বাংলাদেশ ও ভারত শুধু একটি সীমান্ত ভাগ করে না, দুই দেশের জনগণের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথম বৈঠকের পর এমন বার্তাই দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। সোমবারের বৈঠককে ফলপ্রসূ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং একটি ইতিবাচক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
ত্রিবেদীর বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক দিল্লির বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বৈঠক ও কূটনৈতিক যোগাযোগে দুই দেশ আবারও সম্পর্ককে গঠনমূলক পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের বার্তা
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে ত্রিবেদী বলেন, তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে একজন কূটনীতিক হিসেবে নয়, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলেছেন। প্রথম সাক্ষাৎ হলেও বৈঠকটি তাঁর কাছে স্বাভাবিক ও আন্তরিক মনে হয়েছে। তারেক রহমানকে তিনি ‘জনগণের মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভারতীয় হাইকমিশনারের মতে, দুই দেশের নেতারা মুখোমুখি বসলে অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এমন কোনো বিষয় নেই, যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না বলেও তিনি আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন।
এর আগে রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ত্রিবেদী। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গেও আলোচনা করেন। গত ২৫ জুন রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ করার পর সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে তাঁর ধারাবাহিক যোগাযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে সক্রিয় করার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা
ঢাকা স্পষ্ট করেছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অক্ষুণ্ন থাকবে। একই সঙ্গে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক আস্থা, বোঝাপড়া ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে একটি ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।
দুই দেশের মধ্যে পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও কনস্যুলার বিষয়সহ ৪০টির বেশি দ্বিপক্ষীয় কাঠামো রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়ে ভারত আগ্রহ দেখিয়েছে। এসব কাঠামো কার্যকর হলে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে নিয়মিত আলোচনার সুযোগ বাড়তে পারে।

পানি, সীমান্ত ও জ্বালানিতে গুরুত্ব
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু সাম্প্রতিক কোনো একটি ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। পানি, জ্বালানি ও সীমান্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এসব ইস্যু সমাধানে নিয়মিত সংলাপকেই গুরুত্ব দিতে চায় ঢাকা।
জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ছে। ৬ আগস্ট ত্রিবেদী বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংযোগ জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
জ্বালানি মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল আমদানি করে এবং আরও বেশি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। দুই পক্ষ জ্বালানি নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন এবং পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে।
ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ
ঢাকা-নয়াদিল্লির নতুন যোগাযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্রিকস সম্মেলন। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এই তাঁকে ভারত সফরের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনের আমন্ত্রণটি বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, ঢাকা আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করছে এবং সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ
কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ককেও গুরুত্ব দিচ্ছে ভারতীয় হাইকমিশন। ঢাকার ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় এক মা শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গার অনুরোধ করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয় এবং ওই মা তাঁর সন্তানকে নিয়ে জায়গাটি উদ্বোধন করেন।
হাইকমিশনের ভাষ্য, ছোট হলেও এ ধরনের উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—মানুষে মানুষে যোগাযোগকে সামনে নিয়ে আসে।
তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর ত্রিবেদীর বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগ থেকে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা ও নয়াদিল্লি সম্পর্ককে স্থবির রাখতে চাইছে না। পানি, সীমান্ত ও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে রেখেই সংলাপের পথ খোলা রাখার চেষ্টা চলছে। এখন এই যোগাযোগ কতটা কার্যকর সমাধানে রূপ নেয়, সেটিই হবে দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















