যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত অন্য দেশের মুদ্রাবাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। এমন পদক্ষেপকে ওয়াশিংটন ঐতিহাসিকভাবে জরুরি পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সেই পুরোনো ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। আর্জেন্টিনার পেসো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম এবং এখন জাপানের ইয়েন—তিন ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র মুদ্রার স্থিতিশীলতায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন দেখিয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কেন?
সাধারণ অর্থনৈতিক যুক্তিতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের অর্থনীতির বাইরে অন্য দেশের মুদ্রা রক্ষায় অর্থ ও নীতিগত শক্তি ব্যয় করার যথেষ্ট কারণ থাকার কথা নয়। বিশেষ করে যে মুদ্রার দরপতনের ঝুঁকি রয়েছে, সেটি কিনে রাখা বা সাময়িক ডলার-সোয়াপের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপগুলোকে শুধু মুদ্রানীতির দৃষ্টিতে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর মধ্যে অর্থনৈতিক স্বার্থ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে রাজনৈতিক আনুগত্য, কৌশলগত সম্পর্ক এবং ভূরাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার হিসাব।
মুদ্রাবাজার যখন কূটনীতির হাতিয়ার

ট্রাম্প প্রশাসনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো—অর্থনৈতিক নীতিকে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে আলাদা না করা। শুল্ক, বাণিজ্যচাপ, বিনিয়োগ এবং এখন মুদ্রাবাজার—সবকিছুকেই একই বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আর্জেন্টিনার ঘটনা এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। গুরুত্বপূর্ণ আইনসভা নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে-র সরকারের সময় পেসোর ওপর চাপ বাড়ছিল। মিলে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ আদর্শিক মিত্র। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র পেসোকে সমর্থন করে। এটি নিছক আর্থিক সহায়তা ছিল না; এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও ছিল।
ঝুঁকি ছিল যথেষ্ট। মিলে নির্বাচনে ব্যর্থ হলে বা অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে অক্ষম হলে পেসোর পতন আরও তীব্র হতে পারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মার্কিন সমর্থন সফল হয়। নির্বাচনের পর মিলে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনেন, সরকারি ঋণের গতিপথ বদলাতে শুরু করে এবং মূল্যস্ফীতি ও পেসোর অস্থিরতাও কমে আসে।
অর্থাৎ ওয়াশিংটনের জন্য মুদ্রা সমর্থন এখানে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিনিয়োগে পরিণত হয়েছিল।
জাপানের ইয়েন কেন গুরুত্বপূর্ণ
জাপানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। ইয়েন এক বছরে ডলারের বিপরীতে ১০ শতাংশের বেশি দুর্বল হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি জাপান সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে মুদ্রাটিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
জাপানের জন্য দুর্বল ইয়েনের সমস্যা স্পষ্ট। দেশটি বিপুল পরিমাণ আমদানি করে। ফলে মুদ্রার দরপতন আমদানির খরচ বাড়ায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র করতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি ইয়েনভিত্তিক সম্পদ থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে সরকারের ঋণের সুদও বাড়তে পারে।

এখানে জাপানের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির সরকারি ঋণ এর বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের দ্বিগুণেরও বেশি। জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল এবং জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছেন। কিন্তু ঋণের বোঝা যখন এত বেশি, তখন সুদের হার বাড়তে থাকলে সরকারের আর্থিক পরিকল্পনার ওপর চাপ তৈরি হবে।
সুতরাং ইয়েনের দুর্বলতা শুধু বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সমস্যা নয়। এটি জাপানের পুরো অর্থনৈতিক নীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
কিন্তু ওয়াশিংটন এতে এতটা আগ্রহী কেন?
কারণ জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের সবচেয়ে বড় বিদেশি মালিক। ইয়েনকে সমর্থন করতে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে ডলার সংগ্রহ করে, তাহলে সেই বন্ডের বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। অন্য বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে মার্কিন সরকারকে আরও বেশি সুদ দিতে হতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের ব্যয়ে। আর সরকারি ঋণের খরচ বাড়লে ব্যবসা ও ভোক্তাদের ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বাড়তে পারে।
শুল্কের হিসাবও এখানে বাদ দেওয়া যায় না। জাপানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক থাকলেও ইয়েন যদি ক্রমাগত দুর্বল হয়, তাহলে জাপানি পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কমে যাবে। ফলে মুদ্রার দরপতন শুল্কের কার্যকারিতাকে অনেকটাই ক্ষয় করতে পারে।
অর্থাৎ ইয়েনকে সমর্থন করার পেছনে জাপানের স্বার্থ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থও।
মুদ্রাবাজারকে কত দূর ঠেকানো যায়
তবে এখানেই বড় প্রশ্ন। একটি দেশের মুদ্রার দরপতন যদি তার অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতার প্রতিফলন হয়, তাহলে বাজারে হস্তক্ষেপ করে সেই প্রবণতাকে কত দিন ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব?
মুদ্রাবাজারে হঠাৎ অতিরিক্ত অস্থিরতা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে। বাজার অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়। সে ক্ষেত্রে সাময়িক হস্তক্ষেপ যুক্তিসঙ্গত হতে পারে।
কিন্তু ইয়েনের বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল অতিরিক্ত বাজার-অস্থিরতা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। ২০২০ সালের পর থেকে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। এর পেছনে রয়েছে জাপানের অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যা—বয়স্ক জনসংখ্যা, বিপুল সরকারি ঋণ, দুর্বল প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ।
এসব সমস্যার সমাধান মুদ্রা কেনাবেচার মাধ্যমে সম্ভব নয়।
বরং মুদ্রা দুর্বল হলে আমদানির ব্যয় বাড়ে, মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ যে সমস্যার কারণে মুদ্রা দুর্বল হয়েছে, দুর্বল মুদ্রা সেটিকেই আরও তীব্র করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রও খুব স্বস্তির জায়গায় নেই
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও খুব আলাদা নয়। মার্কিন অর্থনীতি এবং শ্রমবাজার তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও মূল্যস্ফীতি এখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার ওপরে। ফলে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলে মার্কিন স্বল্পমেয়াদি সরকারি ঋণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
এটি স্বাভাবিকভাবেই ইয়েনের ওপর চাপ বাড়াবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সরকারি ঋণও একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।
এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের মুদ্রা-হস্তক্ষেপের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। ওয়াশিংটন যতই বাজারের গতিপথ বদলানোর চেষ্টা করুক, যদি তার নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তাহলে বাজারের শক্তিকে দীর্ঘ সময় উপেক্ষা করা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত বাজারই হিসাব চায়

আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা থেকে একটি শিক্ষা পাওয়া যায়। মুদ্রাকে স্থিতিশীল করতে সরকারি হস্তক্ষেপ তখনই কার্যকর হতে পারে, যখন তার সঙ্গে বাস্তব অর্থনৈতিক সংস্কার যুক্ত থাকে। শুধু বাজারে অর্থ ঢেলে একটি মুদ্রার দর ধরে রাখা যায় না।
জাপানের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। ইয়েনের পতন ঠেকাতে মার্কিন ট্রেজারি যুক্ত হওয়া বাজারে শক্তিশালী সংকেত দিতে পারে এবং জল্পনাকারীদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু এতে জাপানের জনসংখ্যাগত সমস্যা, ঋণের পাহাড় কিংবা দুর্বল প্রবৃদ্ধি দূর হবে না।
আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও মুদ্রাবাজারকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তার নিজস্ব ঋণ সমস্যার বিকল্প নয়।
এখানে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো, অর্থনৈতিক বাজারকে এখন আরও প্রকাশ্যভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। মিত্রদের সহায়তা দেওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা—সবকিছু একই নীতির মধ্যে এসে যাচ্ছে।
কিন্তু বাজারের একটি নিজস্ব শৃঙ্খলা আছে। সেটি রাজনৈতিক আনুগত্য বোঝে না, কূটনৈতিক সম্পর্কও বিবেচনা করে না। দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের মুদ্রার মূল্য নির্ধারিত হয় তার অর্থনীতির শক্তি, উৎপাদনশীলতা, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
তাই ইয়েনকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করা সম্ভব হলেও জাপানের মৌলিক সমস্যাগুলো থেকে পালানোর সুযোগ নেই। একই কথা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ইয়েন কতটা উঠল বা পড়ল, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কত দিন সরকারগুলো বাজারের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করতে পারবে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো মুদ্রাবাজার নয়, সরকারি ঋণের হিসাবই সবচেয়ে নির্মমভাবে দেবে।
এস্বর প্রসাদ 

















