চীনে মানুষের মতো দেখতে ও চলাফেরা করতে সক্ষম রোবট নিয়ে সামরিক গবেষণা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে এসব রোবটকে সেনাদের সঙ্গে কাজ করানো থেকে শুরু করে শত্রুর অবস্থানে প্রবেশ এবং শহুরে যুদ্ধে ব্যবহারের পরিকল্পনাও নিয়ে কাজ করছেন দেশটির সামরিক গবেষকেরা।
বিনোদনের মঞ্চ থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি
সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবসদৃশ রোবট প্রতিযোগিতায় রোবটদের দৌড়ানো, বক্সিং, কুংফু ও নাচসহ নানা কর্মকাণ্ড করতে দেখা যায়। প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিন পর চীনের সামরিক বাহিনীর মুখপত্র গবেষণাগারে তৈরি আধুনিক প্রযুক্তিকে দ্রুত সামরিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের কাজে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।
রয়টার্সের পর্যালোচনায় শতাধিক সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত নথি, গবেষণাপত্র, পেটেন্ট, সরকারি নথি ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নথি থেকে বোঝা যায়, চীনের সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানবসদৃশ রোবটকে ভবিষ্যতের যুদ্ধে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে।
শহরের যুদ্ধে রোবট
চীনা সামরিক গবেষণায় শহুরে যুদ্ধের জন্য রোবট ব্যবহারের একটি সম্ভাব্য চিত্রও তৈরি করা হয়েছে। একটি পরিকল্পনায় ছয়টি যুদ্ধ রোবট—মানবসদৃশ রোবট, কুকুরের মতো চার পায়ে চলা রোবট ও চালকবিহীন যান—দুটি আক্রমণকারী দলের সঙ্গে কাজ করবে। তাদের দায়িত্ব হবে শত্রুর দখলে থাকা ভবনে ঢুকে তলা ও কক্ষ ধরে ধরে তল্লাশি চালানো।
গবেষকদের ধারণা, ভারসাম্য, পরিবেশ বোঝার ক্ষমতা ও দীর্ঘ সময় কাজ করার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভবন, সুড়ঙ্গ কিংবা জাহাজের ভেতরের মতো জটিল জায়গায় মানবসদৃশ রোবট কার্যকর হতে পারে। তবে সাধারণ নজরদারি বা মালামাল বহনের কাজে চার পা, চাকা বা ট্র্যাকযুক্ত রোবট তুলনামূলকভাবে সস্তা ও সহজে ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
শত্রুর এলাকায় প্রবেশের মহড়া
চীনের সামরিক গবেষণায় মানবসদৃশ রোবটের ব্যবহার শুধু ভবন দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালে একটি সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিযোগিতায় রোবটকে শত্রুর পেছনের এলাকায় প্রবেশ, সেই এলাকার মানচিত্র তৈরি এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজে বের করার মতো কাজের অনুকরণ করানো হয়। সামরিক ঘাঁটিতে পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা টহল ও শৃঙ্খলা পরিদর্শনের কাজও রোবটের সম্ভাব্য দায়িত্ব হিসেবে দেখানো হয়েছে।
একই সময়ে সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত নথিতেও মানবসদৃশ রোবটের প্রতি আগ্রহের প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের মে মাসে চীনের সামরিক বাহিনী একটি মানবসদৃশ রোবট কেনা, স্থাপন ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য দরপত্র দেয়। চলতি বছরের জুনে রোবটের জন্য ক্যামেরা, রাডার ও চলাচলসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও শ্রেণিবিন্যাসের একটি ব্যবস্থার জন্য প্রায় তিন লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দের তথ্যও পাওয়া গেছে।
মানুষ দূরে, রোবট সামনে
চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পও এখন এই প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের তৈরি ‘ফুসি’ নামের মানবসদৃশ রোবটকে পাহারা, সব আবহাওয়ায় নজরদারি, টহল এবং বিপজ্জনক কাজে ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। রোবটটিকে দূর থেকে মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
দূরনিয়ন্ত্রণের এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনো মানবসদৃশ রোবটের বড় সীমাবদ্ধতা। একজন মানুষ দূর থেকে রোবট পরিচালনা করলে যুদ্ধক্ষেত্রে রোবটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
এখনো বড় বাধা প্রযুক্তি
তবে যুদ্ধক্ষেত্রে মানবসদৃশ রোবট ব্যবহারের বাস্তবতা এখনো অনেক দূরে। চীনের কোনো সশস্ত্র মানবসদৃশ রোবট বর্তমানে সামরিক ইউনিটে কার্যকরভাবে মোতায়েন হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রোবটগুলো এখনো বেশি শক্তি ব্যবহার করে এবং নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনীর বাইরে অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়তে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রের অনিশ্চিত পরিবেশ তাদের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, উৎপাদন ব্যয় কমে যাওয়া এবং ব্যাপক উৎপাদন সম্ভব হলে মানবসদৃশ রোবট সামরিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নৈতিকতা
যুদ্ধক্ষেত্রে রোবট ব্যবহারের সঙ্গে শুধু প্রযুক্তিগত নয়, নৈতিক প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। যুদ্ধের আইন অনুযায়ী বেসামরিক মানুষ ও যোদ্ধার মধ্যে পার্থক্য করা এবং আহত বা আত্মসমর্পণকারী যোদ্ধাকে আক্রমণ না করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় রোবট এসব জটিল পরিস্থিতি কতটা সঠিকভাবে বুঝতে পারবে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
চীনের সামরিক গবেষকেরাও স্বীকার করছেন, মানবসদৃশ রোবটের চলাচল, পরিবেশ বোঝা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায় এখনো বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। এসব বাধা কাটিয়ে উঠতে পারলে ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক মানবসদৃশ রোবট দেখা যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















