প্রায় ১৪০ বছর ধরে রাজধানীর অন্যতম পরিচিত সামাজিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকা ক্লাবের মেইন লাউঞ্জ। তবে ভবনটির ঐতিহ্যগত গুরুত্বের পাশাপাশি এখন সামনে এসেছে নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ। প্রাথমিক কাঠামোগত মূল্যায়নে ভবনটিকে “অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং দ্রুত বিস্তারিত প্রকৌশল মূল্যায়ন (ডিটেইলড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট-ডিইএ) করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রাথমিক মূল্যায়নে ভবনের স্টিলের অংশে মরিচা, স্ল্যাব ও বিমে ফাটল, ভারবহনকারী দেয়ালে চিড়, আর্দ্রতার কারণে ক্ষয়, কলামের অসঙ্গতি এবং অতীতে কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্ভাব্য চিহ্ন পাওয়া গেছে। মূল্যায়নকারী বিশেষজ্ঞ দলের মতে, যেহেতু ভবনের কেবল কিছু সহজে প্রবেশযোগ্য অংশ পরিদর্শন করা হয়েছে, তাই প্রকৃত অবস্থা আরও গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু মেইন লাউঞ্জ
ঢাকা ক্লাবের স্পোর্টস বিষয়ক বোর্ড সদস্য তানভীর আহমেদ জানান, ক্লাব প্রাঙ্গণে মোট ছয়টি ভবন রয়েছে—মেইন লাউঞ্জ, স্যামসাং এইচ বিল্ডিং, রয়্যাল বেঙ্গল ডাইনিং, ওয়েলনেস বিল্ডিং, গেস্ট হাউস এবং টেনিস লাউঞ্জ শেড। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় মেইন লাউঞ্জের ছাদ।
ক্লাবের সভাপতি শামীম হোসেনও বলেন, মেইন লাউঞ্জ ভবনটি দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ভবনটির অবস্থা এতটাই নাজুক যে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি জানান, অন্য ভবনগুলো কাঠামোগতভাবে স্থিতিশীল থাকলেও মেইন লাউঞ্জের বিভিন্ন স্থান দিয়ে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভবনটি বারবার মেরামত করা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
১৯৮৬ সালের সুপারিশের পরও হয়নি বড় সংস্কার
শামীম হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে স্থপতি ও কাঠামো প্রকৌশলী শহিদুল্লাহ ভবনটি পরিদর্শন করে জরুরি সংস্কারের সুপারিশ করেছিলেন। সে সময় সীমিত পরিসরে কিছু মেরামত করা হয় এবং ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে তা প্রায় ১০ বছর কার্যকর থাকবে।
কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে প্রায় চার দশক কেটে গেলেও আর কোনো বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে ভবনটি সদস্য, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অতিথিদের ব্যবহারের জন্য খোলা ছিল।
বিস্তারিত প্রকৌশল মূল্যায়নের সুপারিশ
বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে ভবনটি ভেঙে ফেলার কোনো সুপারিশ করা হয়নি। বরং ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মানুষের প্রবেশ সীমিত করে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ডিটেইএ পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমিত পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ সম্ভব নয়। পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল মূল্যায়নের মাধ্যমেই ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার পরিকল্পনা নির্ধারণ করা যাবে।
সংস্কার পরিকল্পনা আইনি জটিলতায় থমকে
ক্লাব কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমান নির্বাহী কমিটি ভবনের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের অনুমোদনের জন্য একটি বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আহ্বানের উদ্যোগ নিয়েছিল।
তবে সভাপতি শামীম হোসেনের অভিযোগ, আটজন সদস্য আদালতে গিয়ে ইজিএম স্থগিত করার আবেদন করেন, ফলে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়। তাঁর মতে, ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের যথাযথ স্থান ছিল ইজিএম। তিনি আরও দাবি করেন, বিষয়টি রাষ্ট্রীয় ইস্যু না হলেও আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেলের উপস্থিতি ছিল অস্বাভাবিক।
তবে এ বিষয়ে বিরোধী পক্ষের মামলা বা তাদের বিস্তারিত যুক্তি পর্যালোচনার জন্য কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার দ্বৈত চ্যালেঞ্জ
ঢাকা ক্লাবের মেইন লাউঞ্জ কোনো পরিত্যক্ত ভবন নয়; এটি এখনও সদস্য, অতিথি ও কর্মীদের নিয়মিত ব্যবহৃত একটি স্থাপনা। ফলে বিষয়টি কেবল একটি ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণের প্রশ্ন নয়, বরং প্রতিদিন ভবনটি ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল মূল্যায়ন সম্পন্ন করে ভবিষ্যৎ বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা ক্লাবের এই ঐতিহাসিক স্থাপনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে যাচ্ছে।
ঢাকার ঐতিহাসিক ঢাকা ক্লাবের ১৪০ বছরের মেইন লাউঞ্জ ভবনকে প্রাথমিক মূল্যায়নে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। দ্রুত বিস্তারিত প্রকৌশল মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















