০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
‘মক্কা চুক্তি’: যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তার বাইরে নতুন মুসলিম শক্তির সমীকরণ ইসরায়েলে নির্বাচন সামনে, অথচ অকার্যকর রাষ্ট্রীয় তদারকি: গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক সংকেত পাচার করা অর্থ ফেরত আনা কি সম্ভব? মধ্যম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দৌড়েও অবিশ্বাস্য গতি, রেকর্ড ভাঙল একের পর এক স্বাধীন ভারতের প্রথম জাতিভিত্তিক জনগণনায় নেতৃত্ব দেবে লাদাখ বিহারের ধাক্কার পর উত্তরপ্রদেশে উচ্চবর্ণের ক্ষোভ কি চাপে ফেলবে বিজেপিকে? দিল্লির অভিজাতদের স্বপ্নের বাড়ি দেখিয়ে ২০০ কোটি টাকার প্রতারণা! সন্তানদের ভবিষ্যৎ বোঝার ক্ষমতা অভিভাবকদের চেয়েও এগিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে বদলে যাচ্ছে প্রেমের হিসাব, ‘রেড ফ্ল্যাগ’ও কি শ্রেণির পরিচয়? কৃষ্ণসাগরের বন্দর ঘিরে রাশিয়ার নতুন চাপ, শস্য রপ্তানি থমকে গেলে বিশ্বজুড়ে বাড়বে খাদ্যঝুঁকি

‘মক্কা চুক্তি’: যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তার বাইরে নতুন মুসলিম শক্তির সমীকরণ

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ৭ আগস্ট মক্কায় স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি এখনই নতুন কোনো ন্যাটো তৈরির ঘোষণা নয়, কিংবা তিন দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটও নয়। কিন্তু চুক্তিটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর আগের মতো নির্ভর করতে পারছে কি না, সেই প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে।

চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর রাজনৈতিক বার্তা। তিন দেশ ঘোষণা করেছে, তাদের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা অন্য সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এই ভাষা ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে ন্যাটোর মতো যৌথ কমান্ড, স্থায়ী সামরিক পরিকল্পনা কাঠামো কিংবা যুদ্ধের সময় কে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—এমন সুস্পষ্ট ব্যবস্থা এখনো নেই।

তাই ‘মক্কা চুক্তি’কে সামরিক জোট হিসেবে দেখার চেয়ে একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর পরীক্ষামূলক ভিত্তি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

সৌদির নিরাপত্তা হিসাব বদলাচ্ছে

সৌদি আরবের জন্য এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আরেকটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা সব পরিস্থিতিতে কার্যকর নাও হতে পারে। ইরান যদি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে টেনে আনার চেষ্টা অব্যাহত রাখে, তাহলে রিয়াদকে এমন একটি অতিরিক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই হবে, যার ওপর ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই।

এখানে সৌদির আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও গুরুত্বপূর্ণ—নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা।

সৌদি আরব ইতোমধ্যে তুরস্কের তৈরি বায়রাকতার ড্রোন কিনেছে এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের মাটিতে এসব ব্যবস্থা উৎপাদনের আগ্রহ দেখিয়েছে। মক্কা চুক্তি সেই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তুরস্কের প্রযুক্তি ও নকশা, পাকিস্তানের শিল্প ও উৎপাদন সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের বিপুল অর্থ—এই তিনটি উপাদান একত্র হলে ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এমন শিল্পকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি সরবরাহ বা রাজনৈতিক শর্তের ওপর আগের মতো নির্ভর করতে হবে না।

পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক লাভ

চুক্তিটি পাকিস্তানের জন্যও কেবল সামরিক সহযোগিতার বিষয় নয়। বর্তমান উপসাগরীয় সংঘাতে ইসলামাবাদ একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ধরে রাখতে চাইছে।

এই দ্বৈত অবস্থান পাকিস্তানের জন্য কৌশলগত সম্পদ। সৌদির নিরাপত্তার অংশীদার এবং ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সেতু—দুই ভূমিকাই একসঙ্গে ধরে রাখার সুযোগ ইসলামাবাদকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে।

তুরস্কের হিসাব আরও আকর্ষণীয়। ২০২৬ সালের শুরুতে সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সঙ্গে তুরস্ককে যুক্ত করার আলোচনা উঠলেও রিয়াদ তখন তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। এর পেছনে যেমন সৌদির সামরিক ও প্রযুক্তিগত চাহিদা রয়েছে, তেমনি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর কৌশলও কাজ করছে।

সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতের বদলে সহযোগিতাই এখন তুরস্কের জন্য বেশি লাভজনক। মক্কা চুক্তি সেই বাস্তবতাকেই প্রতিষ্ঠা করছে।

Makkah Joint Defence Pact hailed as landmark step - Pakistan Today

ইরান ও ইসরায়েলের অস্বস্তি

এই নতুন সমীকরণের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্ন হলো ইরান কীভাবে এর মোকাবিলা করবে। তেহরান আপাতত চুক্তিটিকে সরাসরি ইরানবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছে না। বরং এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি প্রভাবের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোর আত্মনির্ভরতার উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে।

কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া ভিন্ন সংকেত দিচ্ছে। দেশটির কিছু রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রকাশ্যে সতর্ক করেছেন এবং এমন কথাও বলেছেন যে, ইরানের সঙ্গে বিরোধে থাকা দেশগুলোকে এর মূল্য দিতে হতে পারে।

ইসরায়েলের অবস্থানও আপাতত সংযত। তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে ইসরায়েলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়লেও মক্কা চুক্তি নিয়ে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়নি। এর একটি কারণ হতে পারে সৌদি আরবের সঙ্গে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনা। রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এখনো গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইসরায়েলের জন্য সৌদিকে প্রকাশ্যে বিরোধিতায় ঠেলে দেওয়া কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক নয়।

চুক্তির আসল পরীক্ষা সামনে

মক্কা চুক্তির গুরুত্ব আপাতত সামরিক শক্তির চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবেই বেশি। এটি তুরস্কের আঞ্চলিক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে, পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াচ্ছে এবং সৌদি আরবকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বিকল্প দিচ্ছে।

কিন্তু যেকোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল্য নির্ভর করে সংকটের মুহূর্তে তার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।

সৌদি ভূখণ্ডে আবার ইরান, ইসরায়েল কিংবা ইয়েমেনের হুথিদের কোনো বড় হামলা হলে তুরস্ক ও পাকিস্তান কী করবে—সেটিই হবে আসল প্রশ্ন। তারা যদি সামরিকভাবে সাড়া না দেয়, তাহলে চুক্তির প্রতিরোধমূলক শক্তি দ্রুত দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আর যদি সাড়া দেয়, তাহলে একটি সীমিত নিরাপত্তা চুক্তি অল্প সময়ের মধ্যেই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে তিন দেশকে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

এখানেই মক্কা চুক্তির মৌলিক দ্বন্দ্ব। সৌদি আরব নিরাপত্তার জন্য নতুন একটি প্রতিশ্রুতি তৈরি করেছে, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি কার্যকর করার মুহূর্তে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামনে থাকবে বিপুল ঝুঁকি। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে সংঘাত বিস্তৃত হতে পারে; আর না করলে চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অতএব, মক্কা চুক্তির প্রকৃত তাৎপর্য এখনো তার স্বাক্ষরের মধ্যে নয়। এর গুরুত্ব নির্ধারিত হবে পরবর্তী সংকটে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে বহুমুখী ব্যবস্থায় রূপ নিতে শুরু করে, তাহলে এই চুক্তি সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারে। আর যদি প্রথম বড় পরীক্ষাতেই তিন দেশের প্রতিশ্রুতি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ‘মক্কা চুক্তি’ও মধ্যপ্রাচ্যের ব্যর্থ যৌথ প্রতিরক্ষা উদ্যোগগুলোর দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

‘মক্কা চুক্তি’: যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তার বাইরে নতুন মুসলিম শক্তির সমীকরণ

‘মক্কা চুক্তি’: যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তার বাইরে নতুন মুসলিম শক্তির সমীকরণ

০৮:০০:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ৭ আগস্ট মক্কায় স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি এখনই নতুন কোনো ন্যাটো তৈরির ঘোষণা নয়, কিংবা তিন দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটও নয়। কিন্তু চুক্তিটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর আগের মতো নির্ভর করতে পারছে কি না, সেই প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে।

চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর রাজনৈতিক বার্তা। তিন দেশ ঘোষণা করেছে, তাদের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা অন্য সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এই ভাষা ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে ন্যাটোর মতো যৌথ কমান্ড, স্থায়ী সামরিক পরিকল্পনা কাঠামো কিংবা যুদ্ধের সময় কে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—এমন সুস্পষ্ট ব্যবস্থা এখনো নেই।

তাই ‘মক্কা চুক্তি’কে সামরিক জোট হিসেবে দেখার চেয়ে একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর পরীক্ষামূলক ভিত্তি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

সৌদির নিরাপত্তা হিসাব বদলাচ্ছে

সৌদি আরবের জন্য এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আরেকটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা সব পরিস্থিতিতে কার্যকর নাও হতে পারে। ইরান যদি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে টেনে আনার চেষ্টা অব্যাহত রাখে, তাহলে রিয়াদকে এমন একটি অতিরিক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই হবে, যার ওপর ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই।

এখানে সৌদির আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও গুরুত্বপূর্ণ—নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা।

সৌদি আরব ইতোমধ্যে তুরস্কের তৈরি বায়রাকতার ড্রোন কিনেছে এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের মাটিতে এসব ব্যবস্থা উৎপাদনের আগ্রহ দেখিয়েছে। মক্কা চুক্তি সেই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তুরস্কের প্রযুক্তি ও নকশা, পাকিস্তানের শিল্প ও উৎপাদন সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের বিপুল অর্থ—এই তিনটি উপাদান একত্র হলে ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এমন শিল্পকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি সরবরাহ বা রাজনৈতিক শর্তের ওপর আগের মতো নির্ভর করতে হবে না।

পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক লাভ

চুক্তিটি পাকিস্তানের জন্যও কেবল সামরিক সহযোগিতার বিষয় নয়। বর্তমান উপসাগরীয় সংঘাতে ইসলামাবাদ একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ধরে রাখতে চাইছে।

এই দ্বৈত অবস্থান পাকিস্তানের জন্য কৌশলগত সম্পদ। সৌদির নিরাপত্তার অংশীদার এবং ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সেতু—দুই ভূমিকাই একসঙ্গে ধরে রাখার সুযোগ ইসলামাবাদকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে।

তুরস্কের হিসাব আরও আকর্ষণীয়। ২০২৬ সালের শুরুতে সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সঙ্গে তুরস্ককে যুক্ত করার আলোচনা উঠলেও রিয়াদ তখন তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। এর পেছনে যেমন সৌদির সামরিক ও প্রযুক্তিগত চাহিদা রয়েছে, তেমনি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর কৌশলও কাজ করছে।

সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতের বদলে সহযোগিতাই এখন তুরস্কের জন্য বেশি লাভজনক। মক্কা চুক্তি সেই বাস্তবতাকেই প্রতিষ্ঠা করছে।

Makkah Joint Defence Pact hailed as landmark step - Pakistan Today

ইরান ও ইসরায়েলের অস্বস্তি

এই নতুন সমীকরণের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্ন হলো ইরান কীভাবে এর মোকাবিলা করবে। তেহরান আপাতত চুক্তিটিকে সরাসরি ইরানবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছে না। বরং এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি প্রভাবের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোর আত্মনির্ভরতার উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে।

কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া ভিন্ন সংকেত দিচ্ছে। দেশটির কিছু রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রকাশ্যে সতর্ক করেছেন এবং এমন কথাও বলেছেন যে, ইরানের সঙ্গে বিরোধে থাকা দেশগুলোকে এর মূল্য দিতে হতে পারে।

ইসরায়েলের অবস্থানও আপাতত সংযত। তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে ইসরায়েলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়লেও মক্কা চুক্তি নিয়ে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়নি। এর একটি কারণ হতে পারে সৌদি আরবের সঙ্গে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনা। রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এখনো গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইসরায়েলের জন্য সৌদিকে প্রকাশ্যে বিরোধিতায় ঠেলে দেওয়া কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক নয়।

চুক্তির আসল পরীক্ষা সামনে

মক্কা চুক্তির গুরুত্ব আপাতত সামরিক শক্তির চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবেই বেশি। এটি তুরস্কের আঞ্চলিক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে, পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াচ্ছে এবং সৌদি আরবকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বিকল্প দিচ্ছে।

কিন্তু যেকোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল্য নির্ভর করে সংকটের মুহূর্তে তার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।

সৌদি ভূখণ্ডে আবার ইরান, ইসরায়েল কিংবা ইয়েমেনের হুথিদের কোনো বড় হামলা হলে তুরস্ক ও পাকিস্তান কী করবে—সেটিই হবে আসল প্রশ্ন। তারা যদি সামরিকভাবে সাড়া না দেয়, তাহলে চুক্তির প্রতিরোধমূলক শক্তি দ্রুত দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আর যদি সাড়া দেয়, তাহলে একটি সীমিত নিরাপত্তা চুক্তি অল্প সময়ের মধ্যেই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে তিন দেশকে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

এখানেই মক্কা চুক্তির মৌলিক দ্বন্দ্ব। সৌদি আরব নিরাপত্তার জন্য নতুন একটি প্রতিশ্রুতি তৈরি করেছে, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি কার্যকর করার মুহূর্তে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামনে থাকবে বিপুল ঝুঁকি। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে সংঘাত বিস্তৃত হতে পারে; আর না করলে চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অতএব, মক্কা চুক্তির প্রকৃত তাৎপর্য এখনো তার স্বাক্ষরের মধ্যে নয়। এর গুরুত্ব নির্ধারিত হবে পরবর্তী সংকটে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে বহুমুখী ব্যবস্থায় রূপ নিতে শুরু করে, তাহলে এই চুক্তি সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারে। আর যদি প্রথম বড় পরীক্ষাতেই তিন দেশের প্রতিশ্রুতি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ‘মক্কা চুক্তি’ও মধ্যপ্রাচ্যের ব্যর্থ যৌথ প্রতিরক্ষা উদ্যোগগুলোর দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হবে।