বিশ্বসংগীতের সবচেয়ে আলোচিত পুরস্কারগুলোর একটি গ্র্যামি। দীর্ঘদিন ধরে এই পুরস্কার শুধু শিল্পীদের সম্মানিতই করেনি, বরং কোন সংগীতকে কীভাবে দেখা হবে, কোন শিল্পী কোন ঘরানার প্রতিনিধি—সেই ধারণা তৈরিতেও বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সংগীতের সীমানা যখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখন পুরোনো শ্রেণিবিন্যাস কতটা প্রাসঙ্গিক—এই প্রশ্নই এখন নতুন করে সামনে এনেছে বিটিএস।
জুলাইয়ের শেষ দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার এই বিশ্বখ্যাত ব্যান্ডের সাত সদস্য নিজেদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একই বক্তব্য প্রকাশ করে জানিয়ে দেন, তারা ২০২৭ সালের গ্র্যামিতে অংশ নেওয়ার জন্য এবার নিজেদের মনোনয়ন দেবে না। বক্তব্যটি ছিল সংক্ষিপ্ত ও ভদ্র, কিন্তু এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য যথেষ্ট গভীর।
তাদের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে গ্র্যামির নতুন ‘বেস্ট এশিয়ান পপ মিউজিক পারফরম্যান্স’ বিভাগ। প্রশ্নটা শুধু একটি পুরস্কারের বিভাগ নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হলো—বিশ্বসংগীতের সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি কি এখনো শিল্পীদের তাদের ভূগোল, ভাষা বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে দেখবে, নাকি সংগীতের নিজস্ব বৈচিত্র্যকে তার পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে?
বিটিএসের সিদ্ধান্ত তাই নিছক পুরস্কার বর্জন নয়। এটি শিল্পীকে সংজ্ঞায়িত করার অধিকার কার—সে প্রশ্নেরও একটি জোরালো ইঙ্গিত।
এশিয়ান পপ বলতে আসলে কী বোঝায়?
জুনে গ্র্যামির আয়োজক রেকর্ডিং একাডেমি আগামী পুরস্কার অনুষ্ঠানের জন্য প্রথমবারের মতো এশিয়াকেন্দ্রিক এই নতুন বিভাগ চালুর ঘোষণা দেয়। একাডেমির প্রধান নির্বাহী হার্ভে মেসন জুনিয়র যুক্তি দিয়েছেন, এশিয়া থেকে আসা পপ সংগীতের ব্যাপক বিস্তার ও বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যই নতুন বিভাগটি তৈরি করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন বিভাগ যোগ হওয়া মানে শিল্পীদের অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।
কারিগরি দিক থেকে যুক্তিটি যথেষ্ট পরিষ্কার। কোনো শিল্পী এশিয়ান পপ বিভাগে মনোনীত হওয়ার পাশাপাশি অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার বা সং অব দ্য ইয়ারের মতো সাধারণ বিভাগেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। অর্থাৎ নতুন বিভাগটি সরাসরি অন্য পুরস্কারের দরজা বন্ধ করছে না।
কিন্তু বিতর্কের আসল জায়গা এখানে নয়।
সমস্যা হলো, একটি বিশাল মহাদেশের সংগীতকে একটি ছাতার নিচে এনে সেটিকে ‘এশিয়ান পপ’ বলে চিহ্নিত করার মধ্যেই কি নতুন ধরনের সীমারেখা তৈরি হচ্ছে না?
এশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাদেশ। এর জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ। এই ভূখণ্ডের সংগীত ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি ও আধুনিক সাউন্ডের বৈচিত্র্য কল্পনাতীত। দক্ষিণ কোরিয়ার কে-পপ, জাপানি পপ, ভারতীয় সংগীত, চীনা পপ, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ধারার সংগীত কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অসংখ্য স্থানীয় ও আধুনিক ঘরানা—এসবকে কেবল একটি আঞ্চলিক পরিচয়ে আটকে দেওয়া কতটা অর্থবহ?

বিটিএসের সংগীতই এই সমস্যার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।
তাদের সৃষ্টিতে হিপ-হপ, আরঅ্যান্ডবি, ইলেকট্রনিক ড্যান্স মিউজিক, রক, ফাঙ্ক, ডিস্কো এবং ঐতিহ্যবাহী কোরীয় সংগীতের নানা উপাদান রয়েছে। তাদের সাম্প্রতিক অ্যালবাম ‘আরিরাং’-এ ইংরেজি গানের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে এতে যুক্ত হয়েছেন আন্তর্জাতিক সংগীতজগতের বহু পরিচিত শিল্পী ও প্রযোজক, যাদের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের।
তাহলে এই সংগীতকে শুধু ‘এশিয়ান পপ’ বলা কি তার প্রকৃত পরিসরকে তুলে ধরে, নাকি বরং সংকুচিত করে?
স্বীকৃতি নাকি নতুন সীমারেখা?
রেকর্ডিং একাডেমির উদ্যোগকে সরাসরি বৈষম্যমূলক বলে বাতিল করাও সহজ নয়। প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক বছরে সদস্যপদ ও ভোটার কাঠামোয় বৈচিত্র্য বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। ২০২৪ সালের সদস্যসংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, একাডেমির ভোটারদের ৩৬ শতাংশ নিজেদের শ্বেতাঙ্গ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। কৃষ্ণাঙ্গ ২৬ শতাংশ, হিস্পানিক ১১ শতাংশ এবং এশিয়ান বা প্যাসিফিক আইল্যান্ডার ৬ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকান পরিচয়ের ভোটার ছিলেন ২ শতাংশ।
দশক কয়েক আগের তুলনায় এটি অবশ্যই পরিবর্তনের ইঙ্গিত। একসময় গ্র্যামির কাঠামো ছিল অনেক বেশি শ্বেতাঙ্গ ও পুরুষকেন্দ্রিক। তাই বৈশ্বিক সংগীতের নতুন শক্তিগুলোকে জায়গা করে দেওয়ার প্রচেষ্টা একেবারে অস্বীকার করার মতো নয়।
কিন্তু প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো আর শিল্পীদের নতুন পরিচয়-সীমার মধ্যে আটকে দেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
ফোর্বসে সংগীতশিল্পের নির্বাহী অলিভিয়া শালহুপ এই দ্বন্দ্বটিকেই গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, জাতিগত পরিচয়, অঞ্চল বা ভাষাকে কেন্দ্র করে তৈরি কোনো বিভাগ একই সঙ্গে দুটি বিপরীত অর্থ বহন করতে পারে। একদিকে তা সেই শিল্পীদের স্বীকৃতি দিতে পারে যারা আগে উপেক্ষিত ছিলেন। অন্যদিকে, সেই পরিচয়ই আবার তাদের মূলধারার প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কত দূর যেতে পারবেন, তার একটি অদৃশ্য সীমা তৈরি করতে পারে।
বিটিএসের আপত্তিকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই দেখা দরকার।
আফ্রিকার অভিজ্ঞতাও সতর্কবার্তা
এই বিতর্ক শুধু এশিয়াকে ঘিরে নয়। ২০২৩ সালে গ্র্যামি প্রথমবারের মতো ‘বেস্ট আফ্রিকান মিউজিক পারফরম্যান্স’ বিভাগ চালু করেছিল। তখনও প্রশ্ন উঠেছিল—আফ্রিকার সংগীতকে একটি নির্দিষ্ট পুরস্কার বিভাগে আলাদা করার অর্থ কি বৈচিত্র্যকে সামনে আনা, নাকি বিশাল একটি মহাদেশের সংগীতকে একটি সরল ধারণায় সীমাবদ্ধ করা?
আফ্রিকার সংস্কৃতি নিয়ে লেখালেখি করা জোয়ি আকানের সমালোচনাতেও একই দ্বিধা উঠে এসেছিল। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের একটি পুরস্কার অনুষ্ঠান যখন বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন অঞ্চলের সংগীতকে নিজেদের কাঠামোর মধ্যে আনে, তখন সেই কাঠামোর ক্ষমতাও অক্ষুণ্ন থাকে। ফলে কোনো মহাদেশের জন্য আলাদা বিভাগ তৈরি করা হলে সেটি যেন সেই মহাদেশের সংগীতকে আরও একটি সরলীকৃত পরিচয়ের মধ্যে আটকে না ফেলে।
এশিয়ান পপের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য।
‘এশিয়ান পপ’ কোনো নির্দিষ্ট সংগীতধারা নয়। এটি মূলত একটি ভৌগোলিক পরিচয়। অথচ পুরস্কার সাধারণত শিল্পের ধরন, সৃষ্টিশীলতা, পরিবেশনা ও সংগীতের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মূল্যায়নের দাবি করে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
বিটিএসের উত্থানই তার প্রমাণ
বিটিএসের অবস্থান বুঝতে হলে তাদের দীর্ঘ পথচলার দিকে তাকাতে হবে।
২০১৩ সালে যখন দলটি আত্মপ্রকাশ করে, তখন গ্র্যামির মতো প্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মনোনয়ন প্রত্যাখ্যান করার কথা ভাবাও প্রায় অসম্ভব ছিল। দক্ষিণ কোরিয়াতেই তখন তাদের টিকে থাকার লড়াই চলছিল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের গ্রহণযোগ্যতা তো অনেক দূরের বিষয়।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে ধারাবাহিক জনপ্রিয়তা অর্জনের পর ২০১৯ সালে গ্র্যামির লালগালিচায় প্রথমবার হাজির হয় বিটিএস। দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো শিল্পীর জন্য এটি ছিল ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তখন দলটির সদস্যরা সেই অভিজ্ঞতাকে স্বপ্ন পূরণের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
এরপর গল্পটি দ্রুত বদলে যায়।
বিটিএস বিলবোর্ড হট ১০০-এর শীর্ষে ওঠা প্রথম কোরীয় শিল্পী হয়। তারা গ্র্যামিতে মনোনয়ন পাওয়া প্রথম কে-পপ গ্রুপ। যদিও এখনো গ্র্যামি জিততে পারেনি, তাদের বিশ্বব্যাপী প্রভাব আর পুরস্কারের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়। ‘আরিরাং’ ওয়ার্ল্ড ট্যুরও কে-পপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবু বিটিএস তাদের কোরীয় পরিচয় অস্বীকার করেনি। বরং সেই পরিচয়কে সঙ্গে নিয়েই তারা বিশ্বসংগীতের নানা সীমা অতিক্রম করেছে।
এখানেই ‘কে-পপ’ এবং ‘কোরীয়’ পরিচয়ের প্রশ্নটি জটিল হয়ে ওঠে।
একজন শিল্পী নিজের সংস্কৃতি থেকে উঠে আসতে পারেন, কিন্তু তার সংগীতের পরিসর সেই সংস্কৃতির ভৌগোলিক সীমানায় থেমে থাকবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। পরিচয় মানুষের সৃষ্টিশীলতার ভিত্তি হতে পারে; সেটি তার সীমা হওয়ার প্রয়োজন নেই।

গ্র্যামিকেও বদলাতে হবে
গ্র্যামির ইতিহাসে এই সমস্যা নতুন নয়। ১৯৫৯ সালে প্রথম অনুষ্ঠান হয়েছিল মাত্র ২৮টি পুরস্কার বিভাগ নিয়ে। আসন্ন ৬৯তম অনুষ্ঠানে বিভাগের সংখ্যা ১০০-তে পৌঁছাবে। সংগীতের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকেও বারবার নতুন বিভাগ তৈরি করতে হয়েছে।
রক অ্যান্ড রোলের বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৯৫০-এর দশকে। কিন্তু সেই ধারার জন্য স্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ তৈরি করতে গ্র্যামির ১৯৮০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। অর্থাৎ সংগীতের পরিবর্তন সবসময়ই পুরস্কারের কাঠামোর চেয়ে দ্রুত হয়েছে।
আজকের পৃথিবীতে সেই ব্যবধান আরও বেড়েছে।
শিল্পীরা একাধিক ভাষায় গান করছেন, বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করছেন, পুরোনো ও নতুন ঘরানা একসঙ্গে ব্যবহার করছেন। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংগীতকে এমন এক বৈশ্বিক পরিবেশে নিয়ে গেছে, যেখানে একজন শিল্পীর পরিচয় আর একটি দেশ, ভাষা কিংবা ঘরানায় সহজে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
এই বাস্তবতায় পুরস্কারের কাঠামো যদি অতীতের শ্রেণিবিন্যাস আঁকড়ে থাকে, তাহলে তা সংগীতকে বোঝার বদলে সংগীতের ওপর নিজের সংজ্ঞা চাপিয়ে দিতে পারে।
বিটিএসের সিদ্ধান্ত তাই গ্র্যামির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
বিটিএস প্রথম শিল্পী নয় যারা গ্র্যামির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটবে। তবে তাদের মতো বৈশ্বিক প্রভাবসম্পন্ন শিল্পীর পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে কারণ তারা এখন আর প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির ওপর নিজেদের অস্তিত্ব নির্ভরশীল মনে করে না।
এই জায়গাটিই গ্র্যামির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
প্রশ্ন এখন বিটিএসকে নিয়ে নয়, গ্র্যামিকে নিয়েই—বিশ্বসংগীত যত বেশি সীমাহীন হয়ে উঠছে, পুরস্কার প্রতিষ্ঠানগুলো কি নিজেদের পুরোনো সীমানা পুনর্বিবেচনা করবে?
যদি ‘এশিয়ান পপ’ সত্যিই বৈচিত্র্যকে উদযাপন করতে চায়, তাহলে তার পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত সেই বৈচিত্র্যের ভেতরের পার্থক্যগুলোকে বোঝা। কারণ একটি মহাদেশের পরিচয় কোনো একক সংগীতধারা নয়। আর বিটিএসের মতো শিল্পীদের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই—তারা কোরিয়া থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছেছে, কিন্তু নিজেদের কেবল একটি ভৌগোলিক লেবেলে সীমাবদ্ধ রাখেনি।
গ্র্যামির সামনে এখন সেই একই চ্যালেঞ্জ: শিল্পীদের শ্রেণিবদ্ধ করা, নাকি তাদের বিকাশমান সংগীতকে অনুসরণ করা?
শেষ পর্যন্ত সংগীতের শক্তি তার সীমা ভাঙার মধ্যেই। পুরস্কারের কাঠামোরও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সময় এসেছে।
হায়েরুন কাং 


















