চট্টগ্রাম ওয়াসার আবাসিক ও বাণিজ্যিক—উভয় শ্রেণির গ্রাহকের পানির মূল্য ৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির দাবি, অদক্ষ প্রশাসন, অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে পানির দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে তারা নগরবাসীর জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করে মূল্য বৃদ্ধির উদ্যোগকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেছে।
শনিবার অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম ওয়াসার বোর্ড সভায় পানির মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবের পর ২ আগস্ট গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ক্যাব এ প্রতিক্রিয়া জানায়। বিবৃতিতে সংগঠনটি অভিযোগ করে, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম বোর্ড সভায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করার পরিকল্পনা না নিয়ে গ্রাহকদের ওপর নতুন করে মূল্য বৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
অদক্ষতা ও অনিয়মের অভিযোগ
ক্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার ৬৩ বছর পরও চট্টগ্রাম ওয়াসা নগরবাসীর চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়নি। এখনও প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। সংগঠনটির অভিযোগ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহর দীর্ঘ ১৫ বছরের দায়িত্বকালে প্রশাসনিক অদক্ষতা, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং গ্রাহকস্বার্থ উপেক্ষার কারণে প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিগত ১৭ বছরের অনিয়ম, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে পানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগ জনস্বার্থবিরোধী। এ প্রস্তাব প্রত্যাহারে সরকারের হস্তক্ষেপও কামনা করেছে সংগঠনটি।
সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপের আশঙ্কা
ক্যাবের নেতারা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও বিভিন্ন সেবার মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে ওয়াসার পানির মূল্য বাড়ানো হলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। তারা এ উদ্যোগকে জনবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন।
পুরোনো অভিযোগের তদন্ত দাবি
বিবৃতিতে ২০১৯ সালের ২৫ মে অনুষ্ঠিত ওয়াসার ৫১তম বোর্ড সভায় উত্থাপিত গড় বিল সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। ক্যাবের দাবি, সে সময় অভিযোগ ওঠে যে প্রায় ২৭ হাজার গ্রাহক পাঁচ ইউনিট পানি ব্যবহার করেও ৩০ ইউনিটের বিল পরিশোধ করেছেন। বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন হলেও এখন পর্যন্ত এর প্রকৃত সত্য উদঘাটন বা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া গড় বিল আদায়, পানির উৎপাদন ও বিতরণে অনিয়ম, তথ্যভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণের অভাবসহ বিভিন্ন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটি এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপও কামনা করেছে।
সেবা ও প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন
ক্যাব অভিযোগ করেছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এখনও পানির সংকট, ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি এবং লবণাক্ত পানির সমস্যা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে পানির লিকেজের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানি অপচয় হচ্ছে। হালিশহর এলাকায় পানির লাইনের সঙ্গে স্যুয়ারেজ লাইনের সংযোগের কারণে গত বছর পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
সংগঠনটি আরও দাবি করে, ওয়াসার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিধানও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ক্যাবের বক্তব্য, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্বে ক্যাবের ভূমিকা স্বীকৃত হলেও চট্টগ্রাম ওয়াসার বোর্ডে সেই বিধান কার্যকর করা হয়নি।
বিবৃতিতে ক্যাবের কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রাম বিভাগের একাধিক নেতা স্বাক্ষর করেন। তারা চট্টগ্রাম ওয়াসাকে একটি জবাবদিহিমূলক ও ভোক্তাবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি জানান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















