হোমারের মহাকাব্য ওডিসিকে ঘিরে হলিউডে নতুন বিতর্কের মধ্যে এবার নিজস্ব সংস্করণ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ চলচ্চিত্রে কাস্টিং নিয়ে ডানপন্থী মহলে যে সমালোচনা শুরু হয়েছিল, তারই প্রেক্ষাপটে মাস্ক জানিয়েছেন, তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘গ্রোক ইমাজিন’ বছরের শেষ হওয়ার আগেই হোমারের শিল্পকর্মের প্রতি বিশ্বস্ত এবং ‘ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল’ একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করবে।
এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে মাস্ক জানান, প্রকল্পটির কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ঘোষণার সঙ্গে একটি তিন মিনিটের ভিডিওও শেয়ার করা হয়, যেখানে এআই-নির্মিত ওডিসিউস, পেনেলোপি ও ক্যালিপসোর দৃশ্য দেখানো হয়েছে।
নোলানের কাস্টিং ঘিরে বিতর্ক
নোলানের নতুন চলচ্চিত্রে হেলেন অব ট্রয়ের চরিত্রে কেনিয়া-মেক্সিকান অভিনেত্রী লুপিতা নিয়ঙ্গ’ওকে নেওয়ার পরই বিতর্কের সূত্রপাত। যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী ভাষ্যকারদের একাংশ দাবি করেন, গ্রিক পুরাণের এই চরিত্রকে শ্বেতাঙ্গ হিসেবেই দেখানো উচিত ছিল। মাস্কও প্রকাশ্যে সেই সমালোচনার সঙ্গে একমত হন।

তবে এই বিতর্ককে অতিরঞ্জিত বলেই মনে করেন খ্যাতিমান ক্লাসিসিস্ট ও অনুবাদক ড্যানিয়েল মেন্ডেলসন, যিনি গত বছর ওডিসির নতুন ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেছেন।
‘ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল’ দাবি কতটা বাস্তব?
মেন্ডেলসনের মতে, ওডিসির একেবারে ‘ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল’ সংস্করণ তৈরি করার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, মহাকাব্যটি নিজেই গ্রিক ইতিহাসের বিভিন্ন যুগ, সংস্কৃতি ও সামরিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সাহিত্যকর্ম। এতে ব্যবহৃত অস্ত্র, যুদ্ধের ধরন, সামাজিক রীতি কিংবা পোশাক—সবই ভিন্ন ভিন্ন সময়ের উপাদান বহন করে।
তার ভাষায়, তাই এমন কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতা নেই, যার সঙ্গে ওডিসিকে পুরোপুরি মিলিয়ে দেখা সম্ভব।
এআই সংস্করণে কী নজরে পড়ল
মাস্কের শেয়ার করা ভিডিওতে কিছু বিষয় মেন্ডেলসনের ভালো লেগেছে, আবার কিছু বিষয় নিয়ে তিনি আপত্তিও তুলেছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গ্রিক যোদ্ধাদের হাতে লম্বা হাতাযুক্ত পোশাক দেখানো হয়েছে, অথচ প্রাচীন গ্রিকদের পোশাকে হাতা ছিল না; সেটি ছিল মূলত পারসিকদের বৈশিষ্ট্য।
অন্যদিকে স্বর্ণখচিত বর্ম বা রাজপ্রাসাদের জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশকে তিনি হোমারের কল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করেন। তার মতে, হোমারের জগৎ ছিল উজ্জ্বল, রূপকথার মতো সমৃদ্ধ এবং অলংকৃত।

নোলানের চলচ্চিত্র নিয়ে আরেকটি মন্তব্যে তিনি বলেন, ছবিটির রঙ ও আলোকায়ন এতটাই গাঢ় যে অনেক দৃশ্য স্পষ্টভাবে বোঝাই কঠিন।
চরিত্র ও ইতিহাস নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
মেন্ডেলসনের মতে, প্রাচীন গ্রিসের চরিত্রগুলো পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ হওয়ায় তারা শ্বেতাঙ্গই ছিলেন। তবে সেই সমাজ বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। আধুনিক চলচ্চিত্রে বহু বছর ধরেই বর্ণনিরপেক্ষ কাস্টিং প্রচলিত রয়েছে। তাই হেলেন অব ট্রয়ের চরিত্রে লুপিতা নিয়ঙ্গ’ওকে নেওয়াকে তিনি বড় কোনো সমস্যা হিসেবে দেখেন না। বিশেষ করে চলচ্চিত্রটিতে চরিত্রটির উপস্থিতিও খুব সীমিত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নোলানের ছবিতে কিছু চরিত্র ও সংলাপ সরাসরি হোমারের নয়; ভার্জিলের ‘অ্যানিড’ এবং ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘ডক্টর ফস্টাস’-এর মতো পরবর্তী সাহিত্য থেকেও কিছু উপাদান নেওয়া হয়েছে।
ওডিসিউসের চরিত্র নিয়েও আপত্তি
মেন্ডেলসনের মতে, নোলানের উপস্থাপনায় ওডিসিউসকে অপরাধবোধে ভোগা এক যোদ্ধা হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু হোমারের রচনায় তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল বুদ্ধিমত্তা, কৌশল, রসবোধ এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব।

তার মতে, যদি মাস্ক সত্যিই আরেকটি ওডিসি নির্মাণ করতে চান, তাহলে সেখানে এই বৈশিষ্ট্যগুলোকেই গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে তিনি রসিকতার সুরে যোগ করেন, সত্যিকার ঐতিহাসিক নির্ভুলতা চাইলে পুরো চলচ্চিত্রই প্রাচীন গ্রিক ভাষায় নির্মাণ করতে হবে।
ক্রিস্টোফার নোলানের চলচ্চিত্রকে ঘিরে চলমান বিতর্কের মধ্যেই মাস্কের এআই-নির্ভর এই উদ্যোগ প্রযুক্তি, ইতিহাস ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির সংযোগস্থলে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নোলানের ‘ওডিসি’কে ঘিরে বিতর্কের মধ্যে ইলন মাস্ক এআই দিয়ে ‘ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল’ সংস্করণ তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন, যদিও বিশেষজ্ঞরা সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলেছেন।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















