চট্টগ্রাম জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে। কোথাও শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে, কোথাও আবার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে পাশের বিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাস করতে হচ্ছে। শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বেসরকারি বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার বিস্তার এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব—সব মিলিয়ে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
কয়েক বছরের ব্যবধানে বড় পতন
জেলা শিক্ষা দপ্তর ও বার্ষিক বিদ্যালয় শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে চট্টগ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭০ জন। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৩১ হাজার ৯৫১ জনে এবং ২০২৪ সালে আরও নেমে আসে ৪ লাখ ১৩ হাজার ৯৫১ জনে।
২০২৫ সালে কিছুটা বেড়ে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ হলেও চলতি বছরে আবার কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪৭ জনে।

মাত্র ২০ শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে একটি বিদ্যালয়
সাতকানিয়ার উত্তর-পশ্চিম গাটিয়া চেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে মাত্র ২০ জন। ছয়টি অনুমোদিত শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন তিনজন। এটি বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম শিক্ষার্থীসংবলিত বিদ্যালয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, এলাকায় বেসরকারি বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের সেখানে ভর্তি করাচ্ছেন। কয়েক বছর আগেও বিদ্যালয়ে ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ছিল, কিন্তু প্রতি বছর সংখ্যা কমছে।
৫০০ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১০০-এরও কম
সমন্বিত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা তথ্যভান্ডারের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ২ হাজার ২৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫০০টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০০-এর নিচে।
এর মধ্যে ২২৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭০ জন বা তারও কম এবং ২১টি বিদ্যালয়ে ৫০ জনেরও কম শিক্ষার্থী রয়েছে।
বন্দর এলাকার লালদিয়ার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে কোনো শিক্ষার্থী নেই। ফলে বিদ্যালয়টি অকার্যকর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
কেন কমছে শিক্ষার্থী?
শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক কারণ একসঙ্গে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
অনেক এলাকায় বেসরকারি বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। অনেক মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিনা বেতনে পড়াশোনা, থাকা-খাওয়ার সুবিধাও থাকায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর কাছে সেগুলো আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

অভিভাবকদের অভিযোগ, অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান প্রত্যাশিত নয়। কোথাও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই, কোথাও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রীর অভাব রয়েছে। এসব কারণেও অনেক পরিবার বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নিচ্ছে।
নেই মাঠ, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও গ্রন্থাগার
চট্টগ্রামের ৫০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই। বিশেষ করে নগর এলাকায় এই সমস্যা বেশি।
এ ছাড়া ১৮টি বিদ্যালয়ে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি, ১ হাজার ১৬৬টিতে ইন্টারনেট সংযোগ নেই এবং ৯৪টিতে গ্রন্থাগারও নেই। মাত্র ৮৩৯টি বিদ্যালয়ে একসঙ্গে খেলার মাঠ, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও গ্রন্থাগারের সুবিধা রয়েছে।
ভবন সংকটে চলছে পাঠদান
চট্টগ্রামের অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন সংকট দীর্ঘদিনের।
কয়েকটি বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীরা পাশের বিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাস করছে। কোথাও আবার টিনশেড ঘরে পাঠদান চলছে।
কিছু বিদ্যালয় বছরের পর বছর অন্য প্রতিষ্ঠানের ভবনে অস্থায়ীভাবে পরিচালিত হচ্ছে। আবার কয়েকটি বিদ্যালয় জাতীয়করণ হলেও এখনো নিজস্ব ভবন পায়নি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর নগরের অন্তত ১০টি বিদ্যালয়কে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

৮২৪ বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই
চট্টগ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য অনুমোদিত প্রধান শিক্ষক পদ থাকলেও বর্তমানে ৮২৪টি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এসব বিদ্যালয় জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে পরিচালনা করছেন।
সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ১৪ হাজার ২৮৭টি পদের মধ্যে ১ হাজার ১০৮টি এখনো শূন্য রয়েছে। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় কম শিক্ষক নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে এবং ভবন সংকট নিরসনেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু তথ্যপ্রযুক্তির সরঞ্জাম দিলেই হবে না; সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং নিয়মিত তদারকি ছাড়া সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
চট্টগ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়; এটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক চ্যালেঞ্জেরও প্রতিফলন। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















