বাংলাদেশের সংবিধানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠককে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রস্তাব সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি বাতিলের সম্ভাবনা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহাল এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংবিধানে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং জুলাই যোদ্ধাদের অবদানও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
সংবিধানে যেসব পরিবর্তনের আলোচনা
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। অন্যদিকে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি, ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাসংক্রান্ত বিধান বাদ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতাও প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বিদ্যমান বিধান বহাল থাকতে পারে।
আরও যেসব সংস্কারের প্রস্তাব
বিশেষ কমিটির আলোচনায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার বিধান, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, একাধিক ডেপুটি স্পিকারের পদ সৃষ্টি এবং নারী সদস্যদের জন্য আসন বৃদ্ধির মতো বিষয়ও উঠে এসেছে।
এ ছাড়া নৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যদের সদস্যপদ বাতিলের নতুন বিধান যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
উচ্চ আদালতের রায়ের প্রভাব
সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠকে সংবিধানের কোন কোন অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে, সে বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়।
বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধানের প্রথম ভাগের ৪(ক), ৭(১)(ক), ৭(১)(খ), ৭(২), ৭(৩), ৭(খ) এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
একই সঙ্গে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল, যেখানে যথাক্রমে ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা সংযোজিত হয়েছিল, সেগুলোও বাদ যেতে পারে।
রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতেও পরিবর্তনের ভাবনা
সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি-সংক্রান্ত অংশেও পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিধান বহাল থাকলেও ৯ অনুচ্ছেদে থাকা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ শব্দ সংযোজনের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের ফলে নির্বাচনব্যবস্থা দলীয়করণ হয়েছে এবং এর মাধ্যমে গণতন্ত্র ও জনগণের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই রায়ে ৭(ক), ৭(খ) ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং গণভোটের বিধান পুনর্বহালের কথাও উল্লেখ করা হয়।
বিশেষ কমিটির গঠন
গত ১৩ জুলাই সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনের জন্য ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। শুরুতে ১৭ সদস্যের কমিটি গঠনের পরিকল্পনা থাকলেও বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে সদস্যদের নাম না দেওয়ায় পাঁচটি পদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এখনো সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তাদের প্রতিনিধির নাম দেয়নি।
সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবে ‘জাতির পিতা’ স্বীকৃতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, গণভোট এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে পরিবর্তনের আলোচনা সামনে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















