বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। তৈরি পোশাককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রফতানিমুখী শিল্প, শিল্পায়নের বিস্তার, বৈদেশিক বাজারে ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্ব এবং আমদানিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা -সব মিলিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যই ছিল প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই শক্তির জায়গাতেই দেখা দিয়েছে উদ্বেগজনক দুর্বলতা। রপ্তানির গতি কমেছে, কমেছে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যেও এসেছে উল্লেখযোগ্য ভাটা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সাময়িক অভিঘাত, নাকি বাংলাদেশের উৎপাদন ও বাণিজ্য কাঠামোর গভীরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ?
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বৈদেশিক বাণিজ্যের চিত্র সেই প্রশ্নকেই আরও জোরালো করেছে। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি। কিন্তু অর্থবছর শেষে মোট রফতানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায়ও শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সংখ্যার বিচারে এই পতন হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ, গত এক দশকে বাংলাদেশ যে ধারাবাহিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, সেখানে স্থবিরতা নিজেই একটি সংকেত।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, একই সময়ে রপ্তানির পাশাপাশি আমদানিও কমেছে। সাধারণভাবে আমদানি কমাকে অনেক সময় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ, সবচেয়ে বেশি কমেছে শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি। অর্থাৎ কমেছে ভবিষ্যৎ উৎপাদনের জ্বালানি। উৎপাদনের ভিত্তিই যখন দুর্বল হতে শুরু করে, তখন রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বর্তমান সংকটকে তাই কেবল রপ্তানি কমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। প্রকৃত সংকটটি আরও গভীরে। একদিকে শিল্পে নতুন বিনিয়োগের গতি কমেছে, অন্যদিকে বিদ্যমান শিল্পও উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না। গ্যাসের ঘাটতি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, ব্যাংকঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার ফলে উৎপাদন ব্যয় এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান কার্যক্রম টিকিয়ে রাখাকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
দুর্বল হয়ে পড়ছে অর্থনীতির ভিত
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেবল আমদানি ও রফতানির হিসাব নয়; এটি একটি দেশের উৎপাদনশীলতার আয়না। যখন কাঁচামাল আমদানি কমে, মূলধনি যন্ত্রপাতি কেনা কমে, শিল্প সম্প্রসারণ থেমে যায় এবং রফতানির গতি হারায়, তখন তা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিও অনেকটা তেমনই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে আমদানি দায় পরিশোধ বা ইমপোর্ট সেটেলমেন্ট হয়েছে ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৭০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ।
সাধারণত আমদানি দায় পরিশোধের এই পরিসংখ্যান দেশের শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কর্মকা-ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। এত কম প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শিল্প খাত এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।
বিশ্ববাজারের বাস্তবতাও বাংলাদেশের জন্য অনুকূল ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকায় ভোক্তা ব্যয় কমেছে। ইউরোপীয় অর্থনীতির ধীরগতি পোশাকসহ ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি, ইউরোপীয় বাজারে মূল্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একই বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও কেন কিছু প্রতিযোগী দেশ তাদের রপ্তানি ধরে রাখতে বা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, অথচ বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দিকে তাকাতে হয়। গত কয়েক বছরে শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, অনেক কারখানাকে সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করতে হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ সুদের ঋণ, ডলারের মূল্য অস্থিরতা, কাস্টমস ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যয় বৃদ্ধি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্রমেই ক্ষয় হতে শুরু করেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকটের প্রভাব কেবল বর্তমান রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ হলো ভবিষ্যতে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হওয়ার গতি শ্লথ হয়ে পড়া। অর্থাৎ আজ যে আমদানি কমছে, তার প্রভাব আগামী এক থেকে তিন বছর ধরে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রফতানির ওপর পড়তে পারে। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘লিডিং ইন্ডিকেটর’, যা ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির আগাম সংকেত দেয়।
তৈরি পোশাকের ম্লান গতি
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। ফলে এই খাতে সামান্য ধীরগতিও পুরো বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রপ্তানি পরিসংখ্যানেও সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট হয়েছে। সামগ্রিক রপ্তানি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, আর তার সবচেয়ে বড় কারণ পোশাক খাতের গতি হারানো। অথচ একসময় যে শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতীক ছিল, আজ সেই শিল্পই নতুন প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংকটের চাপে কঠিন সময় পার করছে।
বিশ্বের পোশাক বাজারে গত এক দশকে প্রতিযোগিতার ধরন বদলে গেছে। আগে যেখানে কম শ্রম ব্যয়ই ছিল প্রধান প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা, এখন সেখানে দ্রুত সরবরাহ, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন, প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব কারখানা, নকশা উদ্ভাবন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এমনকি পাকিস্তানও এই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশও কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি করেছে, বিশেষ করে সবুজ কারখানা নির্মাণে। কিন্তু উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে না পারায় সেই অগ্রগতি কাঙ্খিত সুফল এনে দিতে পারেনি।

উদ্যোক্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সবচেয়ে বড় চাহিদা এখন নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ। কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদনে বারবার বিঘœ ঘটায় অনেক কারখানাই নির্ধারিত সময়সূচি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে ক্রেতারা ধীরে ধীরে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকছেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প এখন শুধু গ্যাস সংকটেই নয়, অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সংকটেও ভুগছে। অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছে। এতে প্রতিষ্ঠানের কার্যকর মূলধন দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে।’
জ্বালানি সংকটে দুর্বল হচ্ছে উৎপাদনের ভিত
জ্বালানি সংকটের প্রভাব কেবল উৎপাদনের পরিমাণেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যখন একটি কারখানা গ্যাসের অভাবে নিজস্ব বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়, তখন প্রতি ইউনিট উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়। সেই অতিরিক্ত ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামে পুরোপুরি সমন্বয় করা সম্ভব হয় না। কারণ বৈশ্বিক পোশাক বাজারে মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত বড় ক্রেতাদের হাতে। ফলে উৎপাদককে কম মুনাফা নিয়েই ব্যবসা চালাতে হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি শিল্পের সক্ষমতা ক্ষয় করে এবং নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে।
এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু শ্রম ব্যয়ের ওপর নির্ভর করছে না; বরং নির্ভর করছে বিশ্বস্ত সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার ওপর। বাংলাদেশ যদি সময়মতো পণ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তাহলে শুধু বর্তমান অর্ডারই নয়, ভবিষ্যতের বাজারও হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘গ্যাস সংকট এখন শিল্প খাতের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন সীমিত করা হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

দুর্বল হয়ে পড়ছে ভবিষ্যত সক্ষমতা
শিল্প খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া। নতুন কারখানা স্থাপন বা বিদ্যমান কারখানা সম্প্রসারণের জন্য যে মূলধনি যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, তার আমদানিও কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি। অর্থনীতির ভাষায় এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ উৎপাদনের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা তৈরির প্রক্রিয়াই এখানে দুর্বল হয়ে পড়ছে। আজ যে উদ্যোক্তা নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি করছেন না, আগামী দুই-তিন বছরে তাঁর উৎপাদন সক্ষমতা প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি অর্থায়নের ব্যয়ও বেড়েছে। উচ্চ সুদের ঋণ, ডলারের অস্থিরতা এবং কার্যকর মূলধনের সংকট অনেক রপ্তানিকারককে চাপের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক। ভৌগোলিক নৈকট্য, স্থলবন্দর, কম পরিবহন ব্যয় এবং বিশাল বাজার, সব বিবেচনায় ভারত বাংলাদেশের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই বাণিজ্যেও গতি কমেছে। সীমান্ত বাণিজ্যের বিভিন্ন জটিলতা, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, লজিস্টিকস সমস্যা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে দুই দেশের বাণিজ্য প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরী বলেন, ‘দুটি দেশের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হলে যে ব্যবসাবাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার বড় প্রমাণ হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের আমদানি-রপ্তানির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান। এ পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, ভারত যেমন বাংলাদেশের মতো বড় বাজার হারাচ্ছে, তেমনই ভারতের মতো সম্ভাবনাময় বাজারে রপ্তানি কমছে বাংলাদেশের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিকল্প দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে গিয়ে যদি ভারতের চেয়ে বেশি দাম দিতে হয় তবে বাংলাদেশ ক্ষতির মুখে পড়বে।’
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে ধীরগতির বিষয়টি শুধু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য কৌশলের সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে আসে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের সম্ভাবনা বহুদিন ধরেই আলোচিত। কিন্তু বাস্তবে সার্ক অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের হার এখনও বিশ্বের অন্যান্য আঞ্চলিক জোটের তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশও সেই সীমাবদ্ধতার বাইরে যেতে পারেনি। ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ওপর অতিনির্ভরশীল রপ্তানি কাঠামো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববাজারের আরেকটি পরিবর্তনও বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন কেবল কম দামের পণ্য চান না; তারা সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু অগ্রগতি করলেও সামগ্রিক নীতিগত সমন্বয় এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে প্রতিযোগী দেশগুলো যখন দ্রুত নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, বাংলাদেশ তখন মৌলিক অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো নিয়েই লড়াই করছে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ব্যবসার ব্যয় কমানো, লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো কার্যকর করা, বাণিজ্য সহজীকরণ, রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’

রেমিট্যান্সের স্বস্তি কতদিন
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বর্তমান চিত্রে একটি আপাত স্বস্তির দিক হচ্ছে, রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয়। গত অর্থবছরে বৈধ চ্যানেলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ অনেকটাই কমিয়েছে। ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করেন, এই স্বস্তির আড়ালে আরও গভীর একটি সংকট ধীরে ধীরে জমাট বাঁধছে। কারণ, রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু উৎপাদনশীল অর্থনীতির বিকল্প হতে পারে না।
কোনো দেশের বৈদেশিক খাতের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় তার উৎপাদন, রপ্তানি এবং বিনিয়োগের সক্ষমতা দিয়ে। সেখানে যদি ধারাবাহিক দুর্বলতা তৈরি হয়, তবে সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স পরিস্থিতি সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সেই অর্থনীতি প্রতিযোগিতা হারাতে শুরু করে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেই আশঙ্কাই ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তাই অর্থনীতির বাস্তবতা হলো রেমিট্যান্স উৎপাদনশীল শিল্পের বিকল্প হতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে টেকসই রাখতে হলে উৎপাদন, রফতানি এবং বিনিয়োগ -এই তিনটি স্তম্ভকেই সমানভাবে শক্তিশালী করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দুর্বলতাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটির সঙ্গে আরেকটি গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। শিল্পে পর্যাপ্ত গ্যাস নেই, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি কমছে। রপ্তানি কমায় নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমছে। আর উৎপাদন সক্ষমতা দুর্বল হলে ভবিষ্যতের রপ্তানি সম্ভাবনাও সংকুচিত হয়। অর্থাৎ অর্থনীতি একটি কাঠামোগত নি¤œমুখী চক্রে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতাও বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাপী উৎপাদন কেন্দ্রগুলো এখন শুধু কম মজুরির ওপর নির্ভর করে না; তারা প্রযুক্তি, দক্ষতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং বাণিজ্য চুক্তির সুবিধাকে সমান গুরুত্ব দেয়। এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো রপ্তানির অতিরিক্ত একমুখী কাঠামো। এখনও দেশের পণ্য রপ্তানির সিংহভাগ নির্ভর করছে তৈরি পোশাকের ওপর। অন্যদিকে প্রকৌশল পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধ, চামড়া, আইসিটি সেবা বা উচ্চমূল্য সংযোজিত শিল্পে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
বাজার বৈচিত্র্যেও একই চিত্র। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের নির্ভরতা এখনও অত্যন্ত বেশি। অথচ এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশ এখনও সীমিত। আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বাজারগুলোর সুবিধা বাংলাদেশ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় চাহিদা কমে যাওয়ায় তার অভিঘাত সরাসরি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে এসে পড়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ মূলত কম মূল্য সংযোজনের বা স্বল্পমূল্যের পোশাক উৎপাদন করে এসেছে। এখন শিল্প সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে উচ্চমূল্যের ও উদ্ভাবনী পণ্যের দিকে যেতে চাইলেও নানা বাধার মুখে পড়ছে।’’ তার ভাষায়, এই সীমাবদ্ধতার কিছু কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ হলেও একটি বড় কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মানসিকতা।
সংকট থেকে উত্তরণ

তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি প্রশাসনিক উদ্যোগের চেয়ে অনেক বড় নীতিগত সংস্কার। এজন্য অন্তত পাঁচ ধরণের সংস্কার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন ব্যাহত হলে কোনো প্রণোদনা বা নগদ সহায়তাই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
দ্বিতীয়ত, রপ্তানিকে বহুমুখী করতে হবে। পোশাক শিল্প বাংলাদেশের প্রধান শক্তি হিসেবেই থাকবে, কিন্তু তার পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং অন্যান্য উচ্চমূল্য সংযোজিত খাতকে দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে হবে। বন্দর ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস, লজিস্টিকস, পরিবহন, কর প্রশাসন এবং এলসি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো সম্ভব হবে না।
চতুর্থত, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্য কূটনীতিকে নতুন করে সাজাতে হবে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। শুধু ঐতিহ্যগত বাজারের ওপর নির্ভর করে আগামী দশকের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে।
পঞ্চমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। নীতির ধারাবাহিকতা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, করনীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ -এসব নিশ্চিত না হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে কাঙ্খিত গতি আসবে না।
বাংলাদেশ গত চার দশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে উন্নয়ন ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে রপ্তানিই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু নতুন বাস্তবতায় সেই সাফল্যের পুরোনো সূত্র আর যথেষ্ট নয়। বিশ্ববাজার বদলেছে, প্রতিযোগিতার ধরন বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, সরবরাহ শৃঙ্খল বদলেছে। এখন বাংলাদেশেরও পরিবর্তন অনিবার্য।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রপ্তানি কত কমল বা আমদানি কত বাড়ল, তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, বিশ্ববাণিজ্যের দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশটি কি তার উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতিকে নতুন করে পুনর্গঠন করতে পারবে? সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাবে, নাকি প্রতিযোগিতার দৌড়ে আরও পিছিয়ে পড়বে।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
আকিব রহমান 


















