গাজা থেকে ইউক্রেন, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা—বিশ্ব রাজনীতির দৃশ্যমান সংঘাতগুলোই প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনাম দখল করে আছে। কিন্তু এই সামরিক উত্তাপের আড়ালে আরও গভীর একটি প্রতিযোগিতা নীরবে বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করছে। সেটি অস্ত্রের নয়, বরং প্রযুক্তি, শিল্প, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং কৌশলগত খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে।
আজকের বিশ্বে ক্ষমতার সংজ্ঞা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর শক্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে খনি, গবেষণাগার, সেমিকন্ডাক্টর কারখানা এবং বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক। যে রাষ্ট্র এসব ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে গড়ে তুলতে পারবে, ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাবই হবে সবচেয়ে বেশি।
সম্প্রতি চীন কৌশলগত খনিজ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও জোরদার করছে। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো বাণিজ্যনীতি বা অর্থনৈতিক কূটনীতির সিদ্ধান্ত মনে হলেও বাস্তবে এগুলো বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ। প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে খনিজ সম্পদও কূটনৈতিক ও কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
এক সময় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ছিল ভূখণ্ড ও জ্বালানি সম্পদকে কেন্দ্র করে। বিংশ শতাব্দীতে তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিশ্বশক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে সেই সমীকরণ বদলে গেছে। এখন প্রতিযোগিতা হচ্ছে সম্পূর্ণ উৎপাদন শৃঙ্খলের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য—খনি থেকে পরিশোধন, গবেষণা থেকে উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত।
শুধু খনিজের মালিক হওয়া যথেষ্ট নয়; প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে সেই খনিজকে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যে রূপান্তর করার সক্ষমতায়। অর্থাৎ, সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করছে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উদ্ভাবনের ক্ষমতা।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে কয়েকটি বিশেষ খনিজ। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিতে লিথিয়াম অপরিহার্য, কোবাল্ট ও নিকেল ব্যাটারির কার্যকারিতা বাড়ায়, গ্রাফাইট ব্যবহৃত হয় ব্যাটারির অ্যানোডে। আবার নিওডিমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের মতো বিরল মৃত্তিকা উপাদান ছাড়া আধুনিক বৈদ্যুতিক মোটর, বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, যুদ্ধবিমান কিংবা রোবোটিক প্রযুক্তি কার্যত অচল। গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়াম সেমিকন্ডাক্টর, টেলিযোগাযোগ, সৌরশক্তি এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তির ভিত্তি।

এই বাস্তবতা বুঝেই চীন বহু বছর আগে থেকে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তারা শুধু খনিজ উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; অনুসন্ধান, পরিশোধন, উৎপাদন, গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব—সবকিছুকে এক সুসংহত শিল্পব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে এসেছে। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বহু দেশে অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে চীন বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও এই পরিবর্তনকে নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। উন্নত প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে ঘিরে ওয়াশিংটন নতুন নীতি গ্রহণ করেছে। শুল্ক বৃদ্ধি, প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা—সবই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ। সমর্থকদের মতে, এসব পদক্ষেপ কৌশলগত নির্ভরতা কমানোর জন্য অপরিহার্য। সমালোচকদের দৃষ্টিতে এগুলো বিশ্ববাণিজ্যের নিয়মকে নিজেদের স্বার্থে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা।
ফলে বর্তমান প্রতিযোগিতাকে কেবল চীন-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। প্রকৃতপক্ষে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি পরিচালনার দুটি ভিন্ন দর্শনের সংঘর্ষ। একদিকে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর জোর; অন্যদিকে বাণিজ্যনীতি, প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধ এবং কৌশলগত চাপের মাধ্যমে নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রচেষ্টা।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি একই সঙ্গে সম্ভাবনা এবং সতর্কবার্তা বহন করে। প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক হওয়া উন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, কাঁচামাল রপ্তানিকারক বহু দেশ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও টেকসই শিল্পায়ন গড়ে তুলতে পারেনি। কারণ প্রকৃত মূল্য সৃষ্টি হয় তখনই, যখন কাঁচামালকে উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যে রূপান্তর করা যায়।
তাই উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি। খনিজ উত্তোলন নয়, খনিজভিত্তিক মূল্য সংযোজনকারী শিল্পই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি।
মিসরের মতো দেশ এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। স্বর্ণ, ফসফেট এবং কৌশলগত খনিজসমৃদ্ধ কৃষ্ণ বালুর পাশাপাশি সুয়েজ খালের মতো বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ তাদের বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে তারা কাঁচামালের সরবরাহকারী থেকে বৈশ্বিক শিল্পশৃঙ্খলের সক্রিয় অংশীদারে পরিণত হতে পারে।
এই অভিজ্ঞতা শুধু মিসরের জন্য নয়, সম্পদসমৃদ্ধ প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য শিক্ষণীয়। প্রাকৃতিক সম্পদ তখনই জাতীয় শক্তিতে রূপ নেয়, যখন তা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়।
বিশ্ব এখন শুধু সম্পদের দখল নিয়ে প্রতিযোগিতা করছে না; প্রতিযোগিতা করছে ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্য। আগামী দিনের বিজয়ী সেই রাষ্ট্র হবে না, যার সেনাবাহিনী সবচেয়ে বড় বা অর্থনীতি সবচেয়ে বিস্তৃত। এগিয়ে থাকবে সেই দেশ, যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারে, গবেষণায় বিনিয়োগ করে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পশক্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়।
বিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতি তেলের ভাষায় লেখা হয়েছিল। একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাস লেখা হচ্ছে ভিন্ন এক অভিধানে—যেখানে কৌশলগত খনিজ, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, শিল্প এবং জ্ঞানই নতুন ক্ষমতার ভিত্তি। তাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আর কেবল কে সম্পদের মালিক, তা নয়; বরং কে সেই সম্পদকে টেকসই অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব এবং বৈশ্বিক প্রভাবের উৎসে পরিণত করতে পারে?
ড. মারওয়া এল-শিনাওয়ি 



















