কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার মুহূর্তটি আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের স্মৃতিগুলোর একটি। মঞ্চে ওঠার সময় আমার গায়ে ছিল আফগানিস্তানের পতাকা সেলাই করা একটি স্টোল। চার বছর আগেও যে জীবনের কথা কল্পনা করা কঠিন ছিল, সেই জীবনই তখন আমার সামনে বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেও একটি প্রশ্ন আমাকে তাড়া করছিল—আমি যখন এই স্বাধীনতা উদযাপন করছি, তখন আমার সেই বন্ধুদের কী অবস্থা, যারা আফগানিস্তান থেকে বের হতে পারেনি?
এই দ্বৈত অনুভূতিই এখন আমার জীবনের বাস্তবতা। আমেরিকায় আমি শিক্ষা, কাজ, চলাফেরা ও নিজের পছন্দমতো জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েছি। অথচ আমার দেশের অসংখ্য নারী ও কিশোরী এমন এক বাস্তবতায় আটকে আছে, যেখানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এমনকি প্রকাশ্যে স্বাভাবিকভাবে উপস্থিত থাকার অধিকারও ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
কাবুল পতনের পাঁচ বছর
পাঁচ বছর আগে এই সপ্তাহে কাবুলের পতনের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশকের সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতির সমাপ্তি ঘটে। আমেরিকার জন্য সেটি ছিল দীর্ঘ এক যুদ্ধের সমাপ্তি। কিন্তু আফগান নারীদের জন্য তা ছিল অন্য এক অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা।

২০০১ সালে তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর আফগান নারীদের জন্য যে সুযোগগুলো তৈরি হয়েছিল, তার সুফল আমি নিজেও পেয়েছি। তালেবান শাসনের প্রথম দফায় মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু পরবর্তী দুই দশকে আমি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে পেরেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি এবং ২০২০ সালে আফগানিস্তানে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেছি।
আমার স্বপ্ন ছিল নারী অধিকার নিয়ে কাজ করার। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল। আফগানিস্তানে নারী আইনজীবীর সংখ্যা তখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ছিল। আমি ভেবেছিলাম, নিজের পেশার মাধ্যমে সেই শূন্যতার কিছুটা পূরণ করতে পারব।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই ভবিষ্যৎকে থামিয়ে দিল।
স্বাধীনতার মূল্য বোঝা যায় বন্দিত্বের পাশে দাঁড়ালে
আজ আমেরিকায় আমি যে জীবন যাপন করি, তার অনেক কিছুই আফগানিস্তানে আমার কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হতো। এখানে আমি সাইকেল চালাতে পারি, দৌড়াতে পারি, বরফে স্কেটিং করতে পারি, কায়াকিং করতে পারি, শরীরচর্চা করতে পারি। এমনকি সাঁতার শেখার সুযোগও পেয়েছি।
এসবের কোনোটিই আমার কাছে এখন শুধু ব্যক্তিগত আনন্দ নয়। প্রতিটি স্বাধীনতা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আফগানিস্তানে আমার বয়সী নারীদের জীবন কতটা বদলে গেছে।
জুলাইয়ে ৩০তম জন্মদিনে আমি একটি ফোলানো যায় এমন প্যাডল বোর্ড কিনেছিলাম। পটোম্যাক নদীতে সেটি নিয়ে চলার সময় নিজেকে স্বাধীন ও শক্তিশালী মনে হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ল আফগানিস্তানে থাকা এক কিশোরীর কথা।
সে আমাদের পরিবারের পরিচিত। অত্যন্ত মেধাবী, বই পড়তে ভালোবাসে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। আমার মায়ের দেওয়া বই সে আগ্রহ নিয়ে পড়ত। কিন্তু সম্প্রতি জানতে পেরেছি, মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তাকে নিজের চেয়ে অনেক বেশি বয়সী এক পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ। ঘনিষ্ঠ কোনো পুরুষ আত্মীয় ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সুযোগও নেই।
আমার নিজের জীবন আর তার জীবনের এই বৈপরীত্যই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়।
যুদ্ধের পর যে দরজা খুলেছিল, তা আবার বন্ধ
আফগানিস্তানে মার্কিন হস্তক্ষেপের সমর্থন বা সমালোচনা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। দুই দশকের যুদ্ধের ফলাফল নিয়েও কঠিন প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—এই সময়ের মধ্যে আফগান মেয়েদের একটি প্রজন্ম এমন সুযোগ পেয়েছিল, যা তাদের মায়েদের প্রজন্ম পায়নি।
আমিও সেই প্রজন্মের একজন।
কিন্তু মার্কিন প্রত্যাহারের পর তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই অগ্রগতির বড় অংশ উল্টে যেতে শুরু করে। মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর শিক্ষা বন্ধ করা হয়েছে। নারীদের পোশাক, চলাফেরা ও প্রকাশ্য উপস্থিতির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নারীদের কাজের সুযোগও ব্যাপকভাবে সীমিত হয়েছে।
নারীদের কণ্ঠস্বর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসেছে। আর বছরের শুরুতে তালেবানের নতুন ফৌজদারি বিধি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তারা উদ্বেগ জানিয়েছেন, কারণ এতে নারী ও শিশুদের ওপর ঘরের ভেতর সহিংসতার বৈধতা পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এটি শুধু নারীদের অধিকার হরণের প্রশ্ন নয়। এটি একটি সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া।
আমার বেরিয়ে আসা ছিল সৌভাগ্য
২০২১ সালের আগস্টে কাবুল পতনের দিনটি আমি কখনো ভুলতে পারব না।
আমার ভাই নাজিম রহিম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছিলেন। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম বা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা অনেক আফগানের মতো তিনিও ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। কাবুল ব্যুরোর কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের অংশ হিসেবে আমাদের পরিবারও বের হওয়ার সুযোগ পায়।
সেদিন আমরা বাড়িতে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম। চারদিকে অনিশ্চয়তা। তালেবান ক্ষমতায় এলে কী হবে, তা নিয়ে আমরা কথা বলছিলাম। ঠিক তখনই ভাই ফোন করে জানালেন—আমাদের চলে যেতে হবে।
সময় ছিল মাত্র ৩০ মিনিট।

প্রত্যেকের জন্য একটি ছোট ব্যাগে যতটা সম্ভব জীবন গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিলাম না, একটি ব্যাগে কীভাবে একটি পুরো জীবন ভরে নেওয়া যায়। কিছু পোশাক, আমার শিক্ষার সনদ আর কয়েকটি মাথার স্কার্ফ নিয়েছিলাম।
বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখেছিলাম হাজারো মানুষ একইভাবে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ অপেক্ষা, আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা—সবকিছু মিলিয়ে সেটি ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো। উড়ন্ত বিমানের গায়ে ঝুলে থাকা মানুষদের পড়ে যেতে দেখার দৃশ্য এখনো মনে আছে।
আমাদের দলও হামলার মুখে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত দুই দিন ধরে অনিশ্চয়তা ও ভয় পেরিয়ে একটি সামরিক পরিবহনে উঠতে সক্ষম হই। বিমানের ঠান্ডা ধাতব মেঝেতে বসে যখন আফগানিস্তান ছাড়ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমরা শুধু একটি দেশ নয়, নিজেদের পরিচিত পুরো জীবনটাকেই পেছনে ফেলে যাচ্ছি।
এরপর আমেরিকা আমাদের জন্য নতুন দরজা খুলে দেয়।
কিন্তু যারা রয়ে গেছে?
আমার আইন স্কুলের প্রায় ৩৫ জন তরুণী সহপাঠীর অধিকাংশই এখনো আফগানিস্তানে। তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বললে একই ধরনের হতাশার গল্প শুনি। অনেকেই এখন স্ত্রী ও মা হিসেবে ঘরের ভেতর সীমাবদ্ধ। আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন তাদের কাছে আর বাস্তবসম্ভব নয়।
কখনো কখনো আমরা নিজেদের মধ্যে একটি প্রশ্ন করি—“যদি আমিও সেখানে থেকে যেতাম?”
এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই।
আমি আমার সহপাঠীদের চেয়ে বেশি মেধাবী ছিলাম না। তাদের চেয়ে বেশি পরিশ্রমীও হয়তো নই। আমার ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি করেছে সুযোগ এবং ভাগ্য। আমি এমন একটি পরিবারে ছিলাম, যার একজন সদস্য পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করতেন এবং সেই কারণে আমরা উদ্ধার হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।
এই উপলব্ধিই আমার অপরাধবোধের মূল।

আমেরিকা কি দায়মুক্ত হতে পারে?
আমি আমেরিকার মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ। এখানে এসে আমি নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পেয়েছি। শিক্ষা শেষ করেছি, কাজ পেয়েছি এবং এমন স্বাধীনতা পেয়েছি যা আজ আফগানিস্তানের বহু নারী কল্পনাও করতে পারেন না।
কিন্তু কৃতজ্ঞতা আর নৈতিক প্রশ্ন এক জিনিস নয়।
আফগানিস্তান এখন আর কয়েক বছর আগের মতো আমেরিকার রাজনৈতিক মনোযোগের কেন্দ্রে নেই। যুক্তরাষ্ট্র কাবুলে দূতাবাস বন্ধ করেছে, কূটনৈতিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করেছে, সহায়তা কমিয়েছে এবং আফগানদের জন্য আমেরিকায় আশ্রয় পাওয়ার পথও কঠিন করেছে।
বাস্তবতা হলো, বিশ্বের মনোযোগ এখন অন্য সংকটে ব্যস্ত। নতুন যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যার মধ্যে আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় অনেক নিচে নেমে গেছে।
কিন্তু কোনো দেশের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব শুধু তখনই থাকে না, যখন সেটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় থাকে।
বিশেষ করে সেই নারীদের কথা বিবেচনা করলে, যাদের জীবনে আমেরিকার দুই দশকের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ পরিবর্তন এনেছিল।
সহজ সমাধান নেই, কিন্তু নীরবতাও সমাধান নয়
আফগান নারীদের জন্য আমেরিকার কী করা উচিত—এর কোনো সহজ উত্তর আমার কাছে নেই। আবার এমন কোনো একক নীতিও নেই, যা রাতারাতি তাদের জীবন বদলে দিতে পারে।
কিন্তু কঠিন সমাধান না থাকার অর্থ এই নয় যে সমস্যাটিকে উপেক্ষা করতে হবে।
শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, নারী অধিকারকর্মীদের সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ এবং আফগান নারীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বজায় রাখা—এসবের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আরও সক্রিয় ভূমিকার সুযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আফগান নারীদের অদৃশ্য হয়ে যাওয়াকে যেন পৃথিবী স্বাভাবিক বলে মেনে না নেয়।
তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো শুধু কিছু প্রশাসনিক বিধি নয়। এগুলো একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। একটি মেয়েকে স্কুল থেকে সরিয়ে দেওয়া মানে শুধু আজকের শিক্ষা বন্ধ করা নয়; তার পেশা, আয়, আত্মনির্ভরতা এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনাও সংকুচিত করা।
আমি ভাগ্যবান যে আমার জীবন অন্য পথে এগিয়েছে। কিন্তু সেই সৌভাগ্য আমাকে আমার দেশের নারীদের ভুলে যাওয়ার অধিকার দেয় না।
বরং আমেরিকায় পাওয়া স্বাধীনতার প্রতি সবচেয়ে সৎ কৃতজ্ঞতা হতে পারে—যারা সেই স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত, তাদের কথা বলা।
কাবুল থেকে দূরত্ব বেড়েছে। রাজনৈতিক মনোযোগ সরে গেছে। কিন্তু আফগান নারীদের ওপর যে অন্যায় চলছে, তার বাস্তবতা বদলায়নি।
আমেরিকা হয়তো আফগানিস্তানের অতীত বদলাতে পারবে না। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা এখনো লড়ছে, তাদের একা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে অন্তত বিরত থাকতে পারে।
কারণ একটি সমাজের নারীদের মুছে ফেলার চেষ্টা শুধু সেই সমাজের সমস্যা নয়। পৃথিবী যখন তা দেখে নীরব থাকে, তখন সেই নীরবতাও এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান হয়ে ওঠে।
মুরসাল রহিম 



















