ।
সমস্যা হলো, ব্রিটিশ আইন নিজেই কিশোরদের সক্ষমতা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বার্তা দেয়। একদিকে সরকার ১৬ বছরের নিচের শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে রাখতে চায়, কারণ তাদের মানসিক নিরাপত্তা ও বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে একই সময়ে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের হাতে জাতীয় নির্বাচনে সরকার গঠনের মতো গুরুদায়িত্ব তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই দুই অবস্থানকে পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র আসলে কিশোরদের কতটা সক্ষম বলে মনে করে?
ব্রিটিশ আইনের নানা দিক এই অসঙ্গতিকে আরও স্পষ্ট করে। জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য আলাদা আলাদা বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোথাও অভিভাবকের সম্মতি লাগে, কোথাও লাগে না; কোথাও স্বাধীনতা দেওয়া হয়, আবার অন্য ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকে। ফলে একজন কিশোর কখন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবে, তার কোনো সুসংগত নীতি চোখে পড়ে না।
ভোটের বয়স কমানোর পক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছেন, তাদের যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তাদের মতে, গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ যত আগে শুরু হবে, ততই দীর্ঘমেয়াদে ভোট দেওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে। গবেষণায় দেখা গেছে, কম বয়সে ভোটদান শুরু করলে ভবিষ্যতেও নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রবণতা বেশি থাকে। এমন বাস্তবতা এমন এক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ, যখন তরুণদের ভোটার উপস্থিতি ধারাবাহিকভাবে বয়স্কদের তুলনায় কম।
এর আরেকটি রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। যখন বয়স্করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভোটার, তখন রাজনৈতিক দলগুলোও স্বাভাবিকভাবেই তাদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির মতো তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রায়ই অগ্রাধিকারের তালিকায় নিচে নেমে যায়। তরুণ ভোটার বাড়লে নীতিনির্ধারণেও ভারসাম্য আসতে পারে—এমন প্রত্যাশা অমূলক নয়।
তবে এখানেই বিতর্ক শেষ হয় না। ভোটাধিকার কেবল একটি প্রতীকী স্বীকৃতি নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। করনীতি, সরকারি ব্যয়, কল্যাণমূলক কর্মসূচি, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা যুদ্ধের মতো প্রশ্নে যাদের ভোট শেষ পর্যন্ত প্রভাব ফেলে, তাদের রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়।
বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন তরুণদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে, তখন তথ্যের মান, বিভ্রান্তি এবং অ্যালগরিদমের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, বিভাজনমূলক প্রচারণা ও আবেগনির্ভর রাজনৈতিক কনটেন্টের বিস্তার ইতোমধ্যেই গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যদি সরকার নিজেই মনে করে ১৬ বছরের কম বয়সীদের এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে রাখা দরকার, তাহলে মাত্র কয়েক মাস পরই তাদের ভোটার হিসেবে বিবেচনা করার যুক্তি কতটা শক্তিশালী—সেটি আলোচনার দাবি রাখে।

এই সমস্যার সমাধান হিসেবে নাগরিক শিক্ষা সম্প্রসারণের কথা বলা হচ্ছে। স্কুল পর্যায়ে গণতন্ত্র, সংবিধান, নির্বাচন এবং নাগরিক দায়িত্ব নিয়ে আরও কার্যকর পাঠদানের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব শিক্ষা এখনো সর্বত্র সমানভাবে পৌঁছায়নি। অনেক শিক্ষার্থীই ভোট দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি পায় না। ফলে শুধু ভোটাধিকার বাড়িয়ে দিলেই সচেতন নাগরিক তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
আরও একটি বাস্তব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া দরকার। ১৬ বছর বয়সে অধিকাংশ কিশোর এখনো পরিবারনির্ভর। তাদের রাজনৈতিক মতামত অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের প্রভাব থেকে পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে ওঠে না। অবশ্য সব প্রাপ্তবয়স্কও যে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেন, তা নয়। কিন্তু ভোটের বয়স কমানোর পক্ষে এটিকে যথেষ্ট যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করাও কঠিন।
অন্যদিকে ভোটার অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিকল্প পথও রয়েছে। স্বয়ংক্রিয় ভোটার নিবন্ধন ব্যবস্থা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা কিংবা বাধ্যতামূলক ভোটদানের মতো নীতিগত সংস্কার অনেক দেশের অভিজ্ঞতায় ইতিবাচক ফল দিয়েছে। এসব উদ্যোগ ভোটের বয়স অপরিবর্তিত রেখেও অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অবশ্য পরিণত হওয়া নিয়ে। কোনো নির্দিষ্ট জন্মদিনে হঠাৎ করেই কেউ পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যায় না। কেউ ১৬ বছরেই দায়িত্বশীল হতে পারে, আবার কেউ ২০ বছরেও নাও হতে পারে। তাই বয়সসীমা নির্ধারণ সবসময়ই কিছুটা কৃত্রিম। কিন্তু আইনের কাজই হলো বাস্তবতার জটিলতার মধ্যে একটি সুসংগত মানদণ্ড নির্ধারণ করা।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিভিন্ন অধিকারের জন্য বিচ্ছিন্ন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বয়সসীমা নির্ধারণের পরিবর্তে একটি তুলনামূলকভাবে একীভূত নীতি বেশি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যদি সমাজের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব ১৮ বছরকে কেন্দ্র করেই নির্ধারিত হয়, তাহলে ভোটাধিকারও সেই কাঠামোর মধ্যেই থাকা অধিকতর যুক্তিসংগত।
গণতন্ত্রে তরুণদের কণ্ঠ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতামত উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় সব সময় ভোটের বয়স কমিয়ে আনা নয়। কখনো কখনো তাদের আরও ভালো নাগরিক শিক্ষা, সহজ অংশগ্রহণের সুযোগ এবং পরিণত হওয়ার জন্য সামান্য সময় দেওয়াই গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বেশি উপকারী হতে পারে।
রোজা প্রিন্স 



















