০৮:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
সাংবাদিক আবু হেনা রাসেল আর নেই, শোকে ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন হুথিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণার নিন্দা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ধাক্কা, ছয় মাসে আয় ১৯.৩৪ বিলিয়ন ডলার সরকারি ক্রয় কমিটির অনুমোদন: ৩০৩ কোটি টাকায় এমওপি সার আমদানি ও ১.৬ কোটি খাদ্য বস্তা কেনা বাড়ির বাগানের ওপর দিয়ে ছুটছে মহাসড়ক, তবু বাসিন্দাদের কাছে সেটিই আশ্রয়ের ছাদ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট সিঙ্গাপুরের, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় ৯ বছর বয়সে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের সাক্ষী: উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা নারীর হৃদয়বিদারক স্মৃতিচারণ দিল্লিতে শিক্ষার্থী আন্দোলনে নতুন গতি, বিক্ষোভে যোগ দিচ্ছেন সাধারণ মানুষও হুথিদের নতুন হুমকিতে লোহিত সাগরে উত্তেজনা, সৌদি বন্দরে যাওয়া তেলবাহী জাহাজ ঝুঁকিতে তিমি হাঙরের শিকারের অজানা জগৎ উন্মোচন, ক্যামেরায় ধরা পড়ল সমুদ্রের বৃহত্তম মাছের বিস্ময়কর আচরণ

আশার রাজনীতি নয়, বাস্তবতার শাসনই ব্রিটেনের প্রকৃত পরীক্ষা

ব্রিটিশ রাজনীতিতে নেতৃত্বের পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। গত এক দশকে দেশটি এত দ্রুত প্রধানমন্ত্রী বদলাতে দেখেছে যে, নতুন মুখের আবির্ভাব এখন আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক নয়; বরং তা হয়ে উঠেছে গভীর অস্থিরতার লক্ষণ। এমন এক বাস্তবতায় অ্যান্ডি বার্নহামের ক্ষমতায় আগমনকে ঘিরে লেবার পার্টির ভেতরে ও বাইরে যে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে, সেটি হয়তো স্বল্পমেয়াদে কিছু প্রত্যাশা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু আশার ভাষণ কি একটি জটিল অর্থনীতি, বিভক্ত সমাজ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান দিতে পারে?

বার্নহামের উত্থান গণভোট কিংবা সাধারণ নির্বাচনের সরাসরি রায়ের মাধ্যমে নয়; বরং দলীয় অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের ফল। ফলে তাঁর রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। যদিও আধুনিক ব্রিটিশ রাজনীতিতে এসব প্রশ্ন যেন ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। এখন মনে হয়, একজন নেতার জন্য সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো জনগণকে নতুন করে আশাবাদী করে তোলা—তা সে আশার বাস্তব ভিত্তি থাকুক বা না থাকুক।

এই দিক থেকে বার্নহাম নিঃসন্দেহে দক্ষ। তিনি এমন এক ভাষা ব্যবহার করেন, যা ক্লান্ত ও হতাশ ভোটারদের কাছে নতুন সূচনার অনুভূতি সৃষ্টি করে। তাঁর বক্তব্যে জাতীয় ঐক্য, রাজনীতির সংস্কার, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নতুন অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা বারবার উঠে আসে। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, আশা তখনই মূল্যবান, যখন তা কার্যকর নীতি ও বাস্তবায়নের সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যথায় একই আশা খুব দ্রুত হতাশায় রূপ নেয়।

সাম্প্রতিক ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত হয়েছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, অভিবাসন, উৎপাদনশীলতার সংকট কিংবা রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ—এসব মৌলিক সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান দেখা যায়নি। নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত থেকেছে।

After Andy Burnham's Win, the UK Is Set to Test How Far Charisma Can Shift  Electoral Dynamics - The New York Times

বার্নহামের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে এক ধরনের অতীতমুখী কল্পনা। তাঁর বক্তব্যে বারবার এমন একটি ব্রিটেনের ছবি উঠে আসে, যা শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল এবং যেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল আরও বিস্তৃত। তিনি পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আবাসনের মতো খাতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথা বলেন। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন যুগ শুরু করার প্রতিশ্রুতিও দেন।

এই ধারণাগুলো রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় শোনাতে পারে। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি কি সেই পথকে সমর্থন করে?

গত চার দশকে ব্রিটেনের অর্থনীতি আমূল বদলে গেছে। উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি থেকে দেশটি অনেক আগেই সেবা-নির্ভর ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, পুঁজি প্রবাহ, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা—সবকিছুই আজকের অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে অতীতের শিল্প কাঠামো পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব পরিকল্পনার অর্থায়ন কীভাবে হবে—সেই বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা সামনে আসেনি। বড় বড় নীতিগত ঘোষণা সহজ, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা দেখানোই প্রকৃত নেতৃত্বের পরীক্ষা।

বার্নহামের আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। তিনি স্থানীয় সরকারকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলছেন। কিন্তু ব্রিটেনের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বহু স্থানীয় প্রশাসন আর্থিক সংকটে রয়েছে, অনেক কাউন্সিল কার্যকর সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কোথাও কোথাও প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় সংকট মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকে দুর্বল করে স্থানীয় কাঠামোর ওপর আরও নির্ভরশীল হওয়া কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের সুযোগ রয়েছে।

আরও বিস্ময়কর হলো, ব্রিটেনের সবচেয়ে জরুরি নীতিগত চ্যালেঞ্জগুলোর অনেকগুলিই তাঁর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যে খুব সীমিতভাবে এসেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অভিবাসন, জ্বালানি নীতি, সাংস্কৃতিক বিভাজন, প্রতিরক্ষা ব্যয় কিংবা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অবস্থান—এসব প্রশ্ন আজ ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। অথচ জনমনে আশাবাদ তৈরির ভাষণের তুলনায় এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনও অনুপস্থিত।

সমস্যার আরেকটি স্তর রয়েছে, যা কেবল নীতির প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের কাঠামোগত বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

The Student Guide: British Politics Explained in 10 Mins | Homes For  Students

ব্রিটিশ রাজনীতির বর্তমান কাঠামো বহু বছরের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। নির্বাচিত সংসদের পাশাপাশি আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, বিভিন্ন আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারণী কাঠামো এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই বড় ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। যেকোনো মৌলিক পরিবর্তনের আগে এই প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হয়।

এই বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিলে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক কর্মসূচিও কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

ইতিহাস দেখায়, ব্রিটেনে বহু নেতা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। কেউ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কথা বলেছেন, কেউ প্রশাসনিক সংস্কারের, কেউ জাতীয় ঐক্যের। কিন্তু প্রত্যেকেই শেষ পর্যন্ত একই ধরনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে নেতৃত্ব বদলালেও ফলাফল বদলায়নি।

এই কারণেই বার্নহামের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়তো বিরোধী দল নয়; বরং বাস্তবতা নিজেই।

যদি তাঁর প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং স্পষ্ট নীতিগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে বর্তমানের আশাবাদ খুব দ্রুত রাজনৈতিক হতাশায় রূপ নিতে পারে। কারণ আধুনিক ভোটার শুধু অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ শোনে না; তারা ফলাফলও দেখতে চায়।

সত্যিকার অর্থে ব্রিটেনের সামনে আজ যে সংকট, তা কোনো একক নেতা কিংবা আবেগঘন রাজনৈতিক ভাষণে দূর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল এবং এমন নেতৃত্ব, যা জনপ্রিয়তার চেয়ে কার্যকারিতাকে অগ্রাধিকার দেয়।

অন্যথায় নতুন প্রধানমন্ত্রী আসবেন, নতুন স্লোগান শোনা যাবে, নতুন আশা তৈরি হবে—কিন্তু দেশের মৌলিক সংকট একই জায়গায় থেকে যাবে। আর তখন নেতৃত্বের পরিবর্তন ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যোগ করবে, সমাধান নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংবাদিক আবু হেনা রাসেল আর নেই, শোকে ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন

আশার রাজনীতি নয়, বাস্তবতার শাসনই ব্রিটেনের প্রকৃত পরীক্ষা

০৭:০০:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

ব্রিটিশ রাজনীতিতে নেতৃত্বের পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। গত এক দশকে দেশটি এত দ্রুত প্রধানমন্ত্রী বদলাতে দেখেছে যে, নতুন মুখের আবির্ভাব এখন আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক নয়; বরং তা হয়ে উঠেছে গভীর অস্থিরতার লক্ষণ। এমন এক বাস্তবতায় অ্যান্ডি বার্নহামের ক্ষমতায় আগমনকে ঘিরে লেবার পার্টির ভেতরে ও বাইরে যে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে, সেটি হয়তো স্বল্পমেয়াদে কিছু প্রত্যাশা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু আশার ভাষণ কি একটি জটিল অর্থনীতি, বিভক্ত সমাজ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান দিতে পারে?

বার্নহামের উত্থান গণভোট কিংবা সাধারণ নির্বাচনের সরাসরি রায়ের মাধ্যমে নয়; বরং দলীয় অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের ফল। ফলে তাঁর রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। যদিও আধুনিক ব্রিটিশ রাজনীতিতে এসব প্রশ্ন যেন ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। এখন মনে হয়, একজন নেতার জন্য সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো জনগণকে নতুন করে আশাবাদী করে তোলা—তা সে আশার বাস্তব ভিত্তি থাকুক বা না থাকুক।

এই দিক থেকে বার্নহাম নিঃসন্দেহে দক্ষ। তিনি এমন এক ভাষা ব্যবহার করেন, যা ক্লান্ত ও হতাশ ভোটারদের কাছে নতুন সূচনার অনুভূতি সৃষ্টি করে। তাঁর বক্তব্যে জাতীয় ঐক্য, রাজনীতির সংস্কার, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নতুন অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা বারবার উঠে আসে। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, আশা তখনই মূল্যবান, যখন তা কার্যকর নীতি ও বাস্তবায়নের সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যথায় একই আশা খুব দ্রুত হতাশায় রূপ নেয়।

সাম্প্রতিক ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত হয়েছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, অভিবাসন, উৎপাদনশীলতার সংকট কিংবা রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ—এসব মৌলিক সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান দেখা যায়নি। নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত থেকেছে।

After Andy Burnham's Win, the UK Is Set to Test How Far Charisma Can Shift  Electoral Dynamics - The New York Times

বার্নহামের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে এক ধরনের অতীতমুখী কল্পনা। তাঁর বক্তব্যে বারবার এমন একটি ব্রিটেনের ছবি উঠে আসে, যা শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল এবং যেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল আরও বিস্তৃত। তিনি পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আবাসনের মতো খাতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথা বলেন। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন যুগ শুরু করার প্রতিশ্রুতিও দেন।

এই ধারণাগুলো রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় শোনাতে পারে। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি কি সেই পথকে সমর্থন করে?

গত চার দশকে ব্রিটেনের অর্থনীতি আমূল বদলে গেছে। উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি থেকে দেশটি অনেক আগেই সেবা-নির্ভর ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, পুঁজি প্রবাহ, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা—সবকিছুই আজকের অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে অতীতের শিল্প কাঠামো পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব পরিকল্পনার অর্থায়ন কীভাবে হবে—সেই বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা সামনে আসেনি। বড় বড় নীতিগত ঘোষণা সহজ, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা দেখানোই প্রকৃত নেতৃত্বের পরীক্ষা।

বার্নহামের আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। তিনি স্থানীয় সরকারকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলছেন। কিন্তু ব্রিটেনের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বহু স্থানীয় প্রশাসন আর্থিক সংকটে রয়েছে, অনেক কাউন্সিল কার্যকর সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কোথাও কোথাও প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় সংকট মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকে দুর্বল করে স্থানীয় কাঠামোর ওপর আরও নির্ভরশীল হওয়া কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের সুযোগ রয়েছে।

আরও বিস্ময়কর হলো, ব্রিটেনের সবচেয়ে জরুরি নীতিগত চ্যালেঞ্জগুলোর অনেকগুলিই তাঁর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যে খুব সীমিতভাবে এসেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অভিবাসন, জ্বালানি নীতি, সাংস্কৃতিক বিভাজন, প্রতিরক্ষা ব্যয় কিংবা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অবস্থান—এসব প্রশ্ন আজ ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। অথচ জনমনে আশাবাদ তৈরির ভাষণের তুলনায় এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনও অনুপস্থিত।

সমস্যার আরেকটি স্তর রয়েছে, যা কেবল নীতির প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের কাঠামোগত বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

The Student Guide: British Politics Explained in 10 Mins | Homes For  Students

ব্রিটিশ রাজনীতির বর্তমান কাঠামো বহু বছরের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। নির্বাচিত সংসদের পাশাপাশি আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, বিভিন্ন আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারণী কাঠামো এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই বড় ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। যেকোনো মৌলিক পরিবর্তনের আগে এই প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হয়।

এই বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিলে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক কর্মসূচিও কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

ইতিহাস দেখায়, ব্রিটেনে বহু নেতা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। কেউ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কথা বলেছেন, কেউ প্রশাসনিক সংস্কারের, কেউ জাতীয় ঐক্যের। কিন্তু প্রত্যেকেই শেষ পর্যন্ত একই ধরনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে নেতৃত্ব বদলালেও ফলাফল বদলায়নি।

এই কারণেই বার্নহামের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়তো বিরোধী দল নয়; বরং বাস্তবতা নিজেই।

যদি তাঁর প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং স্পষ্ট নীতিগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে বর্তমানের আশাবাদ খুব দ্রুত রাজনৈতিক হতাশায় রূপ নিতে পারে। কারণ আধুনিক ভোটার শুধু অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ শোনে না; তারা ফলাফলও দেখতে চায়।

সত্যিকার অর্থে ব্রিটেনের সামনে আজ যে সংকট, তা কোনো একক নেতা কিংবা আবেগঘন রাজনৈতিক ভাষণে দূর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল এবং এমন নেতৃত্ব, যা জনপ্রিয়তার চেয়ে কার্যকারিতাকে অগ্রাধিকার দেয়।

অন্যথায় নতুন প্রধানমন্ত্রী আসবেন, নতুন স্লোগান শোনা যাবে, নতুন আশা তৈরি হবে—কিন্তু দেশের মৌলিক সংকট একই জায়গায় থেকে যাবে। আর তখন নেতৃত্বের পরিবর্তন ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যোগ করবে, সমাধান নয়।