কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলেও বাংলাদেশে ফিরে আদালতে হাজির হওয়ার অঙ্গীকার করেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়কে তিনি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন। জাপানের সংবাদ সংস্থা কিয়োডো নিউজকে দেওয়া এক লিখিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি আইনি প্রক্রিয়া থেকে পালিয়ে বেড়াতে চান না; বরং দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হবেন, যদিও জানেন এর ফলে তাঁকে কারাবন্দি করা হতে পারে বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করারও চেষ্টা হতে পারে।
সম্প্রতি কিয়োডো নিউজকে দেওয়া লিখিত সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বলেন, “আমি বাংলাদেশে ফিরে আসব। আমি আদালতে হাজির হব।” তবে তিনি কোন আদালতে হাজির হবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি।
তিনি আরও বলেন, “তারা আমাকে কারাগারে পাঠাতে পারে। এমনকি আমাকে ফাঁসিতেও ঝুলানোর চেষ্টা করতে পারে। আমি সেই ঝুঁকির কথা জানি।” তাঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান কর্তৃপক্ষের প্রতি ইঙ্গিত করেই দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্দোলনের পর দেশত্যাগ, পরে মৃত্যুদণ্ড
২০২৪ সালের আগস্টে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।
২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁকে অনুপস্থিতিতে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেন।
ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ
বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন জানিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, নয়াদিল্লি সেই অনুরোধ পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
চলতি মাসের শুরুতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশিত এক সংবাদ প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় ১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা করছে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করবে।
কীভাবে শুরু হয়েছিল আন্দোলন
২০২৪ সালের জুনে হাইকোর্ট ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল করলে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই অস্থিরতায় সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন নিহত হতে পারেন, যাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। তবে শেখ হাসিনা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, আন্দোলনটি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা প্রভাবিত করেছিল।
তিনি বলেন, “স্বাধীন বিদেশি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা যদি প্রতিটি মানুষের মৃত্যুর কারণ এবং কোন অস্ত্র বা গুলিতে তারা নিহত হয়েছেন, তা পরীক্ষা করেন, তাহলে এখনো সত্য বেরিয়ে আসতে পারে।”
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ
২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, অনুপস্থিতিতে বিচার হওয়া নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদেরও অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পথচলা
বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের জুন থেকে ২০০১ সালের জুলাই এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত মোট পাঁচ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর তৃতীয় মেয়াদে, ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় ২০ জন জিম্মি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ২ জন বাংলাদেশি, ১ জন ভারতীয় এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ১ জন মার্কিন নাগরিক। হামলা মোকাবিলায় অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন।
এই হামলায় জড়িত সাত জঙ্গিকে ২০১৯ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরে তাদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
নিহত জাপানি নাগরিকরা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-এর সহায়তায় ঢাকায় দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণের প্রকল্পে কাজ করছিলেন।
‘বাংলাদেশের আরোগ্য দরকার’
শেখ হাসিনা বলেন, “একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ শুধু বাংলাদেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল, উন্নয়ন সহযোগী এবং জাপানের মতো দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, যারা আমাদের উন্নয়নের যাত্রায় আস্থা, সম্পদ ও বন্ধুত্ব দিয়ে বিনিয়োগ করেছে।”
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, “দেশের আরোগ্য দরকার। কিন্তু পুনর্মিলন যেন দায়মুক্তির সমার্থক না হয়।” তাঁর ভাষায়, অপরাধের জন্য দায়ীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক পরিবর্তন
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর শিক্ষার্থী আন্দোলনের নেতাদের প্রস্তাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিজয়ী হওয়ার পর দলটির নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০২৫ সালের মে মাস থেকে আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে।
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে শেখ হাসিনা বলেন, “আগামী এক দশক পুনরুদ্ধার ও নবযাত্রার দশক হতে পারে, তবে সেটি সম্ভব হবে তখনই, যখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং জনগণকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হবে।”
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















