০৭:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬
শেখ হাসিনা ফিরলে আবারও রক্তপাত হবে, কাউকে রেহাই দেবেন না: রিজভী বিজয় সরকারের প্রথম বাজেটে জনকল্যাণ ও আর্থিক শৃঙ্খলার সমন্বয়ের চেষ্টা জ্বালানির দাম বাড়ার জন্য তেল কোম্পানি নয়, নীতিনির্ধারণের মূল্যই দিচ্ছে বিশ্ব সংসদ অচলাবস্থা কাটাতে রাহুলের সঙ্গে বৈঠক, বিরোধীদের শর্তে চাপে সরকার তসলিমা নাসরিনের কলকাতা প্রত্যাবর্তন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ইমেশা দুলানি সপ্তাহের সেরা ক্রিকেটার: অপরাজিত শতকে পাকিস্তানকে হারিয়ে শ্রীলঙ্কার দাপুটে জয় যৌন সহিংসতা, উপনিবেশবাদ ও ফিলিস্তিন: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এক অন্ধকার ইতিহাস পশ্চিম আফ্রিকার কাদামাটি কচ্ছপ: কাদার আড়ালে টিকে থাকার এক বিস্ময় উচ্চশিক্ষায় নতুন সমীকরণ, বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া চীনের পাল্টা পদক্ষেপে স্পষ্ট বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন কৌশল

প্রোটিনের নীরব সংকট: মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের চাপে ঝুঁকিতে বাংলাদেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশে শিশু অপুষ্টি নিয়ে আলোচনা সাধারণত খর্বাকৃতি (স্টান্টিং), কম ওজন বা তীব্র অপুষ্টিকে কেন্দ্র করেই হয়। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আড়ালে আরও গভীর একটি সংকট দ্রুত বিস্তার লাভ করছে—প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ও মানসম্মত প্রোটিনের অভাব। গত দুই বছরে অস্বাভাবিক খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা, যাদের খাদ্যতালিকা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ডিম, মাছ, মাংস, দুধ ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বিশ্বব্যাংক এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর গবেষণা ও বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশ অপুষ্টি কমাতে অগ্রগতি অর্জন করলেও শিশুদের খাদ্যে বৈচিত্র্য ও প্রাণিজ প্রোটিনের ঘাটতি এখনও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে এই সংকট আরও দ্রুত গভীর হচ্ছে।

পেট ভরছে, কিন্তু শরীর গড়ছে না

বাংলাদেশের অধিকাংশ নিম্নআয়ের পরিবার এখনও ভাতনির্ভর খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শিশুদের শরীর ও মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশের জন্য শুধু ক্যালরি নয়, প্রয়োজন উচ্চমানের প্রোটিন ও অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড।

পুষ্টিবিদদের মতে, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ডাল ও ডালজাতীয় খাদ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে না পেলে শিশুর শরীরে নতুন কোষ তৈরি, পেশি গঠন, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে শিশু হয়তো ক্ষুধা মেটাতে পারছে, কিন্তু তার শরীর ও মেধার পূর্ণ বিকাশ হচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং সুস্থ হতেও বেশি সময় লাগে।

বাংলাদেশের বর্তমান দারিদ্র্য পরিস্থিতি - ড. মুহাম্মদ নাজমুস সাকিব

জীবনের প্রথম এক হাজার দিনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

আইসিডিডিআর,বি বহু বছর ধরে গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়ে আসছে, গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত—এই প্রথম এক হাজার দিনই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে তার প্রভাব পরবর্তী জীবনে পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য স্থানীয়ভাবে তৈরি রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড (RUTF) নিয়ে আইসিডিডিআর,বি যে গবেষণা করছে, সেটিও বাংলাদেশের অপুষ্টি সমস্যার গভীরতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

দুই বছরের মূল্যস্ফীতি বদলে দিয়েছে শিশুদের খাদ্যতালিকা

২০২৪ ও ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে ছিল। চাল, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ডাল ও ভোজ্যতেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একই সময়ে অনেক পরিবারের প্রকৃত আয় কমেছে, কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং নতুন করে বহু মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে।

ফলে অধিকাংশ পরিবার প্রথমেই ব্যয় কমিয়েছে অপেক্ষাকৃত দামি কিন্তু পুষ্টিকর খাবারের ক্ষেত্রে। আগে সপ্তাহে তিন-চার দিন ডিম বা মাছ খাওয়া যে পরিবারগুলোর পক্ষে সম্ভব ছিল, এখন অনেকেই তা সপ্তাহে এক-দুদিনে নামিয়ে এনেছে। মাংস অনেক পরিবারের জন্য প্রায় বিলাসপণ্যে পরিণত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে শিশুরা। কারণ বেড়ে ওঠার সময় তাদের শরীরে প্রোটিনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

নতুন ঝুঁকিতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার

অপুষ্টিকে সাধারণত দরিদ্র মানুষের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি বড় অংশও একই ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবারগুলোর অনেকেই সরকারি সামাজিক সুরক্ষা বা পুষ্টি কর্মসূচির আওতায় আসে না। আবার বাজারমূল্যে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সামর্থ্যও তাদের নেই। ফলে তারা এক ধরনের “অদৃশ্য পুষ্টি সংকট”-এর মধ্যে বাস করছে।

অনেক পরিবার দিনে তিন বেলা খাবার খেতে পারলেও সেই খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন নেই। এটিই আন্তর্জাতিকভাবে “হিডেন হাঙ্গার” বা লুকানো অপুষ্টি হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ৩ জন শিশুর মধ্যে ২ জন সুষম খাদ্য সংকটের  সম্মুখীন – ইউনিসেফ

উদ্বেগজনক চিত্র

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখনও খর্বাকৃতির। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু কম ওজন ও তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের বড় অংশ ন্যূনতম বৈচিত্র্যময় খাদ্য পায় না। ইউনিসেফের “চাইল্ড ফুড পোভার্টি” বিশ্লেষণ বলছে, বিপুলসংখ্যক শিশু এমন খাদ্য গ্রহণ করছে, যেখানে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান নেই।

খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

শুধু স্বাস্থ্য নয়, মেধাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়

প্রোটিনের ঘাটতি শুধু শরীরের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয় না।

শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ধীর হয়ে যায়, শেখার সক্ষমতা কমে, মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষাগত ফলাফলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ বলছে, শৈশবের অপুষ্টির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কর্মজীবন পর্যন্ত গড়ায়। একজন অপুষ্ট শিশু বড় হয়ে তুলনামূলক কম উৎপাদনশীল কর্মীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, শিশু অপুষ্টি শুধু স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও অন্যতম বড় বাধা।

যে দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি নিয়ে বড় হতে পারে না, সেখানে ভবিষ্যতের শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা কমে যায়, স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় দ্রুত না বাড়লে আগামী কয়েক বছরে শিশুদের প্রোটিন ঘাটতিজনিত অপুষ্টি আরও বাড়তে পারে।

Toxic Food Pairing | Foods You Should Never Combine With Milk dgtl -  Anandabazar

এখন কী করা জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খাদ্য সহায়তা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

তাদের মতে—

  • ডিম, দুধ, মাছ, ডাল ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে।
  • গর্ভবতী নারী ও দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পুষ্টি কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।
  • দরিদ্রের পাশাপাশি নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকেও পুষ্টি সহায়তার আওতায় আনতে হবে।
  • স্কুলভিত্তিক পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
  • শিশু খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
  • খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারকে জাতীয় পুষ্টি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

একটি নীরব সংকটের সামনে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ গত দুই দশকে শিশু অপুষ্টি কমাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু গত দুই বছরের অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি এবং দারিদ্র্যের চাপ সেই অগ্রগতির একটি অংশকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

আজ যে শিশুটি প্রতিদিন পর্যাপ্ত প্রোটিন পাচ্ছে না, সে শুধু অপুষ্টির শিকার নয়; তার শারীরিক বৃদ্ধি, মেধা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, শিক্ষাজীবন এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—এটি শুধু স্বাস্থ্যগত সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে প্রোটিনের এই নীরব সংকট আগামী প্রজন্মের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

শেখ হাসিনা ফিরলে আবারও রক্তপাত হবে, কাউকে রেহাই দেবেন না: রিজভী

প্রোটিনের নীরব সংকট: মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের চাপে ঝুঁকিতে বাংলাদেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ

০৫:০৬:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে শিশু অপুষ্টি নিয়ে আলোচনা সাধারণত খর্বাকৃতি (স্টান্টিং), কম ওজন বা তীব্র অপুষ্টিকে কেন্দ্র করেই হয়। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আড়ালে আরও গভীর একটি সংকট দ্রুত বিস্তার লাভ করছে—প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ও মানসম্মত প্রোটিনের অভাব। গত দুই বছরে অস্বাভাবিক খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা, যাদের খাদ্যতালিকা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ডিম, মাছ, মাংস, দুধ ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বিশ্বব্যাংক এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর গবেষণা ও বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশ অপুষ্টি কমাতে অগ্রগতি অর্জন করলেও শিশুদের খাদ্যে বৈচিত্র্য ও প্রাণিজ প্রোটিনের ঘাটতি এখনও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে এই সংকট আরও দ্রুত গভীর হচ্ছে।

পেট ভরছে, কিন্তু শরীর গড়ছে না

বাংলাদেশের অধিকাংশ নিম্নআয়ের পরিবার এখনও ভাতনির্ভর খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শিশুদের শরীর ও মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশের জন্য শুধু ক্যালরি নয়, প্রয়োজন উচ্চমানের প্রোটিন ও অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড।

পুষ্টিবিদদের মতে, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ডাল ও ডালজাতীয় খাদ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে না পেলে শিশুর শরীরে নতুন কোষ তৈরি, পেশি গঠন, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে শিশু হয়তো ক্ষুধা মেটাতে পারছে, কিন্তু তার শরীর ও মেধার পূর্ণ বিকাশ হচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং সুস্থ হতেও বেশি সময় লাগে।

বাংলাদেশের বর্তমান দারিদ্র্য পরিস্থিতি - ড. মুহাম্মদ নাজমুস সাকিব

জীবনের প্রথম এক হাজার দিনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

আইসিডিডিআর,বি বহু বছর ধরে গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়ে আসছে, গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত—এই প্রথম এক হাজার দিনই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে তার প্রভাব পরবর্তী জীবনে পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য স্থানীয়ভাবে তৈরি রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড (RUTF) নিয়ে আইসিডিডিআর,বি যে গবেষণা করছে, সেটিও বাংলাদেশের অপুষ্টি সমস্যার গভীরতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

দুই বছরের মূল্যস্ফীতি বদলে দিয়েছে শিশুদের খাদ্যতালিকা

২০২৪ ও ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে ছিল। চাল, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ডাল ও ভোজ্যতেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একই সময়ে অনেক পরিবারের প্রকৃত আয় কমেছে, কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং নতুন করে বহু মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে।

ফলে অধিকাংশ পরিবার প্রথমেই ব্যয় কমিয়েছে অপেক্ষাকৃত দামি কিন্তু পুষ্টিকর খাবারের ক্ষেত্রে। আগে সপ্তাহে তিন-চার দিন ডিম বা মাছ খাওয়া যে পরিবারগুলোর পক্ষে সম্ভব ছিল, এখন অনেকেই তা সপ্তাহে এক-দুদিনে নামিয়ে এনেছে। মাংস অনেক পরিবারের জন্য প্রায় বিলাসপণ্যে পরিণত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে শিশুরা। কারণ বেড়ে ওঠার সময় তাদের শরীরে প্রোটিনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

নতুন ঝুঁকিতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার

অপুষ্টিকে সাধারণত দরিদ্র মানুষের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি বড় অংশও একই ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবারগুলোর অনেকেই সরকারি সামাজিক সুরক্ষা বা পুষ্টি কর্মসূচির আওতায় আসে না। আবার বাজারমূল্যে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সামর্থ্যও তাদের নেই। ফলে তারা এক ধরনের “অদৃশ্য পুষ্টি সংকট”-এর মধ্যে বাস করছে।

অনেক পরিবার দিনে তিন বেলা খাবার খেতে পারলেও সেই খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন নেই। এটিই আন্তর্জাতিকভাবে “হিডেন হাঙ্গার” বা লুকানো অপুষ্টি হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ৩ জন শিশুর মধ্যে ২ জন সুষম খাদ্য সংকটের  সম্মুখীন – ইউনিসেফ

উদ্বেগজনক চিত্র

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখনও খর্বাকৃতির। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু কম ওজন ও তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের বড় অংশ ন্যূনতম বৈচিত্র্যময় খাদ্য পায় না। ইউনিসেফের “চাইল্ড ফুড পোভার্টি” বিশ্লেষণ বলছে, বিপুলসংখ্যক শিশু এমন খাদ্য গ্রহণ করছে, যেখানে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান নেই।

খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

শুধু স্বাস্থ্য নয়, মেধাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়

প্রোটিনের ঘাটতি শুধু শরীরের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয় না।

শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ধীর হয়ে যায়, শেখার সক্ষমতা কমে, মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষাগত ফলাফলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ বলছে, শৈশবের অপুষ্টির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কর্মজীবন পর্যন্ত গড়ায়। একজন অপুষ্ট শিশু বড় হয়ে তুলনামূলক কম উৎপাদনশীল কর্মীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, শিশু অপুষ্টি শুধু স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও অন্যতম বড় বাধা।

যে দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি নিয়ে বড় হতে পারে না, সেখানে ভবিষ্যতের শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা কমে যায়, স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় দ্রুত না বাড়লে আগামী কয়েক বছরে শিশুদের প্রোটিন ঘাটতিজনিত অপুষ্টি আরও বাড়তে পারে।

Toxic Food Pairing | Foods You Should Never Combine With Milk dgtl -  Anandabazar

এখন কী করা জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খাদ্য সহায়তা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

তাদের মতে—

  • ডিম, দুধ, মাছ, ডাল ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে।
  • গর্ভবতী নারী ও দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পুষ্টি কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।
  • দরিদ্রের পাশাপাশি নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকেও পুষ্টি সহায়তার আওতায় আনতে হবে।
  • স্কুলভিত্তিক পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
  • শিশু খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
  • খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারকে জাতীয় পুষ্টি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

একটি নীরব সংকটের সামনে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ গত দুই দশকে শিশু অপুষ্টি কমাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু গত দুই বছরের অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি এবং দারিদ্র্যের চাপ সেই অগ্রগতির একটি অংশকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

আজ যে শিশুটি প্রতিদিন পর্যাপ্ত প্রোটিন পাচ্ছে না, সে শুধু অপুষ্টির শিকার নয়; তার শারীরিক বৃদ্ধি, মেধা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, শিক্ষাজীবন এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—এটি শুধু স্বাস্থ্যগত সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে প্রোটিনের এই নীরব সংকট আগামী প্রজন্মের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারে।