সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলতে শুরু করার পর এবার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে আরেকটি বিরল বন্যপ্রাণীর ভিডিও। একটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা ২৭ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের একটি খালে লবণপানির কুমির একটি ছাগল খাচ্ছে। ভিডিওটি প্রকাশের পর সুন্দরবনে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা অনেক পর্যটকের মধ্যেও কৌতূহলের পাশাপাশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনাটি শনিবার দুপুরে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ধানসাগর এলাকার ধাংমারী খালের ঘাগড়ামারী বন কার্যালয়ের কাছে ধারণ করা হয়। কেওড়ামাল অভিমুখে নৌকাভ্রমণে থাকা এক পর্যটক মোবাইল ফোনে পুরো দৃশ্যটি ধারণ করেন। পরে সেটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ
ঘাগড়ামারী খেজুরিয়া ঘাট এলাকার বনবিবি রিসোর্টের মালিক মো. সাকিব হোসেন জানান, পাঁচ সদস্যের একটি পর্যটক দল শুক্রবার রিসোর্টে ওঠেন। শনিবার দুপুরের দিকে তারা দেশীয় নৌকায় করে করমজলের দিকে যাচ্ছিলেন। পথেই একজন পর্যটক খালের মধ্যে একটি কুমিরকে ছাগল খেতে দেখে ভিডিও ধারণ করেন। পরে সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সাকিব জানান, ধাংমারী খালের পাশেই কয়েকটি গ্রামের অবস্থান। এসব এলাকার ছাগল ও গবাদিপশু প্রায়ই খালের ধারে ঘাস খেতে বা পানি পান করতে আসে। এ সময় কখনো কখনো কুমির ছাগল টেনে নিয়ে যায়। এমন ঘটনা নতুন নয় এবং মাঝেমধ্যেই ঘটে থাকে।
ছাগলটি কীভাবে কুমিরের শিকার হলো?
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের ঘাগড়ামারী বন টহল ফাঁড়ির ইনচার্জ শাহ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, ভিডিওটি ধাংমারী ডলফিন অভয়ারণ্য এলাকায় ধারণ করা হয়েছে এবং পরে বন কর্মকর্তাদের কাছেও পৌঁছায়।

তবে তিনি বলেন, ভিডিও দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না ছাগলটিকে কুমির শিকার করেছিল, নাকি সেটি আগে থেকেই মৃত ছিল। অনেক সময় ছাগল পানি পান করতে এসে কুমিরের আক্রমণের শিকার হয়। আবার কখনো স্থানীয়রা মৃত ছাগল বা গবাদিপশুর দেহ খালে ফেলে দেন। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সুন্দরবনে কুমিরের অবস্থান
করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ইনচার্জ আজাদ কবির জানান, সুন্দরবনের নদী ও খালে লবণপানির কুমির স্বাভাবিকভাবেই বসবাস করে। বর্তমানে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে মোট ৭৯টি কুমির রয়েছে। এর মধ্যে তিনটির বয়স ৩৬ থেকে ৪৬ বছর এবং বাকি ৭৬টির বয়স তিন থেকে ১০ বছরের মধ্যে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে জন্ম নেওয়া ২০৯টি কুমির সুন্দরবনের নদী ও খালে অবমুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রাকৃতিক পরিবেশে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তবে বর্তমানে সুন্দরবনের বন্য পরিবেশে ঠিক কতটি কুমির রয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই।
সাম্প্রতিক বন্যপ্রাণী দেখা যাওয়ার ধারাবাহিকতা
সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বন্যপ্রাণী দেখা যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। গত ২৬ জুলাই কোচিখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে নদী সাঁতরে পার হতে দেখা যায়। এর আগে ২৪ জুলাই চাঁদপাই রেঞ্জের আঁধারমানিক পর্যটন এলাকার বন বিভাগের একটি কার্যালয়ের কাছে আরেকটি বাঘ ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়, যার ভিডিও বনকর্মীরা মোবাইল ফোনে ধারণ করেন।
বন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় পর্যটক ও বনকর্মীরা একাধিকবার বাঘ দেখার তথ্য জানিয়েছেন। এবার সেই ধারাবাহিকতায় কুমিরের এই ভিডিওও সুন্দরবনের সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণী বৈচিত্র্যের আরেকটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















