২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক গণিত ইউনিয়ন ২১তম ফিল্ডস মেডালজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। চারজন বিজয়ীর মধ্যে দুজনই চীনা নাগরিক—গণিতবিদ ওয়াং হং ও দেং ইউ। গণিতের সর্বোচ্চ মর্যাদার এই পুরস্কারকে প্রায়ই এ শাস্ত্রের নোবেল পুরস্কারের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবারই প্রথম চীনা নাগরিকরা এই সম্মান পেলেন।
ওয়াং ও দেং দুজনের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে উঠেছে চীনের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায়। গুয়াংসি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গুইলিনের ওয়াং চীনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা গাওকাওয়ে ভালো ফল করে পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। শেনঝেনের দেং ২০০৬ সালে ৪৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। ২০০৭ সালে দুজনই পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে ওয়াং ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে উচ্চশিক্ষা নেন। দেং পড়াশোনা করেন এমআইটি ও প্রিন্সটনে এবং বর্তমানে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
গণিতের সাফল্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন জুলাইয়ের শেষ দিকে এই দুই গণিতবিদকে দেওয়া সাক্ষাৎকার চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবে তাঁদের গবেষণার গুরুত্ব কোনো একটি দেশের সীমারেখায় আটকে নেই। তাঁরা এমন মৌলিক গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেছেন, যার সম্ভাব্য প্রয়োগ মানবজাতির জন্য বিস্তৃত।

ওয়াং মার্কিন গণিতবিদ জোশুয়া জালের সঙ্গে ত্রিমাত্রিক কাকেয়া অনুমানের প্রমাণ সম্পন্ন করেন। এটি এমন একটি মৌলিক ফলাফল, যা ভবিষ্যতে রাডার, দূর অনুধাবন প্রযুক্তি এবং সংকেত প্রক্রিয়াকরণের মতো তরঙ্গ-নির্ভর ক্ষেত্রে নতুন বিশ্লেষণাত্মক কাঠামোর পথ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে দেং গণিতের অধ্যাপক জাহের হানি ও শিয়াও মার সঙ্গে হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যার পূর্ণাঙ্গ গাণিতিক প্রমাণ দেন। এর মাধ্যমে তরলগতিবিদ্যা ও পরিসংখ্যানগত পদার্থবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামোর জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। মৌলিক বিজ্ঞানের এ ধরনের অর্জন কোনো একক দেশের সম্পত্তি নয়।
বিজ্ঞানীদের অবাধ যোগাযোগের গুরুত্ব
ফিল্ডস মেডাল পাওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ওয়াং বলেন, গণিত গবেষণার কোনো সীমান্ত নেই এবং বিশ্বের গবেষক ও শিক্ষাবিদদের কোনো বাধা ছাড়াই মতবিনিময় করা উচিত। ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর শিক্ষাজীবন এবং চীন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের গবেষকদের সঙ্গে সহযোগিতা তাঁর গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ওয়াং ও দেংয়ের সাফল্য তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জ্ঞান বিনিময় এবং সম্মিলিত মেধার উদাহরণ। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন সহযোগিতার পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় গবেষণার পরিবেশ সংকুচিত
একতরফাবাদ, জোটভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং শূন্য-সম মানসিকতার প্রভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিও বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও শিক্ষাগত বাধা আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ককে দুর্বল করছে।
দুই চীনা গণিতবিদের পুরস্কার পাওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ১৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ চীনা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও ভিজিটিং স্কলারদের জন্য ভিসা-সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে। এফ ও জে ভিসার নমনীয় নবায়ন ব্যবস্থা বাতিল এবং পড়াশোনা শেষের পর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সুযোগের সময়সীমা কমানো হয়।

এর আগে চীনা শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলের ঘটনাও ঘটেছে, বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক ক্ষেত্রের শিক্ষার্থীরা এর আওতায় পড়েছেন। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন চীনের নিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো গবেষণায় কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়ন বন্ধের কঠোর নীতিও ঘোষণা করে। এর ফলে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গবেষকদের স্বাভাবিক সহযোগিতা ও মেধা বিনিময় আরও কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মেধা প্রত্যাবর্তনেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
এর প্রভাব মেধা প্রবাহেও দেখা যাচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ১৩ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত চীনা প্রযুক্তি ও গবেষণা খাতের দক্ষ ব্যক্তিদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। নিয়োগ প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে পড়াশোনা করা চীনা নাগরিকদের দেশে ফিরে চাকরিতে প্রবেশের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেড়েছে এবং ২০১৮ সালের তুলনায় তা দ্বিগুণেরও বেশি।
বিদেশে থাকা পিএইচডি শিক্ষার্থীদের এক জরিপেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪ সালে স্নাতক শেষে চীনে ফেরার পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন ৩৮ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৫৯ শতাংশে পৌঁছায়।
বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে গবেষক, শিক্ষার্থী ও মেধার অবাধ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে সেটি কোনো পক্ষের জন্যই প্রকৃত সাফল্য নয়। বরং এর ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক জ্ঞানচর্চা ও মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে। কারণ বিজ্ঞানের প্রকৃতি এমনই—তার কোনো সীমান্ত নেই।
লি শিয়াওইয়াং 



















