ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা কেবল একটি কূটনৈতিক দলিল নয়; এটি ছিল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের জন্য এমন একটি বাস্তবসম্মত সমাধান, যার পেছনে উভয়েরই নিজস্ব স্বার্থ কাজ করেছে। তাই সমঝোতার পর তৈরি হওয়া উত্তেজনাকে সরাসরি চুক্তি ভেঙে পড়ার লক্ষণ হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। বরং এটি ছিল—সমঝোতা বজায় রেখেও কে কতটা কৌশলগত সুবিধা আদায় করতে পারে—তার একটি পরীক্ষা।
ইরান তার সামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছে। বিনিময়ে দেশটি প্রত্যাশা করেছে, সমঝোতার শর্ত শুধু কাগজে-কলমে নয়, তার অন্তর্নিহিত ভারসাম্যও সম্মান করা হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ ছিল হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা এবং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি কমাতে অতিরিক্ত সামুদ্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ওয়াশিংটনের কাছে এসব উদ্যোগ হয়তো ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার স্বাভাবিক প্রস্তুতি। কিন্তু তেহরানের চোখে তা ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। ইরান যখন পারমাণবিক সক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছে, তখন হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তার কৌশলগত গুরুত্বও যদি ধীরে ধীরে কমিয়ে দেওয়া হয়, সেটিকে সমঝোতার ভারসাম্য নষ্ট করার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা স্বাভাবিক।
এ কারণেই প্রণালিটি একবার খুলে দেওয়া এবং পরে আবার বন্ধ করার ঘটনাকে শুধু অবাধ্যতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে ছিল আস্থার সংকট এবং এই ধারণা যে সমঝোতার মূল ভারসাম্য ধীরে ধীরে ইরানের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে।
হরমুজে ইরানকে বাদ দিয়ে স্থায়ী নিরাপত্তা সম্ভব নয়
ইরান ও ওমানের সাম্প্রতিক আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপদ ও স্থায়ী নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানকে পাশ কাটিয়ে কোনো কার্যকর কাঠামো তৈরি করা কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আবারও প্রমাণিত হচ্ছে—ভূগোলকে কূটনীতির মাধ্যমে পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত কে হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—বৃহত্তর সমঝোতা ব্যর্থ হলে লাভবান হবে কারা?
যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরানও নয়।
ওয়াশিংটনের জন্য সমঝোতার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক দায় কিছুটা হ্রাস করার সুযোগ। ইরানের জন্য সম্ভাব্য লাভ ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ।
কিন্তু সমঝোতা ব্যর্থ হলে কিছু পক্ষ তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেতে পারে। ইসরায়েলের আঞ্চলিক কৌশলের একটি বড় অংশ ইরানকে নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেহরানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তার জন্য বেশি সুবিধাজনক হতে পারে। চীন ও রাশিয়াও এমন একটি ইরান থেকে কৌশলগত সুবিধা পায়, যে দেশ পশ্চিমের সঙ্গে পূর্ণ সম্পর্ক পুনর্গঠনের বদলে তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু কট্টরপন্থী শক্তিও হয়তো স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রিত ইরানকে বেশি স্বস্তিদায়ক মনে করে।
ইরানের অভ্যন্তরেও এমন কিছু স্বার্থগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা-নির্ভর পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও এমন রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে, যাদের কাছে ইরানের সঙ্গে সংঘাত কেবল একটি নীতি নয়, প্রায় স্থায়ী রাজনৈতিক অবস্থান।
এদের কারও সমঝোতা সরাসরি ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। পারস্পরিক অবিশ্বাসই যথেষ্ট।
সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ
যুদ্ধ সবসময় ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা কিংবা যুদ্ধক্ষেত্র দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো যুদ্ধ ফিরে আসে সন্দেহ, ভুল হিসাব এবং প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল ধারণার মাধ্যমে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এমন একটি ধীরগতির কৌশলগত প্রত্যাবর্তন, যেখানে দুই দেশ আবার সেই সংঘাতের পথে ফিরে যাবে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার যৌক্তিক কারণ উভয়েরই রয়েছে।
এখানে ওয়াশিংটনের দায়িত্ব বেশি। যে পক্ষ আলোচনায় তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, সমঝোতা হওয়ার পর আস্থা পুনর্গঠনের দায়ও তার ওপর বেশি বর্তায়। যুক্তরাষ্ট্রকে তাই শুধু চুক্তির ভাষা নয়, তার উদ্দেশ্য ও ভারসাম্যও সম্মান করার বিষয়ে স্পষ্টতা দেখাতে হবে।
তবে ইরানের সিদ্ধান্তও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তেহরান এখন যে কৌশল গ্রহণ করবে, তার প্রভাব বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের মেয়াদ ছাড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে অবমূল্যায়ন করা যাবে না
দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা একটি বিষয় শেখায়—আজকের সংকট সামলানোই কৌশলগত বিচক্ষণতার শেষ কথা নয়। আসল দক্ষতা হলো আগামী দিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুমান করা।
ইরানের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ওয়াশিংটনের নীতিতে দ্রুত ও নাটকীয় পরিবর্তনের আশা করা তেহরানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান রাজনীতিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স একটি তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত ও বাস্তববাদী ধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং ভবিষ্যতে দলটির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক গতিপথ বড় কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনায় বদলে না গেলে, আগামী বছরগুলোতেও রিপাবলিকানদের প্রভাব মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ থাকতে পারে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যেও পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ দিক নিয়ে বিতর্ক চলছে।
তাই ইরানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল কোনো আকস্মিক মার্কিন নীতিবদলের প্রত্যাশার ওপর নির্ভর না করে ওয়াশিংটনে সম্ভাব্য ধারাবাহিকতার হিসাবেই তৈরি হওয়া উচিত।
ইরানের জন্য বিচ্ছিন্নতা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়
তেহরানের আরেকটি ভুল এড়ানো জরুরি। বর্তমান কূটনৈতিক পরিস্থিতি এমনভাবে পরিচালনা করা উচিত নয়, যাতে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা আটকে দিয়ে ইসরায়েল এমন একটি কূটনৈতিক সাফল্য পেয়ে যায়, যা বহু দশকের সামরিক প্রচেষ্টায়ও অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
ইরানের স্থায়ী বিচ্ছিন্নতা কোনো কার্যকর কৌশলগত লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে ইরানকে যুক্ত করা, যেখানে তার প্রভাবকে বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করা হবে, কিন্তু সেই প্রভাবকে স্থায়ী সংঘাতের কারণ বানানো হবে না।
পারমাণবিক প্রশ্নে তেহরানের নিরাপত্তা-চিন্তার পেছনে যুক্তি রয়েছে। ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক আলোচনা রয়েছে। সেই বাস্তবতায় ইরানের প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বোঝা কঠিন নয়।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে ইরানের অবস্থান কেবল পারমাণবিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়। দেশটির দীর্ঘ ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, কৌশলগত গভীরতা এবং বহু দশকের চাপ মোকাবিলার অভিজ্ঞতাই তাকে একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছে।
হরমুজ প্রণালি সেই বাস্তবতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তাই হরমুজের গুরুত্বও কেবল সাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফল নয়; এটি স্থায়ী ভূগোলের শক্তি।
আর সেই কারণেই হরমুজকে সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যায় তখনই, যখন সেটি বারবার ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। প্রকৃত কৌশলগত শক্তি অনেক সময় তার প্রদর্শনে নয়, প্রয়োজনের মুহূর্ত পর্যন্ত সেটিকে সংরক্ষণ করার ক্ষমতায়।

শান্তি ইরানকে কী দিতে পারে
আঞ্চলিক উত্তেজনা কমলে ইরানের তেল রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ধীরে ধীরে ব্যবহারের পথ খুলতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ব্যস্ত থাকা অর্থনীতিকে স্বাভাবিক বাণিজ্য ও উৎপাদনভিত্তিক প্রবৃদ্ধির দিকে ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক অর্থনীতিতে রূপ নিলে স্থায়ী সংঘাতের অর্থনৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হবে। একটি শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যার আয়, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত, শান্তি ও উন্মুক্ততার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ফিরে এসে অন্য দেশগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ইরানের ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা অস্বাভাবিক নয়।
তবে শান্তির অর্থ আত্মসমর্পণ নয়। আবার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অর্থ ইরানের প্রভাব প্রত্যাহারও নয়। প্রয়োজন এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেরাই তৈরি করবে এবং যার দায়িত্বও তারাই বহন করবে।
এমন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বাইরের শক্তির নিরাপত্তা-নির্ভরতা কমাতে পারে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর যৌথ দায়িত্ব বাড়াতে পারে।
এই ব্যবস্থার অন্যতম স্থপতি হওয়ার মতো ইতিহাস, ভূগোল, সক্ষমতা ও রাজনৈতিক ওজন ইরানের রয়েছে। প্রশ্ন হলো, তেহরান সেই সুযোগটি গ্রহণ করবে কি না।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের কাছেও সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে—তারা নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির শুধু ভাষা নয়, তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও ভারসাম্যও সম্মান করবে কি না।
শেষ পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই সমঝোতা সাময়িকভাবে আরেকটি সংকট ঠেকানোর ব্যবস্থা হয়ে থাকবে, নাকি দীর্ঘ সংঘাতের পর একটি নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার সূচনা করবে।
শান্তিকে সুযোগ দেওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং কখন সংঘাতের মূল্য আর কৌশলগত লাভের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তা বুঝতে পারাই রাষ্ট্রীয় বিচক্ষণতার বড় পরীক্ষা।
আবদেলরহিম শালাবি 



















