০৫:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
থাইল্যান্ডের সুপারমার্কেট ব্যবসা বিক্রি করছে এওন, ক্রেতা সেন্ট্রাল গ্রুপ আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হিটলারের ভি-২ রকেট চুরি: মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পোলিশ প্রতিরোধযোদ্ধাদের অবিশ্বাস্য অভিযান যুদ্ধ, তেল আর জলবায়ু: মানুষের সংকটই কি জ্বালানি কোম্পানির সোনালি সময়? ৯০ কোটি ডলারের রোবট বাজি: ডিপসিক থেকে টেনসেন্ট—চীনের সব বড় শক্তি কেন ইউনিট্রির পাশে? জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হস্তক্ষেপেও থামছে না ইয়েনের পতন, আস্থার সংকটেই কি আসল সমস্যা? থাইল্যান্ড সীমান্ত বন্ধ, জাপানি কোম্পানির ভরসা এখন কম্বোডিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর প্রধানমন্ত্রী: একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অস্থিতিশীল করতে সক্রিয় চীনে গ্রীষ্মের ছুটিতে কোচিংয়ের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিক্ষক ‘এক দফা’ কোনো নেতার ঘোষণা নয়, এটি জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন: নুরুল হক নুর

কেন পোকামাকড় হারিয়ে যাচ্ছে, আর এর প্রভাব কী হতে পারে আমাদের ভবিষ্যতে

প্রমাণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। প্রজাপতি থেকে গুবরেপোকা—বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে আটকে থাকবে না; তা পৌঁছাবে আমাদের খাদ্যব্যবস্থা ও পুরো বাস্তুতন্ত্রে।

যেকোনো বেবি বুমার প্রজন্মের মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই হয়তো শুনবেন, একসময় গাড়ির জানালা খোলা রেখে গ্রামাঞ্চলের পথে গাড়ি চালালে উইন্ডস্ক্রিনে নিয়মিত পোকামাকড়ের আঘাতের শব্দ শোনা যেত। এখন অনেক বেশি গরমের গ্রীষ্মের দিনেও গাড়ি চালিয়ে দেখা যায়, উইন্ডস্ক্রিন আশ্চর্যজনকভাবে পরিষ্কার। সেই পরিষ্কারত্বের মধ্যে যেন অস্বস্তিকর এক শূন্যতা লুকিয়ে আছে।

দীর্ঘদিন ধরে তথাকথিত ‘উইন্ডস্ক্রিন ফেনোমেনন’কে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বদলে মানুষের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন তথ্য-উপাত্ত এবং প্রকৃতির দৃশ্যপট—দুটিই বলছে, মানুষের সেই পর্যবেক্ষণ পুরোপুরি ভুল ছিল না। পোকামাকড় গাড়িকে এড়িয়ে চলা শিখে যায়নি। বরং তারা হারিয়ে যাচ্ছে।

পোকামাকড়ের সংখ্যা কমছে দ্রুত

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যদেশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৭ প্রজাতির তৃণভূমির প্রজাপতির সূচক ৪৭ শতাংশ কমেছে।

Insect apocalypse: Are bugs really vanishing? | Vox

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় কলোরাডোর একটি সাব-আল্পাইন তৃণভূমিতে ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে মানুষের সরাসরি প্রভাব খুবই কম। তারপরও উড়ন্ত পোকামাকড়ের সংখ্যা ৭২ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

যুক্তরাজ্যে ‘বাগস ম্যাটার’ নামে নাগরিক বিজ্ঞানভিত্তিক একটি প্রকল্প গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন নয়, গাড়ির নম্বরপ্লেটে পোকামাকড়ের আঘাতের হিসাব রাখে। স্মার্টফোন অ্যাপ ব্যবহার করে যে কেউ এতে অংশ নিতে পারেন। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ বছরে পোকামাকড়ের প্রাচুর্য ৫৯ শতাংশ কমেছে।

অর্থাৎ, পৃথিবী ক্রমশ এক অদ্ভুত নীরবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু কিছু পোকামাকড়ের হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং জীবনের পুরো কাঠামো ধীরে ধীরে খুলে পড়ার মতো একটি সংকেত।

পোকামাকড় ছাড়া খাদ্যব্যবস্থাও ঝুঁকিতে

পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পোকামাকড়। খাদ্যশস্যের প্রায় ৭৫ শতাংশের পরাগায়নে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাখি, সরীসৃপ ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খাদ্যশৃঙ্খলেও পোকামাকড় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

প্রাণীজগতের বৈচিত্র্য ও মোট জীবভরের একটি বিশাল অংশ পোকামাকড়ের দখলে। বর্ণিত প্রাণী প্রজাতির ৭০ শতাংশেরও বেশি পোকামাকড়ের অন্তর্ভুক্ত।

তাই তাদের ধারাবাহিক পতন একসময় বাস্তুতন্ত্রের সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তৈরি হতে পারে এমন একটি পরিস্থিতি, যাকে অনেকে ‘ইনসেক্টাগেডন’ বা পোকামাকড়-ধস হিসেবে অভিহিত করছেন। এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বিপর্যয়কর হতে পারে।

এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে কীটনাশকের ব্যবহার, আবাসস্থল ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রজনন ও জীবনচক্রের সময়ের অসামঞ্জস্য।

তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পোকামাকড় শীতনিদ্রা বা নিষ্ক্রিয়তা থেকে স্বাভাবিক সময়ের আগেই বেরিয়ে আসছে। ফলে যেসব উদ্ভিদের ওপর তারা নির্ভরশীল, সেসব উদ্ভিদের সঙ্গে তাদের জীবনচক্রের সময়ের মিল নষ্ট হচ্ছে।

সমাধানও তাই সহজভাবে চিহ্নিত করা যায়—এই তিন প্রবণতাকেই উল্টে দিতে হবে। আর তার শুরু হওয়া উচিত ক্রমশ উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর জলবায়ু মোকাবিলা থেকে।

The insect apocalypse: 'Our world will grind to a halt without them' |  Insects | The Guardian

সব পোকামাকড় সমানভাবে হারাচ্ছে না

তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে এনেছে। পোকামাকড়ের সংখ্যা কমার প্রবণতা সব জায়গায় একই রকম নয়। এটি অত্যন্ত স্থানীয় এবং জটিল। কোথাও কিছু প্রজাতি কমছে, আবার কোথাও কিছু প্রজাতি তুলনামূলকভাবে লাভবান হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিশেষায়িত প্রজাতিগুলো নিয়ে। নির্দিষ্ট কোনো উদ্ভিদ বা নির্দিষ্ট পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল এসব পোকামাকড় দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে সাধারণ পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন প্রজাতি এবং আক্রমণাত্মক প্রজাতি তুলনামূলকভাবে বেশি বিস্তার লাভ করছে।

এর অর্থ হলো, শুধু মোট পোকামাকড়ের সংখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করলে আসল বিপদটি ধরা নাও পড়তে পারে। কোন প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে, কোনগুলো বাড়ছে এবং বাস্তুতন্ত্রের কোন সম্পর্কগুলো ভেঙে যাচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

পর্যবেক্ষণে নতুন উদ্যোগ

পোকামাকড়ের এই সংকট বুঝতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৩ মিলিয়ন ইউরোর একটি গবেষণা উদ্যোগ শুরু করেছে। এর লক্ষ্য হলো প্রচলিত ‘সপ্ল্যাট কাউন্ট’ বা গাড়িতে লেগে থাকা মৃত পোকামাকড় গোনার পদ্ধতি থেকে সরে গিয়ে স্বয়ংক্রিয় সেন্সরনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে পোকামাকড়ের জনসংখ্যার স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা।

তবে সংরক্ষণ প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো সত্যিকারের বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতি। বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে পোকামাকড় নিয়ে গবেষণা এখনও অত্যন্ত সীমিত।

গবেষকেরা তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একাধিক বৈশ্বিক সূচক তৈরির পক্ষে মত দিচ্ছেন।

তবে সেটিও হবে কেবল শুরু। কয়েক দশক ধরে মানুষ যে পতন ঘটিয়েছে, তা উল্টে দেওয়ার জায়গা থেকে মানবসভ্যতা এখনও অনেক দূরে।

And Then There Were None: Unraveling the Insect Apocalypse - The Politic

২০২৬ কি পোকামাকড়ের জন্য আরও ভয়াবহ?

২০২৬ সাল পোকামাকড়ের জন্য কতটা খারাপ হবে—এ মুহূর্তে তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কারণ পোকামাকড়ের জনসংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে পরিমাপ করার মতো কোনো প্রযুক্তি আমাদের হাতে নেই।

তবে অনুমান করতে হলে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

গ্রীষ্মকালীন অয়নান্তের barely এক সপ্তাহ পরেই ইউরোপে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। প্রাণহানি ঘটেছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো চরম চাপের মুখে পড়েছে এবং দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে।

পাঠক যখন এই লেখা পড়বেন, ততদিনে পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে তা কেউ জানে না। কিন্তু ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইতোমধ্যেই ইউরোপের ইতিহাসের উষ্ণতম গ্রীষ্ম হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পথে। আর এই প্রবণতা অনেকটাই আগে থেকেই অনুমান করা হয়েছিল।

জলবায়ুবিজ্ঞানীদের একটি পূর্বাভাস—ইউরোপ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হবে—সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এই উষ্ণতা কত দ্রুত এবং কতটা তীব্র হবে, সেই পরিমাণগত পূর্বাভাস বাস্তবতার তুলনায় বারবার পিছিয়ে পড়েছে।

কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের উপপরিচালক সামান্থা বার্গেস বলেছেন, বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত তাপপ্রবাহ আমাদের সঙ্গেই থাকবে।

এটি আর নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়; বরং নতুন অস্বাভাবিকতা।

আর এর সবচেয়ে বড় সাক্ষী হতে পারে মৌমাছি, লেডিবার্ড, জোনাকি, প্রজাপতি, মথ ও গুবরেপোকা—যারা দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের মধ্যে টিকে থাকা ও বংশবিস্তারের স্বাভাবিক জৈবিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

এটি অতীতের ‘সোনালি দিন’-এর প্রতি কোনো নস্টালজিয়া নয়। বরং সত্যিই মনে হয়, আবার যদি গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন পরিষ্কার করতে হয়—তাহলে সেটি স্বস্তির কারণ হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

থাইল্যান্ডের সুপারমার্কেট ব্যবসা বিক্রি করছে এওন, ক্রেতা সেন্ট্রাল গ্রুপ

কেন পোকামাকড় হারিয়ে যাচ্ছে, আর এর প্রভাব কী হতে পারে আমাদের ভবিষ্যতে

০৩:৫৬:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

প্রমাণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। প্রজাপতি থেকে গুবরেপোকা—বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে আটকে থাকবে না; তা পৌঁছাবে আমাদের খাদ্যব্যবস্থা ও পুরো বাস্তুতন্ত্রে।

যেকোনো বেবি বুমার প্রজন্মের মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই হয়তো শুনবেন, একসময় গাড়ির জানালা খোলা রেখে গ্রামাঞ্চলের পথে গাড়ি চালালে উইন্ডস্ক্রিনে নিয়মিত পোকামাকড়ের আঘাতের শব্দ শোনা যেত। এখন অনেক বেশি গরমের গ্রীষ্মের দিনেও গাড়ি চালিয়ে দেখা যায়, উইন্ডস্ক্রিন আশ্চর্যজনকভাবে পরিষ্কার। সেই পরিষ্কারত্বের মধ্যে যেন অস্বস্তিকর এক শূন্যতা লুকিয়ে আছে।

দীর্ঘদিন ধরে তথাকথিত ‘উইন্ডস্ক্রিন ফেনোমেনন’কে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বদলে মানুষের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন তথ্য-উপাত্ত এবং প্রকৃতির দৃশ্যপট—দুটিই বলছে, মানুষের সেই পর্যবেক্ষণ পুরোপুরি ভুল ছিল না। পোকামাকড় গাড়িকে এড়িয়ে চলা শিখে যায়নি। বরং তারা হারিয়ে যাচ্ছে।

পোকামাকড়ের সংখ্যা কমছে দ্রুত

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যদেশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৭ প্রজাতির তৃণভূমির প্রজাপতির সূচক ৪৭ শতাংশ কমেছে।

Insect apocalypse: Are bugs really vanishing? | Vox

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় কলোরাডোর একটি সাব-আল্পাইন তৃণভূমিতে ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে মানুষের সরাসরি প্রভাব খুবই কম। তারপরও উড়ন্ত পোকামাকড়ের সংখ্যা ৭২ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

যুক্তরাজ্যে ‘বাগস ম্যাটার’ নামে নাগরিক বিজ্ঞানভিত্তিক একটি প্রকল্প গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন নয়, গাড়ির নম্বরপ্লেটে পোকামাকড়ের আঘাতের হিসাব রাখে। স্মার্টফোন অ্যাপ ব্যবহার করে যে কেউ এতে অংশ নিতে পারেন। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ বছরে পোকামাকড়ের প্রাচুর্য ৫৯ শতাংশ কমেছে।

অর্থাৎ, পৃথিবী ক্রমশ এক অদ্ভুত নীরবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু কিছু পোকামাকড়ের হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং জীবনের পুরো কাঠামো ধীরে ধীরে খুলে পড়ার মতো একটি সংকেত।

পোকামাকড় ছাড়া খাদ্যব্যবস্থাও ঝুঁকিতে

পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পোকামাকড়। খাদ্যশস্যের প্রায় ৭৫ শতাংশের পরাগায়নে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাখি, সরীসৃপ ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খাদ্যশৃঙ্খলেও পোকামাকড় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

প্রাণীজগতের বৈচিত্র্য ও মোট জীবভরের একটি বিশাল অংশ পোকামাকড়ের দখলে। বর্ণিত প্রাণী প্রজাতির ৭০ শতাংশেরও বেশি পোকামাকড়ের অন্তর্ভুক্ত।

তাই তাদের ধারাবাহিক পতন একসময় বাস্তুতন্ত্রের সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তৈরি হতে পারে এমন একটি পরিস্থিতি, যাকে অনেকে ‘ইনসেক্টাগেডন’ বা পোকামাকড়-ধস হিসেবে অভিহিত করছেন। এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বিপর্যয়কর হতে পারে।

এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে কীটনাশকের ব্যবহার, আবাসস্থল ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রজনন ও জীবনচক্রের সময়ের অসামঞ্জস্য।

তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পোকামাকড় শীতনিদ্রা বা নিষ্ক্রিয়তা থেকে স্বাভাবিক সময়ের আগেই বেরিয়ে আসছে। ফলে যেসব উদ্ভিদের ওপর তারা নির্ভরশীল, সেসব উদ্ভিদের সঙ্গে তাদের জীবনচক্রের সময়ের মিল নষ্ট হচ্ছে।

সমাধানও তাই সহজভাবে চিহ্নিত করা যায়—এই তিন প্রবণতাকেই উল্টে দিতে হবে। আর তার শুরু হওয়া উচিত ক্রমশ উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর জলবায়ু মোকাবিলা থেকে।

The insect apocalypse: 'Our world will grind to a halt without them' |  Insects | The Guardian

সব পোকামাকড় সমানভাবে হারাচ্ছে না

তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে এনেছে। পোকামাকড়ের সংখ্যা কমার প্রবণতা সব জায়গায় একই রকম নয়। এটি অত্যন্ত স্থানীয় এবং জটিল। কোথাও কিছু প্রজাতি কমছে, আবার কোথাও কিছু প্রজাতি তুলনামূলকভাবে লাভবান হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিশেষায়িত প্রজাতিগুলো নিয়ে। নির্দিষ্ট কোনো উদ্ভিদ বা নির্দিষ্ট পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল এসব পোকামাকড় দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে সাধারণ পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন প্রজাতি এবং আক্রমণাত্মক প্রজাতি তুলনামূলকভাবে বেশি বিস্তার লাভ করছে।

এর অর্থ হলো, শুধু মোট পোকামাকড়ের সংখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করলে আসল বিপদটি ধরা নাও পড়তে পারে। কোন প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে, কোনগুলো বাড়ছে এবং বাস্তুতন্ত্রের কোন সম্পর্কগুলো ভেঙে যাচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

পর্যবেক্ষণে নতুন উদ্যোগ

পোকামাকড়ের এই সংকট বুঝতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৩ মিলিয়ন ইউরোর একটি গবেষণা উদ্যোগ শুরু করেছে। এর লক্ষ্য হলো প্রচলিত ‘সপ্ল্যাট কাউন্ট’ বা গাড়িতে লেগে থাকা মৃত পোকামাকড় গোনার পদ্ধতি থেকে সরে গিয়ে স্বয়ংক্রিয় সেন্সরনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে পোকামাকড়ের জনসংখ্যার স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা।

তবে সংরক্ষণ প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো সত্যিকারের বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতি। বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে পোকামাকড় নিয়ে গবেষণা এখনও অত্যন্ত সীমিত।

গবেষকেরা তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একাধিক বৈশ্বিক সূচক তৈরির পক্ষে মত দিচ্ছেন।

তবে সেটিও হবে কেবল শুরু। কয়েক দশক ধরে মানুষ যে পতন ঘটিয়েছে, তা উল্টে দেওয়ার জায়গা থেকে মানবসভ্যতা এখনও অনেক দূরে।

And Then There Were None: Unraveling the Insect Apocalypse - The Politic

২০২৬ কি পোকামাকড়ের জন্য আরও ভয়াবহ?

২০২৬ সাল পোকামাকড়ের জন্য কতটা খারাপ হবে—এ মুহূর্তে তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কারণ পোকামাকড়ের জনসংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে পরিমাপ করার মতো কোনো প্রযুক্তি আমাদের হাতে নেই।

তবে অনুমান করতে হলে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

গ্রীষ্মকালীন অয়নান্তের barely এক সপ্তাহ পরেই ইউরোপে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। প্রাণহানি ঘটেছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো চরম চাপের মুখে পড়েছে এবং দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে।

পাঠক যখন এই লেখা পড়বেন, ততদিনে পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে তা কেউ জানে না। কিন্তু ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইতোমধ্যেই ইউরোপের ইতিহাসের উষ্ণতম গ্রীষ্ম হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পথে। আর এই প্রবণতা অনেকটাই আগে থেকেই অনুমান করা হয়েছিল।

জলবায়ুবিজ্ঞানীদের একটি পূর্বাভাস—ইউরোপ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হবে—সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এই উষ্ণতা কত দ্রুত এবং কতটা তীব্র হবে, সেই পরিমাণগত পূর্বাভাস বাস্তবতার তুলনায় বারবার পিছিয়ে পড়েছে।

কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের উপপরিচালক সামান্থা বার্গেস বলেছেন, বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত তাপপ্রবাহ আমাদের সঙ্গেই থাকবে।

এটি আর নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়; বরং নতুন অস্বাভাবিকতা।

আর এর সবচেয়ে বড় সাক্ষী হতে পারে মৌমাছি, লেডিবার্ড, জোনাকি, প্রজাপতি, মথ ও গুবরেপোকা—যারা দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের মধ্যে টিকে থাকা ও বংশবিস্তারের স্বাভাবিক জৈবিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

এটি অতীতের ‘সোনালি দিন’-এর প্রতি কোনো নস্টালজিয়া নয়। বরং সত্যিই মনে হয়, আবার যদি গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন পরিষ্কার করতে হয়—তাহলে সেটি স্বস্তির কারণ হবে।