আধুনিক যুদ্ধ দ্রুত বা চূড়ান্তভাবে শেষ হওয়ার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। ইরান, গাজা, ইউক্রেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত ক্রমেই পরিণত হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতার পরীক্ষায়। এসব যুদ্ধের গতিপথ শুধু সামরিক সাফল্য-ব্যর্থতায় নির্ধারিত হচ্ছে না; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রাজনীতি, ভুল হিসাব, অর্থনীতি, জাতীয় মর্যাদা ও নেতাদের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা।—সারাক্ষণ রিপোর্ট
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অনিশ্চিত পরিণতি
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাসে গড়ালেও সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের বদলে পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত পাশাপাশি চলছে। এই পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, যুদ্ধের মধ্যে কূটনীতি অনেক সময় সংকটের সমাধান নয়, বরং সংকট নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতিতে পরিণত হয়।
রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় শান্তির চেয়ে শক্তির প্রদর্শনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হ্যান্স জে. মরগেনথাউ ১৯৪৮ সালে লিখেছিলেন, রাজনীতিতে ক্ষমতা অর্জনই তাৎক্ষণিক লক্ষ্য। আধুনিক সংঘাতের অনেক ক্ষেত্রেই সেই বাস্তবতা এখনো দৃশ্যমান।
ইতিহাসও দীর্ঘ যুদ্ধের বহু উদাহরণ দেয়। আইবেরীয় উপদ্বীপে খ্রিস্টান রাজ্য ও মুসলিম শক্তির সংঘর্ষ প্রায় আট শতাব্দী ধরে চলেছিল। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ১৩৩৭ থেকে ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত বারবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতির পর কোরীয় যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ না হওয়ায় কোরীয় উপদ্বীপ স্থায়ী সামরিক বিভাজনের মধ্যে রয়েছে। দুই বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও তাদের রেখে যাওয়া রাজনৈতিক, আদর্শিক ও জাতীয়তাবাদী উত্তেজনা পরবর্তী সংঘাতকে প্রভাবিত করেছে।
সংঘাতের সংখ্যা বাড়ছে
উপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের হিসাবে, গত বছর রাষ্ট্রভিত্তিক সংঘাতের সংখ্যা রেকর্ড ৬৫-তে পৌঁছেছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতও টানা দ্বিতীয় বছর দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি সংঘাতকে যুদ্ধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে এক বছরে অন্তত এক হাজার যুদ্ধসংক্রান্ত মৃত্যু ঘটেছে।
যুদ্ধ কেন শুরু হয়, তার উত্তরও যুদ্ধ কেন দীর্ঘায়িত হয় তা বোঝাতে সাহায্য করে। ইতিহাসবিদ রিচার্ড নেড লেবোর ১৬৪৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ ও সামরিক হস্তক্ষেপ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, রাষ্ট্রগুলো কেবল বস্তুগত লাভের জন্য যুদ্ধ করে না; মর্যাদা, নিরাপত্তা ও প্রতিশোধও বড় চালিকা শক্তি। নেতারাও সব সময় পুরোপুরি যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নেন না এবং অনেক সময় যে যুদ্ধ শুরু করেন, শেষ পর্যন্ত সেটিতেই পরাজিত হন।

প্রযুক্তি যুদ্ধকে করছে দীর্ঘস্থায়ী
আধুনিক যুদ্ধের বড় পরিবর্তন এসেছে প্রচলিত যুদ্ধের সীমার নিচে পরিচালিত নানা ধরনের হামলায়। নেভিগেশন ব্যবস্থা অচল করা, হত্যাকাণ্ড, ভাড়াটে যোদ্ধাদের ব্যবহার, ড্রোন হামলা কিংবা তথাকথিত ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত ও তার দৃঢ়তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ড্রোন, সাইবার হামলা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তি যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্যও কমিয়ে দিয়েছে। সেনা মোতায়েন বা বিপুল প্রাণহানি ছাড়াই সরকারগুলো নির্দিষ্ট মাত্রায় ক্ষতি করতে পারছে। ফলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তুলনামূলকভাবে সহজ হচ্ছে।
অর্থনীতিও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে
যুদ্ধ সাধারণত প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল হলেও বিপুল অর্থ ইতোমধ্যে ব্যয় হয়ে যাওয়ার পর আরও অর্থ ঢেলে বিজয় অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এটিই ‘সানক কস্ট’ বা ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া অর্থের ফাঁদ।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা কোম্পানি, জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগ ব্যাংক যুদ্ধ ও বাজারের অনিশ্চয়তা থেকে বড় মুনাফা করতে পারে। উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতির তুলনায় সামরিক ব্যয়ও শীতল যুদ্ধের শেষ সময়ের পর্যায়ে ফিরে গেছে বলে ওইসিডি জানিয়েছে। উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্র তৈরিতে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রণোদনাও বাড়াচ্ছে।
জয়ের সংজ্ঞা যখন অস্পষ্ট
আধুনিক যুদ্ধে সামরিক সাফল্য সব সময় রাজনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করে না। ফলে যুদ্ধের লক্ষ্য ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে, অথচ তা অর্জনের সম্ভাবনা কমে যায়। অনেক সংঘাত এখন সরাসরি বিজয়ের পরিবর্তে প্রতিরোধ, ক্ষয়, অবসাদ বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিকে এগোয়। এসব লক্ষ্য নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করার মতো নয়।
ফলে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী সমাধানের বদলে সাময়িক বিরতিতে পরিণত হয়। সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই—দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ একসময় সমাজের কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। প্রতিদিনের প্রাণহানি ও ধ্বংসের সঙ্গে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা যায়, সেই প্রশ্নের বদলে কীভাবে যুদ্ধের সঙ্গে বেঁচে থাকা যায়, সেটিই হয়ে ওঠে প্রধান বাস্তবতা। ইতিহাসকে বোঝা তাই এই প্রবণতা ঠেকানোর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জেমস ডেভিড স্পেলম্যান 



















