ইন্দোনেশিয়ার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে নতুন একটি উচ্চশিক্ষা কাঠামো তৈরির উদ্যোগ দেশটির শিক্ষা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রশ্নটি শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং আগামী কয়েক দশকে ইন্দোনেশিয়া কী ধরনের মানুষকে রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে দেখতে চায়, সেটি নিয়েও।
২২ জুলাই প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো নতুন প্রতিষ্ঠিত ইউনিভার্সিতাস রিপাবলিক ইন্দোনেশিয়া বা ইউআরআইয়ের নেতৃত্বে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনীর মার্শালকে নিয়োগ দেন। শুরুতে এটিকে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখা হলেও পরে সরকারি কর্মকর্তারা জানান, পরিকল্পনাটি আরও বড়—দেশজুড়ে মোট ১০টি ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হবে। প্রথম ক্যাম্পাসটি পশ্চিম জাভার বোগোরে একটি সাবেক তেলপাম বাগানের জমিতে সরকারি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফ্রান্সের অভিজাত সরকারি প্রশাসন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ন্যাশনাল দ্যু সার্ভিস পাবলিক বা আইএনএসপিকে এর একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
উদ্দেশ্য শুনতে আকর্ষণীয়। একটি রাষ্ট্র যদি দক্ষ, সৎ ও জাতীয় স্বার্থে নিবেদিত প্রশাসক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব তৈরি করতে চায়, সে জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থাকার যুক্তি আছে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে আসল প্রশ্ন হলো—এই উদ্যোগ কি সত্যিই বিদ্যমান সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান?
সমস্যা যেখানে, বিনিয়োগও কি সেখানে?
ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় ঘাটতি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব নয়। দেশটির রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব ইন্দোনেশিয়া, গাদজাহ মাদা ইউনিভার্সিটি, বান্দুং ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরে প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা, বিজ্ঞান ও জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মানুষ তৈরি করেছে।
অথচ এই বিদ্যমান উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থারই বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাবেক স্টেট ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালাংয়ের রেক্টর এম. জাইনুদ্দিন এক মতামত লেখায় ইন্দোনেশিয়ার গবেষণা সক্ষমতার দুর্বলতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর উল্লেখ করা হিসাবে, প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে ইন্দোনেশিয়ায় গবেষকের সংখ্যা প্রায় ৩৯৫ জন। উন্নত অর্থনীতিগুলোতে এই সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার থেকে ৮ হাজারের মধ্যে। একই সময়ে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে দেশটির ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র প্রায় ০.২ থেকে ০.৩ শতাংশের কাছাকাছি।
এই ব্যবধান কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্প এবং জাতীয় প্রতিযোগিতার প্রশ্ন। যে দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত উৎপাদন, জৈবপ্রযুক্তি, সবুজ প্রযুক্তি কিংবা উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক ব্যবসায় বড় ভূমিকা রাখতে চায়, তার জন্য গবেষণার দুর্বলতা অনেক বেশি মৌলিক সংকট।
সেই কারণে নতুন ১০টি ক্যাম্পাস তৈরির বদলে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাগার, শিক্ষক, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও গবেষণা অবকাঠামো শক্তিশালী করার প্রশ্নটি আরও জরুরি। নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির আগে পুরোনো কিন্তু সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় দাঁড় করানোই হয়তো অধিক ফলপ্রসূ বিনিয়োগ হতে পারে।
তবে অর্থের প্রশ্নের চেয়েও বড় উদ্বেগ অন্য জায়গায়।

কেমন নেতৃত্ব তৈরি হবে?
ইউআরআইয়ের ধারণার সঙ্গে ‘ওয়াওয়াসান কেবাংসান’—অর্থাৎ জাতীয় চেতনা ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক চরিত্র গঠনের ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়, রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং দেশের স্বার্থের প্রতি আনুগত্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশই এমন নেতৃত্ব চায় না, যারা নিজেদের দেশের প্রয়োজন ও স্বার্থ সম্পর্কে উদাসীন।
কিন্তু আনুগত্য আর সক্ষমতা এক বিষয় নয়।
আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন প্রশ্ন করার ক্ষমতা, ভিন্নমত গ্রহণের মানসিকতা, গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বোঝা, বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে কাজ করার দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিযোগিতা করার আত্মবিশ্বাস। কেবল রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বা কর্তৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা দিয়ে এই দক্ষতাগুলো তৈরি করা যায় না।
ইউআরআইকে সরকারি কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ কাঠামো এবং অভিজাত রাষ্ট্রীয় উচ্চবিদ্যালয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা এই জায়গাতেই প্রশ্ন তৈরি করে। যদি একজন শিক্ষার্থী একটি নির্বাচিত আবাসিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে ইউআরআইয়ে যায় এবং সেখান থেকে সরাসরি সরকারি চাকরি কিংবা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে, তাহলে তার জন্য একটি নির্দিষ্ট ক্যারিয়ার-পথ তৈরি হয়।
এ ধরনের কাঠামোর সুবিধা রয়েছে। রাষ্ট্র তার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত কর্মী পেতে পারে। প্রশাসনিক সংস্কৃতির মধ্যে ধারাবাহিকতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এর ঝুঁকিও আছে—একটি অপেক্ষাকৃত বন্ধ ব্যবস্থা এমন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারে, যারা প্রতিষ্ঠিত কাঠামো পরিচালনায় দক্ষ হলেও সেই কাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত নয়।
রাষ্ট্রের প্রয়োজন শুধু অনুগত প্রশাসক নয়
প্রশাসন চালানোর জন্য দক্ষ আমলা প্রয়োজন। কিন্তু জাতীয় নেতৃত্বের অর্থ শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ বাস্তবায়ন করা নয়। একজন ভবিষ্যৎ নেতা কখনো কখনো নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করবেন, নতুন পথের সন্ধান করবেন এবং এমন সিদ্ধান্ত নেবেন যার তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা নাও থাকতে পারে।
ফ্রান্সের আইএনএসপির উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইউআরআইয়ের পরিকল্পনায় ফরাসি মডেলের উল্লেখ থাকলেও দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বৃহত্তর পরিবেশ এক নয়। ফ্রান্সে সরকারি প্রশাসনের জন্য বিশেষায়িত নেতৃত্ব তৈরির প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেটি একটি বিস্তৃত, আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত ও গবেষণানির্ভর উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে কাজ করে।
অর্থাৎ বিশেষায়িত সরকারি প্রশিক্ষণ এবং বিশ্বমানের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা সেখানে পরস্পরের বিকল্প নয়। বরং তারা পাশাপাশি কাজ করে।
ইন্দোনেশিয়ার জন্যও একই ভারসাম্য প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব তৈরির জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে, কিন্তু সেটি যেন দেশের বৃহত্তর উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়।
বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এড়ানো যাবে না
ইন্দোনেশিয়া এখন এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন তার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ক্রমেই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছে। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই দেশটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
একজন দক্ষ ইন্দোনেশীয় নেতা শুধু জাকার্তার সরকারি দপ্তরে সিদ্ধান্ত নেবেন না। তাকে সিঙ্গাপুরের করপোরেট বোর্ডরুমে আলোচনায় বসতে হতে পারে, ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষণাগারের সঙ্গে অংশীদারত্ব করতে হতে পারে কিংবা জেনেভায় আন্তর্জাতিক আলোচনায় দেশের অবস্থান তুলে ধরতে হতে পারে।
সেখানে জাতীয় গর্ব কোনো বাধা নয়। বরং শক্তিশালী জাতীয় আত্মপরিচয় আন্তর্জাতিক আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু জাতীয়তাবাদ যদি বিশ্ব থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ হয়, তখন সেটি উন্নয়নের শক্তি না হয়ে সীমাবদ্ধতায় পরিণত হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার পরবর্তী প্রজন্মের নেতাদের তাই একই সঙ্গে দেশপ্রেমিক ও বৈশ্বিক হতে হবে। তাদের নিজেদের দেশের ইতিহাস ও স্বার্থ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে, আবার বিশ্বের অন্য সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে স্বচ্ছন্দে কাজ করার সক্ষমতাও থাকতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে সেই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করতে হবে।

উন্মুক্ততার বিকল্প নেই
ইন্দোনেশিয়ার সামনে এখন একটি মৌলিক নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। দেশটি কি এমন একটি নেতৃত্বশ্রেণি তৈরি করবে, যারা মূলত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত? নাকি এমন নেতৃত্ব তৈরি করবে, যারা রাষ্ট্রের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানেও প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম?
দুটির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব। সরকারি প্রশাসনের জন্য বিশেষায়িত একাডেমি থাকতে পারে। ফ্রান্স ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রয়োজন অনুযায়ী এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থাকে এমনভাবে নকশা করা উচিত নয়, যাতে তা একটি আলাদা, বন্ধ এবং রাষ্ট্রনির্ভর অভিজাত শিক্ষাব্যবস্থায় পরিণত হয়।
ইন্দোনেশিয়ার জন্য আরও জরুরি হলো বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান উন্নত করা। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আকর্ষণ করা, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাঠানো, ইংরেজিসহ আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য অর্থায়ন বাড়ানো—এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্ব তৈরিতে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতীয় আনুগত্য শেখানো যায়। কিন্তু কৌতূহল, স্বাধীন চিন্তা, গবেষণার সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করতে প্রয়োজন উন্মুক্ত পরিবেশ।
‘গোল্ডেন ইন্দোনেশিয়া ২০৪৫’-এর লক্ষ্য কেবল নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেই অর্জিত হবে না। একটি দেশের উন্নয়নের আসল শক্তি তার ভবন বা ক্যাম্পাসের সংখ্যা নয়; বরং সেই প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা জ্ঞান, উদ্ভাবন ও স্বাধীন চিন্তার জন্ম দিতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করে ভবিষ্যৎ।
ইন্দোনেশিয়ার ১০টি নতুন ক্যাম্পাসের প্রয়োজন আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে। কিন্তু একটি বিষয় এখনই স্পষ্ট: দেশটির প্রয়োজন এমন নেতা, যারা শুধু নিজেদের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারবেন না, বরং বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠান ও মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং সহযোগিতা—দুটিই করতে পারবেন।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় কখনোই বিশ্বের দরজা বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং নিজের প্রতিষ্ঠানকে এত শক্তিশালী করে তোলা, যাতে তারা বিশ্বের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পরীক্ষাও শেষ পর্যন্ত সেখানেই।
লেখক: প্যাট্রিক জিগেনহাইন, প্রেসিডেন্ট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।
প্যাট্রিক জিগেনহাইন 



















