প্রতি বর্ষায় শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার মানুষের জন্য মহারশি নদী যেন নতুন করে দুর্ভোগ বয়ে আনে। মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নদীর পানি বেড়ে গেলে শুরু হয় নদীভাঙন, প্লাবিত হয় নিম্নাঞ্চল। ঝিনাইগাতী বাজারসহ নদীর দুই তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়মিত জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন ব্যবসায়ী, কৃষক ও সাধারণ বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর নাব্যতা সংকট, পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া এবং শক্তিশালী ও টেকসই বাঁধের অভাবের কারণে প্রতি বছর পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নদী পুনঃখনন, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়ে আসলেও এখনো স্থায়ী সমাধান বাস্তবায়ন হয়নি।
নদীভাঙনে দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতি
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত এক দশকে মহারশি নদীর ভাঙনে অন্তত ৫০০ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নলকুড়া ও ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের প্রায় ১০টি স্থানে নদীভাঙনের ঘটনা ঘটে।
২০২৪ সালের অক্টোবর এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভারী বৃষ্টি ও উজানের পানির চাপে নদীর দুই তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যায়। এতে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, পুকুর, বাজার, সড়ক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এসব ঘটনার পর স্থানীয় সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো গণস্বাক্ষর কর্মসূচি, স্মারকলিপি প্রদান এবং মতবিনিময় সভার মাধ্যমে নদীর দুই তীরে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানায়।
৪৮.৬৪ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, মহারশি নদীর দুই তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কার ও পুনর্বাসন এবং নদী পুনঃখননের একটি প্রকল্প প্রস্তাব ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে।
গত বছরের ২৫ নভেম্বর শেরপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) সুদীপ্ত চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে প্রায় ৪৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। প্রকল্পটি পর্যালোচনার জন্য একটি কারিগরি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কার ও পুনর্বাসনে ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। আর ১৭ কিলোমিটার নদী পুনঃখননের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ২৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি পাউবোর মহাপরিচালকের গঠিত একটি কারিগরি দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হলেও এখনো প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আকুতি

খাইলকুড়া এলাকার ব্যবসায়ী মো. বিনামিন জানান, ২০২৪ সালের অক্টোবরে নদীভাঙনে তার মুরগির খামার ও বাড়ি মুহূর্তের মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে তার প্রায় ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। মূলধনের অভাবে এখনো তিনি ব্যবসা পুনরায় শুরু করতে পারেননি। ভবিষ্যতে যেন আর কাউকে এমন ক্ষতির মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. জাহিদুল হক মনির বলেন, প্রায় প্রতি বছরই নদীর বাঁধ ভেঙে ঝিনাইগাতী সদর বাজারসংলগ্ন এলাকা প্লাবিত হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তার মতে, নদীর দুই তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং নদী পুনঃখননের বিকল্প নেই।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) সুদীপ্ত চৌধুরী জানান, বাঁধ সংস্কার, পুনর্বাসন এবং মহারশি নদী পুনঃখননের নকশা তৈরির কাজ চলছে। নকশা সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন মিললেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, তিনি একাধিকবার সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন এবং দ্রুত প্রকল্পটির অনুমোদন হবে বলে আশাবাদী।
এদিকে ২৮ জুলাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেন ঝিনাইগাতীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শনের পাশাপাশি মহারশি নদীর ভাঙনকবলিত এলাকা ঘুরে দেখেন। তিনি জানান, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে নদীভাঙন ও বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কাজ করা হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















