বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পকে ঘিরে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘প্যাক্স সিলিকা’ (Pax Silica) উদ্যোগের সম্ভাব্য অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গর। তার ভাষায়, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে দেশটি এই উদ্যোগের অংশীদার হতে পারে।
শনিবার প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে সার্জিও গর এই মন্তব্য করেন বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের আগ্রহের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
চীনের বিকল্প প্রযুক্তি ও সরবরাহ শৃঙ্খল
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা গত কয়েক বছরে আরও জোরদার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশ এমন একটি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামো গড়ে তুলছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, উন্নত উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় করা হবে। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো একটি মাত্র দেশের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের মধ্যে উৎপাদন ও বিনিয়োগের নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
প্যাক্স সিলিকা কী?
প্যাক্স সিলিকা প্রচলিত অর্থে কোনো মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উদ্যোগ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং ভবিষ্যতের শিল্পভিত্তিক বিনিয়োগ।
এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ আহরণ থেকে শুরু করে জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন, সেমিকন্ডাক্টর, এআই অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং লজিস্টিকস—পুরো মূল্য শৃঙ্খলকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য অপরিহার্য প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
কারা রয়েছে এই জোটে?
প্যাক্স সিলিকার প্রথম সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অস্ট্রেলিয়া অংশ নেয়। পরে ভারতও এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইতালিসহ আরও কয়েকটি দেশ সহযোগিতা সম্প্রসারণে যুক্ত হয়েছে এবং উদ্যোগটি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?
বাংলাদেশকে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা দক্ষিণ এশিয়ায় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের আগ্রহের নতুন ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক সদস্যপদের কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ভিত্তিতে অংশীদার হওয়ার সুযোগের কথা তুলে ধরেছেন সার্জিও গর।
একই সময়ে বাংলাদেশ সাংহাইভিত্তিক ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (WAICO)-এ প্রাথমিকভাবে পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এখন পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন একটি উদ্যোগ এবং চীন-সমর্থিত আরেকটি বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম—উভয়ের সঙ্গেই সম্পৃক্ত হওয়ার পথ তৈরি করছে। এই দুই পদক্ষেপ বাংলাদেশের প্রযুক্তি কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















