কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ঐতিহাসিক শিলাইদহ কুঠিবাড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার প্রধান প্রবেশপথ, উন্মুক্ত মঞ্চ, ম্যুরাল, জাদুঘরের আঙিনা এবং ফুল-ফল বাগানেও পানি জমেছে। এতে দর্শনার্থীদের স্বাভাবিকভাবে ঘোরাফেরা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থাপনা ও উদ্ভিদসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পদ্মা নদীর প্রায় ৮০০ মিটার পশ্চিমে অবস্থিত শিলাইদহ কুঠিবাড়ি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যসৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানেই তিনি বহু কবিতা, গান, নাটক ও ছোটগল্প রচনা করেন। তাঁর নোবেল পুরস্কারজয়ী ‘গীতাঞ্জলি’ সংকলনের বেশ কিছু রচনাও এই কুঠিবাড়িতে লেখা। দেশ-বিদেশের হাজারো দর্শনার্থী প্রতিদিন এই ঐতিহাসিক স্থানটি দেখতে আসেন।
পানিতে ডুবে প্রধান প্রবেশপথ ও উন্মুক্ত মঞ্চ
সাম্প্রতিক বৃষ্টির পর কুঠিবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক ও উন্মুক্ত মঞ্চ পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ফলে সেখানে কবিতা আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা বিভিন্ন জমায়েত করা সম্ভব হচ্ছে না। ম্যুরালের চারপাশ ও জাদুঘরের আঙিনাতেও পানি জমে আছে।
বাগানের বেশ কিছু গাছ দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় নুয়ে পড়েছে। কোনো কোনো গাছ উপড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে। দর্শনার্থীরা মূলত পাকা পথের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছেন এবং কুঠিবাড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পুরো পরিবেশ উপভোগ করতে পারছেন না।
দর্শনার্থীদের হতাশা
রাজবাড়ীর পাংশা থেকে আসা হাবিব খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রবীন্দ্রনাথের বাড়ি দেখার ইচ্ছা ছিল তাঁর। অনেক দূর থেকে এসে পুরো এলাকা পানিতে ডুবে থাকতে দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন। এমনকি ছবি তোলার মতো শুকনো জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
রাজশাহী থেকে ৪০ শিক্ষার্থীর একটি দল নিয়ে আসা নাহিদ খান জানান, তাঁরা উন্মুক্ত মঞ্চে কবিতা আবৃত্তি এবং আমবাগানে ছবি তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু দুই জায়গাতেই পানি থাকায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
কুষ্টিয়া শহর থেকে পরিবার নিয়ে আসা ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, অতিথিদের নিয়ে এসে এমন জলাবদ্ধতা দেখে তিনি বিব্রত হয়েছেন। তাঁর মতে, জাতীয় ঐতিহ্যের এই স্থানে পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

প্রতিবছর বর্ষায় একই সমস্যা
দর্শনার্থী আশরাফুল ইসলাম বলেন, শিলাইদহ কুঠিবাড়ি শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছর একই ধরনের জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও এর স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
টাঙ্গাইল থেকে আসা এ টি এম ফরিদুজ্জামান বলেন, প্রকৃতির পরিবেশ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসৃষ্টিকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই প্রকৃতির পানি এখন রবীন্দ্রস্মৃতি সংরক্ষণের স্থানটিকেই হুমকির মুখে ফেলছে—বিষয়টি তাঁর কাছে বেদনাদায়ক।
অচল খাল, বাড়ছে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি
কুঠিবাড়ির কর্মচারী সাকিব হোসেন জানান, দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় ফুল ও ফলের অনেক গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কিছু গাছ মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, পদ্মা নদী কুঠিবাড়ি থেকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে। আগে সড়কের পাশের একটি সরু খাল দিয়ে বৃষ্টির পানি নদীর দিকে চলে যেত। দখল ও দূষণের কারণে খালটি ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়েছে।
কুঠিবাড়ির তত্ত্বাবধায়ক আল আমিন বলেন, দর্শনার্থীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি জাদুঘরের ভেতর-বাইরে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ তৈরি হয়েছে। কুঠিবাড়ির নিজস্ব কোনো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। আগে কুঠিবাড়ির পানি পাশের একটি বিলে গিয়ে জমত। কিন্তু এ বছর অতিবৃষ্টির কারণে উল্টো সেই বিলের পানি কুঠিবাড়ির দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
তিনি জানান, বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করা হলে কুঠিবাড়ির অবকাঠামো এবং মূল্যবান প্রত্নবস্তু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এদিকে কুমারখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ শিগগিরই কুঠিবাড়ি পরিদর্শন করবে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















