০৮:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী কিছুই ঘটবে না—এই বাজি কি ফেডের জন্য বিপজ্জনক? ৪৩ বছর বয়সেও ‘চিরকিশোর’ রাজনীতিক! জ্যাক পোলানস্কিকে ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক হরমুজ ও লোহিত সাগরের ঝুঁকি বাড়তেই বিশ্বজুড়ে তেল পাইপলাইনে বিনিয়োগের হিড়িক চাঁদের মাটিতে রকেট, পৃথিবীতে ধাক্কা—মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন শঙ্কা জাপানকে ঘিরে চীনের আগ্রাসী চাপ, আসল লক্ষ্য কি যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় আধিপত্য? দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী শিল্পে টিএসএমসির কৌশল, যেভাবে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে বিশ্বজয় গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান ইসরায়েলের, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার নয় দ্বৈত কৌশলগত সিদ্ধান্ত: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সংঘাত নয়, শান্তির পথ বেছে নেওয়ার সময় গ্র্যামির ‘এশিয়ান পপ’ খাঁচায় বিটিএসকে বন্দি করা কি সত্যিই স্বীকৃতি?

পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই: অভিযান বাড়ছে, নিরাপত্তা ফিরছে না

পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তীব্র। গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান, তল্লাশি, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা থেকে শুরু করে বড় পরিসরের সামরিক তৎপরতা—সব ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা বাহিনী সক্রিয়। কিন্তু এই বিপুল অপারেশনাল চাপ সত্ত্বেও সন্ত্রাসী সহিংসতার গ্রাফ নামছে না। বরং জুলাইয়ে হামলার সংখ্যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে পরিস্থিতির অবনতি পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামোর সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে: অভিযান যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে সহিংসতা কমছে না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সামরিক সক্ষমতার মধ্যে খুঁজলে ভুল হবে। পাকিস্তানের মূল সংকট এখন কেবল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নয়; বরং অভিযান থেকে স্থায়ী নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় পৌঁছানোর মতো সমন্বিত কৌশলের অভাব।

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারার সংকেত

সন্ত্রাসমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল—এমন এলাকাতেও সহিংসতার প্রত্যাবর্তন বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সোয়াতে কাবাল থানার বাইরে আত্মঘাতী হামলা তার একটি ভয়াবহ উদাহরণ। স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত শান্তি সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষজন যখন ফিরছিলেন, তখন হামলাটি ঘটে। এতে পুলিশ সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকসহ ১৭ জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হন।

হামলার লক্ষ্য সমাবেশ ছিল, নাকি পুলিশ স্টেশন—এ নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও ঘটনাটি একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে। নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে কোনো অঞ্চল সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও সেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবন, স্থানীয় প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন না হলে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক আবার জায়গা করে নিতে পারে।

বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি আরও জটিল

জুলাইয়ে বেলুচিস্তান কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার একটি সময় পার করেছে। মাস্টুং, লাসবেলা, জিয়ারাত, কেচ ও খুজদারে সমন্বিত ও উচ্চ-প্রভাবের হামলা দেখিয়েছে যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একই সময়ে বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে পাকিস্তানজুড়ে ২৬টি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে, জুনে যার সংখ্যা ছিল ২৪। সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কর্পস এবং পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটগুলোর পরিচালিত এসব অভিযানে ২০৫ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। বেলুচিস্তানে হয়েছে ১৮টি এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ায় আটটি অভিযান। শুধু কোয়েটা ও আশপাশের শাবান এবং হান্না উরাক এলাকায় ছয়টি অভিযানে ৬৮ জন জঙ্গি নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অপারেশনাল সক্ষমতার এই চিত্র নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে একটি ভারসাম্যহীনতাও স্পষ্ট। জুলাইয়ে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র পাঁচজন, সবাই করাচিতে। অর্থাৎ অভিযানের ফলাফলে নিহতের সংখ্যা বিপুল হলেও গ্রেপ্তার ও তদন্তের অংশ অত্যন্ত সীমিত।

এখানেই পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়। একজন জীবিত গ্রেপ্তারকৃত সন্দেহভাজন থেকে তার সহযোগী, অর্থদাতা, নিয়োগকারী, যোগাযোগব্যবস্থা ও সংগঠনের কাঠামো সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব। কিন্তু নিহত একজন জঙ্গির কাছ থেকে সেই তথ্য উদ্ধার করা যায় না। ফলে শুধু প্রাণঘাতী শক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়লে তাৎক্ষণিক সাফল্য মিললেও সন্ত্রাসী অবকাঠামো ভাঙার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

অভিযানের সঙ্গে আস্থার লড়াইও জরুরি

নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। এসব অভিযোগের সত্যতা প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগগুলো তদন্তের বাইরে থাকলে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্য দিতে হয়।

হাসানখেলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে। পেশোয়ার প্রেস ক্লাবের সামনে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, তাদের এলাকায় ড্রোন হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং স্কুল, মসজিদ ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সেটি তদন্তের বিষয়। কিন্তু রাষ্ট্র যদি এমন অভিযোগকে স্বচ্ছতার সঙ্গে খতিয়ে না দেখে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। আর সেই অবিশ্বাসই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রচারের জন্য কার্যকর উপাদানে পরিণত হয়।

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নতুন বিস্তারের আশঙ্কা

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোই প্রধান হুমকি। ২০২১ সালে সহিংসতা পুনরায় বাড়ার পর থেকে দক্ষিণাঞ্চল ও সাবেক উপজাতীয় এলাকাগুলোতে হামলা বেশি হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরু থেকে তাদের কর্মকাণ্ডের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

সন্ত্রাসীরা এখন বসতিপূর্ণ জেলাগুলোতেও নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করছে। তাদের নেটওয়ার্ক বেলুচিস্তান এবং সম্ভাব্যভাবে দক্ষিণ পাঞ্জাবের দিকেও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা অভিযান চলার পরও যদি কোনো গোষ্ঠী তার লোকবল, যোগাযোগ ও রসদ সরবরাহের ব্যবস্থা সচল রাখতে পারে, তাহলে বোঝা যায় সমস্যাটি কেবল সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়।

তাদের কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। আত্মঘাতী হামলা, হত্যাকাণ্ড এবং পুলিশ ও সামরিক স্থাপনায় আক্রমণের পাশাপাশি কোয়াডকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করে বিস্ফোরক হামলার পরীক্ষাও হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা, সাধারণ মানুষ ও জনসেবামূলক অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য শুধু প্রাণহানি ঘটানো নয়; রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে দুর্বল করা, জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত করাও এর অংশ।

Stability returning to Pakistan due to army operations: General Raheel -  Pakistan - DAWN.COM

আফগানিস্তান প্রশ্নের বাইরে নয়, কিন্তু একমাত্র সমাধানও নয়

আফগানিস্তানের মাটিতে টিটিপির আশ্রয় ও ঘাঁটি নিয়ে কাবুলের ওপর ইসলামাবাদের চাপ অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত নেটওয়ার্ক পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য অবশ্যই বড় উদ্বেগ। কিন্তু আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ানোকে দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা ঘাটতি পূরণের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।

সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বা কূটনৈতিক চাপ সন্ত্রাসীদের চলাচল সীমিত করতে পারে। কিন্তু দুর্বল পুলিশি তদন্ত, প্রশাসনিক ঘাটতি, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা স্থানীয় জনগণের রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থা দূর করতে পারে না। সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে তাই সীমান্তের প্রশ্নের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে।

বেলুচিস্তানে সামরিক সমাধানের সীমাবদ্ধতা

বেলুচিস্তানে সংকটের চরিত্র আরও বহুমাত্রিক। সেখানে বেলুচ সশস্ত্র সংগঠনের পাশাপাশি টিটিপি ও আইএস-খোরাসানের মতো ধর্মীয় মতাদর্শপ্রাণিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতাও রয়েছে। বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, দুর্গম এলাকা এবং সীমিত প্রশাসনিক উপস্থিতি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে চলাচল ও হামলার সুযোগ দেয়।

তবে শুধু ভৌগোলিক বাস্তবতা দিয়ে এই সংকট ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, দুর্বল জনসেবা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি দীর্ঘদিনের অনাস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরিস্থিতি বিশেষ করে হতাশ তরুণদের মধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এই কারণেই বেলুচিস্তানে রাজনৈতিক উদ্যোগকে নিরাপত্তা অভিযানের পরিপূরক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করে আবার তা মাঝপথে পরিত্যাগ করলে নিরাপত্তা অভিযানও স্থায়ী ফল দেবে না।

যে জায়গা নিরাপত্তা বাহিনী পুনরুদ্ধার করে, সেখানে রাষ্ট্রকে উপস্থিত হতে হবে

সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো—অভিযানের পর সেই এলাকায় কী ঘটে। নিরাপত্তা বাহিনী কোনো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর যদি প্রশাসন কার্যকর না হয়, স্থানীয় সরকার সেবা দিতে না পারে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দুর্বল থাকে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়ে, তাহলে শূন্যস্থান আবারও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পূরণ করতে পারে।

তাই স্থানীয় জনগণকে শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার আওতাধীন মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের রাষ্ট্রের অংশীদার করতে হবে। স্থানীয় মানুষের তথ্য, অভিজ্ঞতা ও সতর্কতাকে কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সেবার উপস্থিতি সন্ত্রাসীদের তৈরি করা ক্ষোভের ক্ষেত্র সংকুচিত করতে পারে।

পাকিস্তানের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ অভিযান বাড়ানো নয়, অভিযানের ফলকে স্থায়ী শান্তিতে রূপ দেওয়া। বন্নু, কোয়েটা ও অন্যান্য এলাকায় সাম্প্রতিক অভিযান নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু কৌশলগত সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় পরিণত হবে।

কোনো এলাকা পরিষ্কার করা আর সেটিকে নিরাপদ রাখা এক বিষয় নয়। কোনো সন্ত্রাসীকে হত্যা করা আর যে পরিবেশ তাকে তৈরি করেছে, সেই পরিবেশ ভেঙে দেওয়া একই বিষয় নয়। পাকিস্তান যদি পুলিশি সক্ষমতা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং জনগণের আস্থা—এই সবগুলোকে একই কৌশলের মধ্যে আনতে না পারে, তাহলে একই ভূখণ্ড বারবার দখলমুক্ত করতে হবে, আর সন্ত্রাসীরাও বারবার সেখানে ফিরে আসার সুযোগ পাবে।

এখন পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই কতজন সন্ত্রাসী নিহত হলো, তা নয়; বরং কতটা স্থায়ীভাবে সন্ত্রাসের ভিত্তি দুর্বল করা গেল। এই পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হলে আরও অভিযান হতে পারে, আরও প্রাণহানি ঘটতে পারে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত শান্তি অধরাই থেকে যাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী

পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই: অভিযান বাড়ছে, নিরাপত্তা ফিরছে না

০৬:৫৩:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তীব্র। গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান, তল্লাশি, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা থেকে শুরু করে বড় পরিসরের সামরিক তৎপরতা—সব ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা বাহিনী সক্রিয়। কিন্তু এই বিপুল অপারেশনাল চাপ সত্ত্বেও সন্ত্রাসী সহিংসতার গ্রাফ নামছে না। বরং জুলাইয়ে হামলার সংখ্যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে পরিস্থিতির অবনতি পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামোর সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে: অভিযান যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে সহিংসতা কমছে না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সামরিক সক্ষমতার মধ্যে খুঁজলে ভুল হবে। পাকিস্তানের মূল সংকট এখন কেবল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নয়; বরং অভিযান থেকে স্থায়ী নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় পৌঁছানোর মতো সমন্বিত কৌশলের অভাব।

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারার সংকেত

সন্ত্রাসমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল—এমন এলাকাতেও সহিংসতার প্রত্যাবর্তন বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সোয়াতে কাবাল থানার বাইরে আত্মঘাতী হামলা তার একটি ভয়াবহ উদাহরণ। স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত শান্তি সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষজন যখন ফিরছিলেন, তখন হামলাটি ঘটে। এতে পুলিশ সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকসহ ১৭ জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হন।

হামলার লক্ষ্য সমাবেশ ছিল, নাকি পুলিশ স্টেশন—এ নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও ঘটনাটি একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে। নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে কোনো অঞ্চল সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও সেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবন, স্থানীয় প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন না হলে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক আবার জায়গা করে নিতে পারে।

বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি আরও জটিল

জুলাইয়ে বেলুচিস্তান কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার একটি সময় পার করেছে। মাস্টুং, লাসবেলা, জিয়ারাত, কেচ ও খুজদারে সমন্বিত ও উচ্চ-প্রভাবের হামলা দেখিয়েছে যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একই সময়ে বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে পাকিস্তানজুড়ে ২৬টি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে, জুনে যার সংখ্যা ছিল ২৪। সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কর্পস এবং পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটগুলোর পরিচালিত এসব অভিযানে ২০৫ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। বেলুচিস্তানে হয়েছে ১৮টি এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ায় আটটি অভিযান। শুধু কোয়েটা ও আশপাশের শাবান এবং হান্না উরাক এলাকায় ছয়টি অভিযানে ৬৮ জন জঙ্গি নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অপারেশনাল সক্ষমতার এই চিত্র নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে একটি ভারসাম্যহীনতাও স্পষ্ট। জুলাইয়ে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র পাঁচজন, সবাই করাচিতে। অর্থাৎ অভিযানের ফলাফলে নিহতের সংখ্যা বিপুল হলেও গ্রেপ্তার ও তদন্তের অংশ অত্যন্ত সীমিত।

এখানেই পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়। একজন জীবিত গ্রেপ্তারকৃত সন্দেহভাজন থেকে তার সহযোগী, অর্থদাতা, নিয়োগকারী, যোগাযোগব্যবস্থা ও সংগঠনের কাঠামো সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব। কিন্তু নিহত একজন জঙ্গির কাছ থেকে সেই তথ্য উদ্ধার করা যায় না। ফলে শুধু প্রাণঘাতী শক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়লে তাৎক্ষণিক সাফল্য মিললেও সন্ত্রাসী অবকাঠামো ভাঙার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

অভিযানের সঙ্গে আস্থার লড়াইও জরুরি

নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। এসব অভিযোগের সত্যতা প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগগুলো তদন্তের বাইরে থাকলে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্য দিতে হয়।

হাসানখেলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে। পেশোয়ার প্রেস ক্লাবের সামনে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, তাদের এলাকায় ড্রোন হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং স্কুল, মসজিদ ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সেটি তদন্তের বিষয়। কিন্তু রাষ্ট্র যদি এমন অভিযোগকে স্বচ্ছতার সঙ্গে খতিয়ে না দেখে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। আর সেই অবিশ্বাসই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রচারের জন্য কার্যকর উপাদানে পরিণত হয়।

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নতুন বিস্তারের আশঙ্কা

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোই প্রধান হুমকি। ২০২১ সালে সহিংসতা পুনরায় বাড়ার পর থেকে দক্ষিণাঞ্চল ও সাবেক উপজাতীয় এলাকাগুলোতে হামলা বেশি হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরু থেকে তাদের কর্মকাণ্ডের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

সন্ত্রাসীরা এখন বসতিপূর্ণ জেলাগুলোতেও নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করছে। তাদের নেটওয়ার্ক বেলুচিস্তান এবং সম্ভাব্যভাবে দক্ষিণ পাঞ্জাবের দিকেও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা অভিযান চলার পরও যদি কোনো গোষ্ঠী তার লোকবল, যোগাযোগ ও রসদ সরবরাহের ব্যবস্থা সচল রাখতে পারে, তাহলে বোঝা যায় সমস্যাটি কেবল সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়।

তাদের কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। আত্মঘাতী হামলা, হত্যাকাণ্ড এবং পুলিশ ও সামরিক স্থাপনায় আক্রমণের পাশাপাশি কোয়াডকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করে বিস্ফোরক হামলার পরীক্ষাও হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা, সাধারণ মানুষ ও জনসেবামূলক অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য শুধু প্রাণহানি ঘটানো নয়; রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে দুর্বল করা, জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত করাও এর অংশ।

Stability returning to Pakistan due to army operations: General Raheel -  Pakistan - DAWN.COM

আফগানিস্তান প্রশ্নের বাইরে নয়, কিন্তু একমাত্র সমাধানও নয়

আফগানিস্তানের মাটিতে টিটিপির আশ্রয় ও ঘাঁটি নিয়ে কাবুলের ওপর ইসলামাবাদের চাপ অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত নেটওয়ার্ক পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য অবশ্যই বড় উদ্বেগ। কিন্তু আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ানোকে দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা ঘাটতি পূরণের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।

সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বা কূটনৈতিক চাপ সন্ত্রাসীদের চলাচল সীমিত করতে পারে। কিন্তু দুর্বল পুলিশি তদন্ত, প্রশাসনিক ঘাটতি, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা স্থানীয় জনগণের রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থা দূর করতে পারে না। সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে তাই সীমান্তের প্রশ্নের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে।

বেলুচিস্তানে সামরিক সমাধানের সীমাবদ্ধতা

বেলুচিস্তানে সংকটের চরিত্র আরও বহুমাত্রিক। সেখানে বেলুচ সশস্ত্র সংগঠনের পাশাপাশি টিটিপি ও আইএস-খোরাসানের মতো ধর্মীয় মতাদর্শপ্রাণিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতাও রয়েছে। বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, দুর্গম এলাকা এবং সীমিত প্রশাসনিক উপস্থিতি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে চলাচল ও হামলার সুযোগ দেয়।

তবে শুধু ভৌগোলিক বাস্তবতা দিয়ে এই সংকট ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, দুর্বল জনসেবা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি দীর্ঘদিনের অনাস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরিস্থিতি বিশেষ করে হতাশ তরুণদের মধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এই কারণেই বেলুচিস্তানে রাজনৈতিক উদ্যোগকে নিরাপত্তা অভিযানের পরিপূরক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করে আবার তা মাঝপথে পরিত্যাগ করলে নিরাপত্তা অভিযানও স্থায়ী ফল দেবে না।

যে জায়গা নিরাপত্তা বাহিনী পুনরুদ্ধার করে, সেখানে রাষ্ট্রকে উপস্থিত হতে হবে

সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো—অভিযানের পর সেই এলাকায় কী ঘটে। নিরাপত্তা বাহিনী কোনো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর যদি প্রশাসন কার্যকর না হয়, স্থানীয় সরকার সেবা দিতে না পারে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দুর্বল থাকে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়ে, তাহলে শূন্যস্থান আবারও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পূরণ করতে পারে।

তাই স্থানীয় জনগণকে শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার আওতাধীন মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের রাষ্ট্রের অংশীদার করতে হবে। স্থানীয় মানুষের তথ্য, অভিজ্ঞতা ও সতর্কতাকে কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সেবার উপস্থিতি সন্ত্রাসীদের তৈরি করা ক্ষোভের ক্ষেত্র সংকুচিত করতে পারে।

পাকিস্তানের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ অভিযান বাড়ানো নয়, অভিযানের ফলকে স্থায়ী শান্তিতে রূপ দেওয়া। বন্নু, কোয়েটা ও অন্যান্য এলাকায় সাম্প্রতিক অভিযান নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু কৌশলগত সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় পরিণত হবে।

কোনো এলাকা পরিষ্কার করা আর সেটিকে নিরাপদ রাখা এক বিষয় নয়। কোনো সন্ত্রাসীকে হত্যা করা আর যে পরিবেশ তাকে তৈরি করেছে, সেই পরিবেশ ভেঙে দেওয়া একই বিষয় নয়। পাকিস্তান যদি পুলিশি সক্ষমতা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং জনগণের আস্থা—এই সবগুলোকে একই কৌশলের মধ্যে আনতে না পারে, তাহলে একই ভূখণ্ড বারবার দখলমুক্ত করতে হবে, আর সন্ত্রাসীরাও বারবার সেখানে ফিরে আসার সুযোগ পাবে।

এখন পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই কতজন সন্ত্রাসী নিহত হলো, তা নয়; বরং কতটা স্থায়ীভাবে সন্ত্রাসের ভিত্তি দুর্বল করা গেল। এই পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হলে আরও অভিযান হতে পারে, আরও প্রাণহানি ঘটতে পারে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত শান্তি অধরাই থেকে যাবে।