০৫:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
হিটলারের ভি-২ রকেট চুরি: মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পোলিশ প্রতিরোধযোদ্ধাদের অবিশ্বাস্য অভিযান যুদ্ধ, তেল আর জলবায়ু: মানুষের সংকটই কি জ্বালানি কোম্পানির সোনালি সময়? ৯০ কোটি ডলারের রোবট বাজি: ডিপসিক থেকে টেনসেন্ট—চীনের সব বড় শক্তি কেন ইউনিট্রির পাশে? জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হস্তক্ষেপেও থামছে না ইয়েনের পতন, আস্থার সংকটেই কি আসল সমস্যা? থাইল্যান্ড সীমান্ত বন্ধ, জাপানি কোম্পানির ভরসা এখন কম্বোডিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর প্রধানমন্ত্রী: একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অস্থিতিশীল করতে সক্রিয় চীনে গ্রীষ্মের ছুটিতে কোচিংয়ের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিক্ষক ‘এক দফা’ কোনো নেতার ঘোষণা নয়, এটি জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন: নুরুল হক নুর ১/১১-তে তারেক রহমানকে ‘আয়নাঘরে’ আটকে নির্যাতন: চিফ প্রসিকিউটর কুমিল্লায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২০ কিলোমিটারের বেশি যানজট, দুর্ভোগে যাত্রী-চালক

ভারতের পরমাণু সাবমেরিনে নতুন বিপদ: পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতা কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে?

দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু প্রতিযোগিতা এতদিন মূলত স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু ভারতের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনে পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের খবর সেই হিসাব বদলে দিয়েছে। এটি শুধু ভারতের দ্বিতীয় আঘাত হানার সক্ষমতাকে শক্তিশালী করছে না; একই সঙ্গে পাকিস্তানকে আরও উন্নত সামুদ্রিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে ঠেলে দিতে পারে।

আর এই প্রতিযোগিতার ছায়া ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত ছাড়িয়ে চীনের দিকেও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরমাণু প্রতিরোধের নতুন যুগ

চলতি গ্রীষ্মে ভারতের একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনে ১২টি পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের খবর প্রকাশ্যে আসে। এর কৌশলগত গুরুত্ব অস্ত্রের সংখ্যার চেয়েও বেশি। কারণ সমুদ্রের গভীরে থাকা সাবমেরিনকে শত্রুর পক্ষে শনাক্ত ও ধ্বংস করা কঠিন।

অর্থাৎ ভারত যদি প্রথমে পারমাণবিক হামলার শিকারও হয়, তবু তার সাবমেরিনভিত্তিক অস্ত্র টিকে থেকে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। সামরিক কৌশলের দৃষ্টিতে এটি একটি কার্যকর ‘সেকেন্ড-স্ট্রাইক’ সক্ষমতা—যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে প্রথম আঘাত থেকে বিরত রাখা।

India's nuclear-armed submarine accelerates arms race with Pakistan -  Nikkei Asia

কিন্তু পারমাণবিক প্রতিরোধের এই নতুন কাঠামোর সঙ্গে একটি বিপজ্জনক বাস্তবতাও যুক্ত হচ্ছে। সমুদ্রে থাকা পারমাণবিক অস্ত্র যত বেশি কার্যকর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে, সংকটের মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনাও তত বাড়তে পারে।

স্থলভিত্তিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু গভীর সমুদ্রে থাকা সাবমেরিনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। কমান্ডার যদি মনে করেন যে দেশের ওপর বড় ধরনের হামলা হয়েছে এবং স্থলভাগের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব নয়, তাহলে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

কাশ্মীরের ছায়ায় পরমাণু প্রতিযোগিতা

এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় কারণ হলো ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ৩ হাজার ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি। কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ তাদের সম্পর্ককে কয়েক দশক ধরে অস্থিতিশীল রেখেছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ১৯০ এবং পাকিস্তানের ১৭০। অর্থাৎ দুই দেশই এমন বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলেছে, যা একাধিকবার পরস্পরের ওপর ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট।

এখানেই উদ্বেগের মূল কারণ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। সীমান্ত সংঘর্ষ কিংবা আকস্মিক সামরিক উত্তেজনা অতীতে বারবার তৈরি হয়েছে। দুই দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা যখন ক্রমেই আরও গতিশীল ও টিকে থাকার মতো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন একটি সীমিত সংঘাতও দ্রুত বড় সংকটে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ছে।

পাকিস্তানও বসে নেই

ভারতের পারমাণবিক সাবমেরিন সক্ষমতার অগ্রগতি পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন চাপ তৈরি করবে—এটি অনুমান করা কঠিন নয়। ইসলামাবাদের কাছে এখনো ভারতের মতো পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন নেই। কিন্তু দেশটি তার প্রচলিত সাবমেরিন বহর দ্রুত বাড়াচ্ছে।

Military cooperation between Pakistan and China will maintain regional  peace: PLA

চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চীনের কাছ থেকে কেনা আটটি সাবমেরিনের প্রথমটি চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তানের নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে। প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় চারটি সাবমেরিন চীনে তৈরি হচ্ছে এবং বাকি চারটি পাকিস্তানে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলোর সরবরাহ ২০৩০ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা।

এই সাবমেরিনগুলোতে এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন প্রযুক্তি রয়েছে, যা এগুলোকে প্রায় দুই সপ্তাহ পানির নিচে থাকার সক্ষমতা দেয়। পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের মতো মাসের পর মাস সমুদ্রের তলদেশে থাকার ক্ষমতা না থাকলেও পাকিস্তানের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অগ্রগতি।

ফলে ভারতের নতুন সক্ষমতা পাকিস্তানকে আরও উন্নত সাবমেরিন, দীর্ঘস্থায়ী সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর সেই পথের প্রধান প্রযুক্তিগত অংশীদার যদি চীন হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক ভারসাম্য ক্রমেই বৃহত্তর এশীয় ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়বে।

চীনের ভূমিকাই কি পরবর্তী উদ্বেগ?

ভারত-পাকিস্তান পারমাণবিক প্রতিযোগিতার একটি বড় পরিবর্তন হলো, এর সঙ্গে এখন চীনের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বার্থও আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে।

পাকিস্তান চীনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক অংশীদারদের একটি। অন্যদিকে ভারত ও চীনের নিজেদের মধ্যেও দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। ফলে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভারতের প্রতিরোধক্ষমতা সম্প্রসারণ—দুটিই শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর ভারত-চীন প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্বিপক্ষীয় অস্ত্র প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে তিনটি বড় শক্তিকে জড়িয়ে ফেলতে পারে। তখন সংকট নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

যুদ্ধবিরতির বাকি সময়টুকু হরমুজ প্রণালী 'উন্মুক্ত' রাখার ঘোষণা ইরানের |  দৈনিক নয়া দিগন্ত

হরমুজ সংকটের মধ্যেই নতুন ঝুঁকি

এই পরিস্থিতির সময়কালও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মনোযোগের বড় অংশ দখল করে আছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথগুলোর একটি হিসেবে হরমুজে বড় ধরনের অস্থিরতা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ফলে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মনোযোগ যদি দীর্ঘ সময় মধ্যপ্রাচ্য ও হরমুজকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে ভারত-পাকিস্তানের পারমাণবিক উত্তেজনা তুলনামূলকভাবে আড়ালে চলে যেতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে ‘আড়ালে থাকা’ মানেই ঝুঁকি কমে যাওয়া নয়।

বরং বিপরীতটাই সত্য হতে পারে।

আলোচনায় ফেরার বিকল্প নেই

ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিযোগিতা থামানোর দায়িত্ব শুধু দুই দেশের নয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। কারণ অস্ত্র প্রতিযোগিতা কেবল নতুন অস্ত্র দিয়ে থামানো যায় না; এর জন্য রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরির প্রক্রিয়া দরকার।

একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রকে তাদের উৎক্ষেপণব্যবস্থা থেকে আলাদা রাখার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করা যেতে পারে। সংকটের সময় সামরিক যোগাযোগ বজায় রাখা, ভুল সংকেতের ঝুঁকি কমানো এবং সীমান্তে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি।

INS Aridhaman: India gets third nuclear submarine with 3,500 km missile  range; here's what makes this underwater war machine special - The Economic  Times

কারণ পারমাণবিক অস্ত্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু এর ধ্বংসক্ষমতা নয়; ভুল সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনাও।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য শেষ সতর্কবার্তা

ভারতের সাবমেরিনভিত্তিক পারমাণবিক সক্ষমতা হয়তো দিল্লির কাছে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা। পাকিস্তানের কাছে এটি নতুন নিরাপত্তা হুমকি। ইসলামাবাদের পাল্টা সামরিক প্রস্তুতি আবার দিল্লির উদ্বেগ বাড়াবে। আর এই প্রতিক্রিয়া যদি চীনের সামরিক সহায়তার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠবে।

এটি এমন এক প্রতিযোগিতা, যেখানে কোনো পক্ষই নিজেকে দুর্বল দেখাতে চাইবে না। কিন্তু সবাই যদি নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াতে থাকে, তাহলে সামগ্রিকভাবে অঞ্চলটি আরও অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানের সামনে তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কে কত বেশি অস্ত্র মোতায়েন করতে পারবে, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—কত দ্রুত তারা এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে পারবে, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র যুদ্ধ ঠেকানোর উপায় হয়ে থাকবে, যুদ্ধের সূচনাকারী ভুলের কারণ হবে না।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও অপেক্ষা করার সুযোগ সীমিত। হরমুজ, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অন্য কোনো বৈশ্বিক সংকট যতই জরুরি হোক, দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক ঝুঁকি উপেক্ষা করার মতো নয়।

কারণ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পরবর্তী সংঘাত যদি শুধু সীমান্তে শুরু হয়, তার পরিণতি সীমান্তেই থেমে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা এখন আর দেওয়া যায় না।

জনপ্রিয় সংবাদ

হিটলারের ভি-২ রকেট চুরি: মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পোলিশ প্রতিরোধযোদ্ধাদের অবিশ্বাস্য অভিযান

ভারতের পরমাণু সাবমেরিনে নতুন বিপদ: পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতা কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে?

০৪:০০:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু প্রতিযোগিতা এতদিন মূলত স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু ভারতের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনে পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের খবর সেই হিসাব বদলে দিয়েছে। এটি শুধু ভারতের দ্বিতীয় আঘাত হানার সক্ষমতাকে শক্তিশালী করছে না; একই সঙ্গে পাকিস্তানকে আরও উন্নত সামুদ্রিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে ঠেলে দিতে পারে।

আর এই প্রতিযোগিতার ছায়া ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত ছাড়িয়ে চীনের দিকেও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরমাণু প্রতিরোধের নতুন যুগ

চলতি গ্রীষ্মে ভারতের একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনে ১২টি পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের খবর প্রকাশ্যে আসে। এর কৌশলগত গুরুত্ব অস্ত্রের সংখ্যার চেয়েও বেশি। কারণ সমুদ্রের গভীরে থাকা সাবমেরিনকে শত্রুর পক্ষে শনাক্ত ও ধ্বংস করা কঠিন।

অর্থাৎ ভারত যদি প্রথমে পারমাণবিক হামলার শিকারও হয়, তবু তার সাবমেরিনভিত্তিক অস্ত্র টিকে থেকে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। সামরিক কৌশলের দৃষ্টিতে এটি একটি কার্যকর ‘সেকেন্ড-স্ট্রাইক’ সক্ষমতা—যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে প্রথম আঘাত থেকে বিরত রাখা।

India's nuclear-armed submarine accelerates arms race with Pakistan -  Nikkei Asia

কিন্তু পারমাণবিক প্রতিরোধের এই নতুন কাঠামোর সঙ্গে একটি বিপজ্জনক বাস্তবতাও যুক্ত হচ্ছে। সমুদ্রে থাকা পারমাণবিক অস্ত্র যত বেশি কার্যকর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে, সংকটের মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনাও তত বাড়তে পারে।

স্থলভিত্তিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু গভীর সমুদ্রে থাকা সাবমেরিনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। কমান্ডার যদি মনে করেন যে দেশের ওপর বড় ধরনের হামলা হয়েছে এবং স্থলভাগের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব নয়, তাহলে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

কাশ্মীরের ছায়ায় পরমাণু প্রতিযোগিতা

এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় কারণ হলো ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ৩ হাজার ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি। কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ তাদের সম্পর্ককে কয়েক দশক ধরে অস্থিতিশীল রেখেছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ১৯০ এবং পাকিস্তানের ১৭০। অর্থাৎ দুই দেশই এমন বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলেছে, যা একাধিকবার পরস্পরের ওপর ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট।

এখানেই উদ্বেগের মূল কারণ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। সীমান্ত সংঘর্ষ কিংবা আকস্মিক সামরিক উত্তেজনা অতীতে বারবার তৈরি হয়েছে। দুই দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা যখন ক্রমেই আরও গতিশীল ও টিকে থাকার মতো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন একটি সীমিত সংঘাতও দ্রুত বড় সংকটে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ছে।

পাকিস্তানও বসে নেই

ভারতের পারমাণবিক সাবমেরিন সক্ষমতার অগ্রগতি পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন চাপ তৈরি করবে—এটি অনুমান করা কঠিন নয়। ইসলামাবাদের কাছে এখনো ভারতের মতো পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন নেই। কিন্তু দেশটি তার প্রচলিত সাবমেরিন বহর দ্রুত বাড়াচ্ছে।

Military cooperation between Pakistan and China will maintain regional  peace: PLA

চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চীনের কাছ থেকে কেনা আটটি সাবমেরিনের প্রথমটি চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তানের নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে। প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় চারটি সাবমেরিন চীনে তৈরি হচ্ছে এবং বাকি চারটি পাকিস্তানে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলোর সরবরাহ ২০৩০ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা।

এই সাবমেরিনগুলোতে এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন প্রযুক্তি রয়েছে, যা এগুলোকে প্রায় দুই সপ্তাহ পানির নিচে থাকার সক্ষমতা দেয়। পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের মতো মাসের পর মাস সমুদ্রের তলদেশে থাকার ক্ষমতা না থাকলেও পাকিস্তানের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অগ্রগতি।

ফলে ভারতের নতুন সক্ষমতা পাকিস্তানকে আরও উন্নত সাবমেরিন, দীর্ঘস্থায়ী সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর সেই পথের প্রধান প্রযুক্তিগত অংশীদার যদি চীন হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক ভারসাম্য ক্রমেই বৃহত্তর এশীয় ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়বে।

চীনের ভূমিকাই কি পরবর্তী উদ্বেগ?

ভারত-পাকিস্তান পারমাণবিক প্রতিযোগিতার একটি বড় পরিবর্তন হলো, এর সঙ্গে এখন চীনের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বার্থও আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে।

পাকিস্তান চীনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক অংশীদারদের একটি। অন্যদিকে ভারত ও চীনের নিজেদের মধ্যেও দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। ফলে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভারতের প্রতিরোধক্ষমতা সম্প্রসারণ—দুটিই শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর ভারত-চীন প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্বিপক্ষীয় অস্ত্র প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে তিনটি বড় শক্তিকে জড়িয়ে ফেলতে পারে। তখন সংকট নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

যুদ্ধবিরতির বাকি সময়টুকু হরমুজ প্রণালী 'উন্মুক্ত' রাখার ঘোষণা ইরানের |  দৈনিক নয়া দিগন্ত

হরমুজ সংকটের মধ্যেই নতুন ঝুঁকি

এই পরিস্থিতির সময়কালও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মনোযোগের বড় অংশ দখল করে আছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথগুলোর একটি হিসেবে হরমুজে বড় ধরনের অস্থিরতা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ফলে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মনোযোগ যদি দীর্ঘ সময় মধ্যপ্রাচ্য ও হরমুজকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে ভারত-পাকিস্তানের পারমাণবিক উত্তেজনা তুলনামূলকভাবে আড়ালে চলে যেতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে ‘আড়ালে থাকা’ মানেই ঝুঁকি কমে যাওয়া নয়।

বরং বিপরীতটাই সত্য হতে পারে।

আলোচনায় ফেরার বিকল্প নেই

ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিযোগিতা থামানোর দায়িত্ব শুধু দুই দেশের নয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। কারণ অস্ত্র প্রতিযোগিতা কেবল নতুন অস্ত্র দিয়ে থামানো যায় না; এর জন্য রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরির প্রক্রিয়া দরকার।

একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রকে তাদের উৎক্ষেপণব্যবস্থা থেকে আলাদা রাখার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করা যেতে পারে। সংকটের সময় সামরিক যোগাযোগ বজায় রাখা, ভুল সংকেতের ঝুঁকি কমানো এবং সীমান্তে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি।

INS Aridhaman: India gets third nuclear submarine with 3,500 km missile  range; here's what makes this underwater war machine special - The Economic  Times

কারণ পারমাণবিক অস্ত্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু এর ধ্বংসক্ষমতা নয়; ভুল সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনাও।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য শেষ সতর্কবার্তা

ভারতের সাবমেরিনভিত্তিক পারমাণবিক সক্ষমতা হয়তো দিল্লির কাছে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা। পাকিস্তানের কাছে এটি নতুন নিরাপত্তা হুমকি। ইসলামাবাদের পাল্টা সামরিক প্রস্তুতি আবার দিল্লির উদ্বেগ বাড়াবে। আর এই প্রতিক্রিয়া যদি চীনের সামরিক সহায়তার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠবে।

এটি এমন এক প্রতিযোগিতা, যেখানে কোনো পক্ষই নিজেকে দুর্বল দেখাতে চাইবে না। কিন্তু সবাই যদি নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াতে থাকে, তাহলে সামগ্রিকভাবে অঞ্চলটি আরও অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানের সামনে তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কে কত বেশি অস্ত্র মোতায়েন করতে পারবে, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—কত দ্রুত তারা এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে পারবে, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র যুদ্ধ ঠেকানোর উপায় হয়ে থাকবে, যুদ্ধের সূচনাকারী ভুলের কারণ হবে না।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও অপেক্ষা করার সুযোগ সীমিত। হরমুজ, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অন্য কোনো বৈশ্বিক সংকট যতই জরুরি হোক, দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক ঝুঁকি উপেক্ষা করার মতো নয়।

কারণ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পরবর্তী সংঘাত যদি শুধু সীমান্তে শুরু হয়, তার পরিণতি সীমান্তেই থেমে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা এখন আর দেওয়া যায় না।