আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বদলালে তার প্রথম ইঙ্গিত সব সময় বড় কোনো ঘোষণায় আসে না। অনেক সময় একটি সংক্ষিপ্ত দৃশ্যই সেই পরিবর্তনের গভীরতা প্রকাশ করে। সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে শুভেচ্ছা জানানোর পর সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানান, তখন সেটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য ছিল না। বরং এটি ছিল পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি দৃশ্যমান প্রতীক।
অনেক বিশ্লেষণেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আড়াল করে—দুই পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে তৃতীয় কোনো শক্তির প্রয়োজন ছিল, আর সেই ভূমিকায় পাকিস্তান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।
ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক কিংবা পরে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আলোচনার পুরো প্রক্রিয়া দেখিয়েছে, যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে এখন কিছু মধ্যম শক্তিও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তন কেবল একটি কূটনৈতিক সাফল্য নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন ধরনের মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রের আবির্ভাবেরও ইঙ্গিত।
এই অবস্থানে পাকিস্তান আকস্মিকভাবে পৌঁছায়নি। কয়েক বছর আগেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক ছিল অবিশ্বাসে ভরা। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সমালোচনা করেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে নিরাপত্তা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আঞ্চলিক সংকট ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে পাকিস্তান আবারও নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনে।

বিশেষ করে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এবং পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ পাকিস্তানের অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। একই সময়ে সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ইসলামাবাদের ভূমিকা ওয়াশিংটনের কাছে নতুন করে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো পরস্পরবিরোধী পক্ষ যখন একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সন্ধান করছিল, তখন পাকিস্তানই সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে সামনে আসে।
এই কূটনৈতিক সক্ষমতার পেছনে পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও সমানভাবে প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিয়া জনগোষ্ঠীর আবাস হওয়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের ধর্মীয় ও সামাজিক যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতাও নতুন করে পুনর্গঠিত হয়েছে।
এই তিনটি সম্পর্ককে একসঙ্গে ধরে রাখার সক্ষমতা খুব কম রাষ্ট্রের রয়েছে। সাধারণত একটি পক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অন্য পক্ষের দূরত্ব তৈরি করে। পাকিস্তান বহু দশক ধরে এই পরস্পরবিরোধী সম্পর্কগুলোকে একই সঙ্গে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এখন বাস্তব ফল দিতে শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সফরগুলোর ধারাবাহিকতাও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন। ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার পর শাহবাজ শরিফ তেহরান সফর করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হয় ইসলামাবাদ।

এ ধরনের সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। আন্তর্জাতিক সংকটের সময় কোনো রাষ্ট্র কোন রাজধানীকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নিচ্ছে, সেটি প্রায়ই আস্থার মাত্রা প্রকাশ করে। ইরানের সিদ্ধান্তও সেই অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ।
ইসলামাবাদ সফরের সময় পেজেশকিয়ান সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। এই অবস্থান প্রকাশের জন্য তিনি পাকিস্তানের মাটিকেই বেছে নেন। কূটনৈতিক ভাষায় এটি এমন একটি সংকেত, যা সাধারণ নিরপেক্ষ ভেন্যুর ক্ষেত্রে দেখা যায় না। বরং এটি নির্দেশ করে যে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র পাকিস্তানকে বিশ্বাসযোগ্য আলোচনাসঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করছে।
অবশ্য পাকিস্তানের এই উত্থান নিয়ে সংশয়ও কম নয়। দেশটি এখনও রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অল্প কিছুদিন আগেও সার্বভৌম ঋণ খেলাপির ঝুঁকিতে পড়েছিল দেশটি। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নির্বাচিত সরকারের চেয়ে সেনাবাহিনীর প্রভাব অনেক বেশি বলে সমালোচনা রয়েছে।
এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা তাকে আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দেয়—এমন ধারণাও সব সময় সত্য নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সীমিত সক্ষমতার দেশও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটছে। বিশেষ করে দেশটির পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু যে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, বরং সেনাপ্রধানের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামো—এই বাস্তবতা পশ্চিমা বিশ্লেষণের প্রচলিত কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ফলে অনেক পর্যবেক্ষক দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রটি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হোয়াইট হাউসে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, রিয়াদে সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ, তেহরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালের আলোচনা এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপের পুরো প্রক্রিয়ায় আসিম মুনিরের সক্রিয় উপস্থিতি দেখায় যে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের বড় অংশ সামরিক নেতৃত্বের হাতেই কেন্দ্রীভূত।

বুর্গেনস্টকের বৈঠকের শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ৬০ দিনের একটি রোডম্যাপ, রাজনৈতিক তদারকি কমিটি, পারমাণবিক ও নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক কর্মদল এবং হরমুজ প্রণালির সংকট মোকাবিলার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা গঠনে সম্মত হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়া সচল রাখার দায়িত্বে রয়েছে পাকিস্তান ও কাতার।
এখানেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি স্পষ্ট হয়। একসময় যে ভূমিকা ইউরোপীয় শক্তিগুলো পালন করার চেষ্টা করত, এখন সেই দায়িত্বের একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে।
অবশ্য এই সাফল্য স্থায়ী হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ কিংবা আঞ্চলিক নতুন সংঘাত পুরো প্রক্রিয়াকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তবু একটি বিষয় ইতোমধ্যে পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পাকিস্তানকে আর কেবল নিরাপত্তা সমস্যার উৎস বা অর্থনৈতিক সংকটে থাকা রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে।
আজকের বিশ্বে ইসলামাবাদ একই সঙ্গে ওয়াশিংটন, তেহরান, রিয়াদ ও দোহার সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখতে পারছে। এই সক্ষমতা তাকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্যেও সংলাপের পথ খুলে দেওয়ার মতো ভূমিকা পালন করা সম্ভব।
বিশ্বব্যবস্থা এখন সেই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রস্তুত কি না, সেটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে, কিন্তু বর্তমান ভূরাজনীতিতে দেশটির মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা ক্রমেই উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে।
ইমরান খালিদ 



















