ইরান যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক শক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সংঘাতের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি। কয়েক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা ইরানের সামরিক সক্ষমতায় আঘাত করলেও যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির পথ তৈরি করতে পারেনি। বরং প্রতিটি নতুন হামলার হুমকি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চিত করেছে।
এই বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালি এখন শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নয়; এটি হয়ে উঠেছে যুদ্ধের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান উপাদান।
হুমকি, হামলা ও আকস্মিক বিরতি
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানে একটি পুনরাবৃত্ত ধারা স্পষ্ট হয়েছে। ওয়াশিংটন যখন ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলার হুমকি দেয়, তখন উপসাগরীয় মিত্ররা দ্রুত সংঘাত নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়। কারণ তারা জানে, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হলে তার প্রতিক্রিয়া শুধু ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
সাম্প্রতিক উত্তেজনাও শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি ও লবণাক্ত পানি পরিশোধন অবকাঠামোও পাল্টা হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
এতে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের ক্ষমতা থাকলেও সংঘাতের পরিণতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমাহীন নয়।
সামরিক চাপের সীমা
ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েও যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো সিদ্ধান্তমূলক ফল অর্জন করতে পারেনি, যা তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে। স্থল অভিযানও বাস্তবসম্মত বিকল্প নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত নিয়ে চাপ, যা যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের জন্যও প্রস্তুতি রাখতে হচ্ছে।
ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, সামরিক সমাধানের কার্যকারিতা ততই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
অন্যদিকে ইরানও সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সক্রিয়তার মাধ্যমে যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌপথে পৌঁছে গেছে।
হুথিদের হামলা সৌদি আরবের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তৈরি করেছে। হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব যে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে চেয়েছিল, লোহিত সাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে সেই পরিকল্পনাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে তেল পৌঁছাতে জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
এর অর্থ হলো, যুদ্ধের মূল্য শুধু সামরিক ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারও ক্রমে এর প্রভাব অনুভব করছে।
হরমুজের নিয়ন্ত্রণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
এই পুরো সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে এর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব উপসাগরীয় অর্থনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছাবে।
ইরান অর্থনৈতিকভাবে বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। মার্কিন নৌ অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। তারপরও তেহরান স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিয়ে এমন কোনো সাময়িক সমঝোতায় যেতে চাইছে না, যা ভবিষ্যতে একই ধরনের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা রেখে দেয়। ইরানের দৃষ্টিতে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি হরমুজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের স্বার্থের সংঘাত সবচেয়ে তীব্র।
উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত দ্রুত সমুদ্রপথ খুলে দিতে চায়। তারা ইরানের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে আগ্রহী নয়, আবার হরমুজ বন্ধ থাকুক—এটিও তাদের অর্থনীতির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে তাদের সামনে বাস্তবিকভাবে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, কীভাবে একটি কার্যকর ও নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করা যায়।
কূটনীতির জন্য আইনি পথ
এই অচলাবস্থা ভাঙতে ওমান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠতে পারে। হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে একটি সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হলেও ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় ট্রানজিট ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; মার্কিন নৌ অবরোধ বহাল থাকলে সমুদ্রপথের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
এখানে আন্তর্জাতিক আইনের একটি কাঠামোও কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশনের ৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদ আন্তর্জাতিক প্রণালির নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় ভাগাভাগির জন্য স্বেচ্ছাভিত্তিক ও পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ রাখে। ফলে হরমুজের নিরাপত্তা নিয়ে একটি যৌথ ব্যবস্থার প্রশ্নকে কেবল রাজনৈতিক ছাড় হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বার্থে একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতা হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
এটি ওয়াশিংটনের জন্যও একটি কূটনৈতিক বেরিয়ে আসার পথ হতে পারে।
যুদ্ধের বদলে সমঝোতার জানালা
হরমুজ প্রশ্নের সমাধান ছাড়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সম্ভবত একই চক্রে ঘুরতে থাকবে—সামরিক হামলার হুমকি, পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা, আঞ্চলিক মধ্যস্থতা এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতি। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য।
কারণ হরমুজের অনিশ্চয়তা শুধু তেলের দাম বাড়ানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্য, সমুদ্র পরিবহন, বীমা ব্যয় এবং এশিয়ার প্রধান জ্বালানি আমদানিকারকদের সরবরাহ নিরাপত্তা।
তাই ইরান যুদ্ধের সমাপ্তির প্রশ্নটি এখন আর শুধু তেহরান ও ওয়াশিংটনের সামরিক সক্ষমতার হিসাব নয়। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এমন একটি সমঝোতা, যা ইরানের নিরাপত্তা ও সার্বভৌম স্বার্থের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে পারে।
হরমুজ নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান তৈরি করা গেলে সেখান থেকেই বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনার দরজা খুলতে পারে—পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও।
অন্যথায় সাময়িক বিরতিগুলো যুদ্ধের অবসান ঘটাবে না; শুধু পরবর্তী বিস্ফোরণের আগে কিছুটা সময় কিনে দেবে।
লেখক: র. স্বামীনাথন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-তে ভারতের সাবেক গভর্নর, ভিয়েনায় সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং আরব লীগের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি।
র. স্বামীনাথন 


















