০২:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
চীনের হামলার আশঙ্কা, রানওয়ে ধ্বংস হলেও যুদ্ধবিমান ওড়ানোর প্রস্তুতি তাইওয়ানের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হারালে ডলার হারাতে পারে বৈশ্বিক মুদ্রার মর্যাদা: জেপি মরগানের প্রধান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কলম-কাগজে ফিরছে জেন জি, অফিসে জনপ্রিয় হচ্ছে খাতা-স্টিকি নোট গাজা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান নেতানিয়াহুর, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নয় হরমুজ প্রণালীকে হাতিয়ার করে জুনের চুক্তিতে ফিরতে চাইছে ইরান বাফুফের বিদেশি কোচের বিস্ফোরক অভিযোগ: ‘ভয়ে আছি, স্ত্রী-সন্তানকে টাকা পাঠাতে পারছি না’ এসএসসি-সমমানে পরীক্ষার্থী কমেছে, ফেল বেড়েছে প্রায় ৯০ হাজার আসামে ভয়াবহ বন্যা: মৃতের সংখ্যা ১০০, পানিবন্দি প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার সিলেটে ১৪ মাস পর আবারও করোনা শনাক্ত, হাসপাতালে ৫৫ বছরের রোগী সৌদি আরবে সোফা কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত ১৬ বাংলাদেশি

হরমুজ প্রণালীকে হাতিয়ার করে জুনের চুক্তিতে ফিরতে চাইছে ইরান

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী পর্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন শুধু যুদ্ধবিরতি বা পরমাণু কর্মসূচি নয়; বরং কে কাকে বিশ্বাস করবে এবং কোন পক্ষ কখন তার সবচেয়ে কার্যকর চাপের হাতিয়ারটি ছেড়ে দেবে। সেই সমীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী।

ইরান এখনো প্রণালীটির ওপর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ছাড়তে চাইছে না। কারণ তেহরানের কাছে এটি কেবল একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নয়, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায়ের অন্যতম কার্যকর উপায়। ইরানের ধারণা, হরমুজ খুলে দিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো সাময়িক স্বস্তি পেয়ে বৃহত্তর সমঝোতার বিষয়টি আর এগিয়ে নেবেন না।

এ কারণেই তেহরানের বর্তমান অবস্থানকে কেবল নৌপথ বন্ধ রাখা বা অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে গভীর অবিশ্বাস এবং আগের চুক্তির অভিজ্ঞতা।

জুনের সমঝোতাই এখন মূল ভিত্তি

১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, তা বেশিদিন টেকেনি। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তিটির বিভিন্ন শর্ত কার্যত ভেঙে পড়ে এবং ট্রাম্প নিজেই সেটিকে শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা করেন।

Strait of Hormuz: What has happened since the US-Iran MoU on June 17?

তবে ইরানের বর্তমান দাবিগুলো লক্ষ করলে দেখা যায়, এর বড় অংশই সেই জুনের সমঝোতায় ছিল। তেহরান চাইছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ ও তেল-পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুক, ইরানের চারপাশ থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনুক, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়ুক এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিক। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা ও ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ করার দাবিও রয়েছে।

ক্ষতিপূরণের দাবি ছাড়া বাকি বিষয়গুলোর বেশির ভাগই জুনের ১৪ দফা সমঝোতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে তেহরান যে সম্পূর্ণ নতুন কোনো কাঠামো চাপিয়ে দিতে চাইছে, এমন নয়। বরং তারা আগের সমঝোতাকেই আবার আলোচনার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

এখানেই হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব।

প্রণালীটি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন

ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তেহরানের আশঙ্কা, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করে দিলে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রয়োজনীয় সুবিধা পেয়ে যাবে, অথচ ইরান প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক স্বস্তি পাওয়ার আগেই তার প্রধান চাপের হাতিয়ার হারাবে।

এই অবিশ্বাসের কারণেই ইরান চায় সুবিধার একটি অংশ আগে নিশ্চিত করতে। অর্থাৎ, হরমুজ পুরোপুরি স্বাভাবিক করার আগে ওয়াশিংটনকে এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যা তেহরানকে বিশ্বাস করার মতো কারণ দেবে যে জুনের সমঝোতার প্রতিশ্রুতিগুলো এবার বাস্তবায়িত হবে।

শপথের পর প্রথম কোন দেশ সফরে যাবেন ট্রাম্প?

আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষকদের ভাষায়, হরমুজ এখন ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর এক ধরনের স্থায়ী চাপ হিসেবে কাজ করছে। প্রণালীটি আংশিকভাবে বন্ধ থাকলে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ থাকে, তেলের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোও দ্রুত সমাধানের জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ দিতে পারে।

অর্থাৎ ইরান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থকে আলোচনার টেবিলে নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছে।

ট্রাম্পের অপেক্ষা, ইরানের হিসাব

ট্রাম্প অবশ্য মনে করছেন, সময় ইরানের পক্ষেই থাকবে না। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং নিষেধাজ্ঞার চাপ যত বাড়বে, তেহরান তত বেশি সমঝোতার দিকে আসতে বাধ্য হবে—এমনটাই তাঁর ধারণা।

কিন্তু ইরানের হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির নেতৃত্ব মনে করছে, শুধু অর্থনৈতিক চাপের কারণে দ্রুত আত্মসমর্পণ করলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি আদায় করা কঠিন হবে। তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন থাকলেও তারা শেষ বড় চাপের হাতিয়ারটি আগে ছেড়ে দিতে চাইছে না।

এখানে ইরানের ক্ষতিপূরণের দাবিটিও গুরুত্বপূর্ণ। এটি হয়তো বাস্তব আলোচনায় চূড়ান্ত শর্ত হিসেবে টিকে থাকবে না। বরং বড় পরিসরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের দর-কষাকষিতে এটি অতিরিক্ত দাবি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

কূটনীতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব

ইরানের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে দেশটির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি অংশ মনে করে, অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য কূটনীতিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করবে এবং জনগণের ওপর চাপ বাড়াবে।

Iran, Holding Firm to Hormuz, Pushes for Return to June MOU - The New York  Times

অন্যদিকে কট্টরপন্থী অংশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিকে এতটাই অবিশ্বাস করে যে তারা মনে করে, এখনই চাপের হাতিয়ার ছেড়ে দেওয়া বিপজ্জনক। তাদের আশঙ্কা, ইরান যদি হরমুজ খুলে দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি পরে আলোচনা থেকে সরে যায়, তাহলে তেহরানের হাতে আর কার্যকর চাপ প্রয়োগের উপায় থাকবে না।

এই দ্বন্দ্ব শুধু তেহরানেই নেই। ওয়াশিংটনেও ইরান প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে। প্রশাসনের কেউ কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে, আবার কেউ সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষপাতী। ট্রাম্প নিজেও পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থান বদলাতে পারেন—এমন ধারণা ইরানের সন্দেহকে আরও গভীর করেছে।

হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা

তবু আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুললে কীভাবে জাহাজ চলাচল করবে, সে বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা অনেকটাই এগিয়েছে। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে মানচিত্র নিয়েও কাজ চলছে।

কিন্তু এখানেই তেহরান একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। ওমানের সঙ্গে কারিগরি বা নৌ চলাচলসংক্রান্ত সমঝোতা হলেই হরমুজ খুলে যাবে—এমন নয়। ইরানের দৃষ্টিতে প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা নির্ভর করছে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া শর্ত পূরণের ওপর।

অর্থাৎ হরমুজের ভবিষ্যৎ এখন সরাসরি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার সঙ্গে যুক্ত।

পরমাণু ইস্যুও একই সুতোয় বাঁধা

এই সমীকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। ট্রাম্প প্রশাসন সংঘাতে জড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার প্রশ্নকে সামনে এনেছিল। কিন্তু নতুন কোনো পরমাণু চুক্তির আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই জুনের সমঝোতার কাঠামো পুনঃস্থাপন করতে হবে—ইরানের অবস্থান অনেকটাই এমন।

এতে বোঝা যায়, তেহরান আলাদা আলাদা বিষয়ে আলাদা চুক্তি করতে চাইছে না। বরং নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা, সামরিক উপস্থিতি, হরমুজ, আঞ্চলিক মিত্র এবং পরমাণু কর্মসূচিকে একটি বৃহত্তর সমঝোতার অংশ হিসেবে দেখছে।

এটি একই সঙ্গে ইরানের শক্তি ও দুর্বলতা।

Iran war: What is the Strait of Hormuz and why does it matter?

কারণ একদিকে এতগুলো বিষয়কে একই আলোচনায় এনে তেহরান নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে আলোচনার ক্ষেত্র যত বড় হবে, সমঝোতায় পৌঁছানোও তত কঠিন হবে।

আসল সংকট বিশ্বাসের

শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর প্রশ্নটি অর্থের চেয়ে বেশি বিশ্বাসের প্রশ্ন। ইরান জানতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি দেবে, তা কি সত্যিই বাস্তবায়িত হবে? আর ওয়াশিংটনের প্রশ্ন হলো, ইরান যদি অর্থনৈতিক সুবিধা পায়, তাহলে কি সে সত্যিই হরমুজ খুলবে এবং সংঘাতের অবসানে এগিয়ে যাবে?

এই পারস্পরিক সন্দেহই সবচেয়ে বড় বাধা।

জুনের সমঝোতা হয়তো ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু সেই কাঠামোয় ফিরতে হলে শুধু নতুন শর্ত নির্ধারণ করলেই হবে না; দুই পক্ষকেই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো পক্ষই মনে না করে যে অপর পক্ষ প্রথম সুযোগেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাবে।

ইরান আপাতত হরমুজকে সেই নিশ্চয়তা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ধরে রেখেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র চাইছে অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে।

এই দুই কৌশলের সংঘর্ষই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পর্যায়ের কূটনীতি। হরমুজ কবে খুলবে, সেটি তাই শুধু একটি নৌপথের প্রশ্ন নয়। এটি নির্ধারণ করবে জুনের ভেঙে পড়া সমঝোতা নতুন কোনো চুক্তির ভিত্তি হতে পারবে কি না, এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোবে, নাকি আবারও সামরিক উত্তেজনার চক্রে ফিরে যাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের হামলার আশঙ্কা, রানওয়ে ধ্বংস হলেও যুদ্ধবিমান ওড়ানোর প্রস্তুতি তাইওয়ানের

হরমুজ প্রণালীকে হাতিয়ার করে জুনের চুক্তিতে ফিরতে চাইছে ইরান

০১:০৩:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী পর্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন শুধু যুদ্ধবিরতি বা পরমাণু কর্মসূচি নয়; বরং কে কাকে বিশ্বাস করবে এবং কোন পক্ষ কখন তার সবচেয়ে কার্যকর চাপের হাতিয়ারটি ছেড়ে দেবে। সেই সমীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী।

ইরান এখনো প্রণালীটির ওপর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ছাড়তে চাইছে না। কারণ তেহরানের কাছে এটি কেবল একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নয়, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায়ের অন্যতম কার্যকর উপায়। ইরানের ধারণা, হরমুজ খুলে দিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো সাময়িক স্বস্তি পেয়ে বৃহত্তর সমঝোতার বিষয়টি আর এগিয়ে নেবেন না।

এ কারণেই তেহরানের বর্তমান অবস্থানকে কেবল নৌপথ বন্ধ রাখা বা অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে গভীর অবিশ্বাস এবং আগের চুক্তির অভিজ্ঞতা।

জুনের সমঝোতাই এখন মূল ভিত্তি

১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, তা বেশিদিন টেকেনি। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তিটির বিভিন্ন শর্ত কার্যত ভেঙে পড়ে এবং ট্রাম্প নিজেই সেটিকে শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা করেন।

Strait of Hormuz: What has happened since the US-Iran MoU on June 17?

তবে ইরানের বর্তমান দাবিগুলো লক্ষ করলে দেখা যায়, এর বড় অংশই সেই জুনের সমঝোতায় ছিল। তেহরান চাইছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ ও তেল-পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুক, ইরানের চারপাশ থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনুক, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়ুক এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিক। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা ও ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ করার দাবিও রয়েছে।

ক্ষতিপূরণের দাবি ছাড়া বাকি বিষয়গুলোর বেশির ভাগই জুনের ১৪ দফা সমঝোতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে তেহরান যে সম্পূর্ণ নতুন কোনো কাঠামো চাপিয়ে দিতে চাইছে, এমন নয়। বরং তারা আগের সমঝোতাকেই আবার আলোচনার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

এখানেই হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব।

প্রণালীটি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন

ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তেহরানের আশঙ্কা, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করে দিলে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রয়োজনীয় সুবিধা পেয়ে যাবে, অথচ ইরান প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক স্বস্তি পাওয়ার আগেই তার প্রধান চাপের হাতিয়ার হারাবে।

এই অবিশ্বাসের কারণেই ইরান চায় সুবিধার একটি অংশ আগে নিশ্চিত করতে। অর্থাৎ, হরমুজ পুরোপুরি স্বাভাবিক করার আগে ওয়াশিংটনকে এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যা তেহরানকে বিশ্বাস করার মতো কারণ দেবে যে জুনের সমঝোতার প্রতিশ্রুতিগুলো এবার বাস্তবায়িত হবে।

শপথের পর প্রথম কোন দেশ সফরে যাবেন ট্রাম্প?

আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষকদের ভাষায়, হরমুজ এখন ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর এক ধরনের স্থায়ী চাপ হিসেবে কাজ করছে। প্রণালীটি আংশিকভাবে বন্ধ থাকলে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ থাকে, তেলের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোও দ্রুত সমাধানের জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ দিতে পারে।

অর্থাৎ ইরান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থকে আলোচনার টেবিলে নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছে।

ট্রাম্পের অপেক্ষা, ইরানের হিসাব

ট্রাম্প অবশ্য মনে করছেন, সময় ইরানের পক্ষেই থাকবে না। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং নিষেধাজ্ঞার চাপ যত বাড়বে, তেহরান তত বেশি সমঝোতার দিকে আসতে বাধ্য হবে—এমনটাই তাঁর ধারণা।

কিন্তু ইরানের হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির নেতৃত্ব মনে করছে, শুধু অর্থনৈতিক চাপের কারণে দ্রুত আত্মসমর্পণ করলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি আদায় করা কঠিন হবে। তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন থাকলেও তারা শেষ বড় চাপের হাতিয়ারটি আগে ছেড়ে দিতে চাইছে না।

এখানে ইরানের ক্ষতিপূরণের দাবিটিও গুরুত্বপূর্ণ। এটি হয়তো বাস্তব আলোচনায় চূড়ান্ত শর্ত হিসেবে টিকে থাকবে না। বরং বড় পরিসরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের দর-কষাকষিতে এটি অতিরিক্ত দাবি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

কূটনীতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব

ইরানের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে দেশটির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি অংশ মনে করে, অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য কূটনীতিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করবে এবং জনগণের ওপর চাপ বাড়াবে।

Iran, Holding Firm to Hormuz, Pushes for Return to June MOU - The New York  Times

অন্যদিকে কট্টরপন্থী অংশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিকে এতটাই অবিশ্বাস করে যে তারা মনে করে, এখনই চাপের হাতিয়ার ছেড়ে দেওয়া বিপজ্জনক। তাদের আশঙ্কা, ইরান যদি হরমুজ খুলে দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি পরে আলোচনা থেকে সরে যায়, তাহলে তেহরানের হাতে আর কার্যকর চাপ প্রয়োগের উপায় থাকবে না।

এই দ্বন্দ্ব শুধু তেহরানেই নেই। ওয়াশিংটনেও ইরান প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে। প্রশাসনের কেউ কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে, আবার কেউ সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষপাতী। ট্রাম্প নিজেও পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থান বদলাতে পারেন—এমন ধারণা ইরানের সন্দেহকে আরও গভীর করেছে।

হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা

তবু আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুললে কীভাবে জাহাজ চলাচল করবে, সে বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা অনেকটাই এগিয়েছে। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে মানচিত্র নিয়েও কাজ চলছে।

কিন্তু এখানেই তেহরান একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। ওমানের সঙ্গে কারিগরি বা নৌ চলাচলসংক্রান্ত সমঝোতা হলেই হরমুজ খুলে যাবে—এমন নয়। ইরানের দৃষ্টিতে প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা নির্ভর করছে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া শর্ত পূরণের ওপর।

অর্থাৎ হরমুজের ভবিষ্যৎ এখন সরাসরি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার সঙ্গে যুক্ত।

পরমাণু ইস্যুও একই সুতোয় বাঁধা

এই সমীকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। ট্রাম্প প্রশাসন সংঘাতে জড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার প্রশ্নকে সামনে এনেছিল। কিন্তু নতুন কোনো পরমাণু চুক্তির আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই জুনের সমঝোতার কাঠামো পুনঃস্থাপন করতে হবে—ইরানের অবস্থান অনেকটাই এমন।

এতে বোঝা যায়, তেহরান আলাদা আলাদা বিষয়ে আলাদা চুক্তি করতে চাইছে না। বরং নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা, সামরিক উপস্থিতি, হরমুজ, আঞ্চলিক মিত্র এবং পরমাণু কর্মসূচিকে একটি বৃহত্তর সমঝোতার অংশ হিসেবে দেখছে।

এটি একই সঙ্গে ইরানের শক্তি ও দুর্বলতা।

Iran war: What is the Strait of Hormuz and why does it matter?

কারণ একদিকে এতগুলো বিষয়কে একই আলোচনায় এনে তেহরান নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে আলোচনার ক্ষেত্র যত বড় হবে, সমঝোতায় পৌঁছানোও তত কঠিন হবে।

আসল সংকট বিশ্বাসের

শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর প্রশ্নটি অর্থের চেয়ে বেশি বিশ্বাসের প্রশ্ন। ইরান জানতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি দেবে, তা কি সত্যিই বাস্তবায়িত হবে? আর ওয়াশিংটনের প্রশ্ন হলো, ইরান যদি অর্থনৈতিক সুবিধা পায়, তাহলে কি সে সত্যিই হরমুজ খুলবে এবং সংঘাতের অবসানে এগিয়ে যাবে?

এই পারস্পরিক সন্দেহই সবচেয়ে বড় বাধা।

জুনের সমঝোতা হয়তো ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু সেই কাঠামোয় ফিরতে হলে শুধু নতুন শর্ত নির্ধারণ করলেই হবে না; দুই পক্ষকেই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো পক্ষই মনে না করে যে অপর পক্ষ প্রথম সুযোগেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাবে।

ইরান আপাতত হরমুজকে সেই নিশ্চয়তা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ধরে রেখেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র চাইছে অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে।

এই দুই কৌশলের সংঘর্ষই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পর্যায়ের কূটনীতি। হরমুজ কবে খুলবে, সেটি তাই শুধু একটি নৌপথের প্রশ্ন নয়। এটি নির্ধারণ করবে জুনের ভেঙে পড়া সমঝোতা নতুন কোনো চুক্তির ভিত্তি হতে পারবে কি না, এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোবে, নাকি আবারও সামরিক উত্তেজনার চক্রে ফিরে যাবে।