আজ সকালে প্রথম আলো অনলাইনে একটি খবর দেখে প্রশ্নটা আবার মনে আসলো। শিরোনাম ছিল আরো ৪২ চিহ্নিত ঋণ খেলাপির পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।
খবরে দেখলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে এদের অর্থপাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রায় ২০০ কোটি টাকার উপর পাচার করেছে এই ৪২ টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এই অর্থ ফেরত আনতে আটটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে কয়েকটি ব্যাংক। তবে বলা হচ্ছে ‘নো উইন -নো পে’ ভিত্তিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। সোজা কথায়, যদি বিদেশে পাচারকৃত অর্থ আইনের মাধ্যমে ফেরত না আনা যায় তবে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোন টাকা দেওয়া হবে না। খুব ভালো কথা।
কিন্তু প্রশ্ন হল পাচার করা টাকা ফেরত আনা কি সম্ভব হবে? সোজাসাপ্টা উত্তর হল–না। আপনারা মাঝে মাঝেই এই ধরনের খবর সংবাদমাধ্যমে দেখেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন টাকা ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে কিনা সেটা আমরা জানি না। আমাদের দেশের সাংবাদিকরাও এটা নিয়ে কোন ফলোআপ স্টোরি করে না।
আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে হাসিনার পতনের পর পরই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার খুব জোরেশোরে ঘোষণা দিল যে এবার দেশের সম্পদ লুণ্ঠনকারীরা রেহাই পাবেনা। আমাদেরকে এও জানানো হলো শেখ হাসিনার পরিবারসহ ১১ টি চিহ্নিত লুণ্ঠনকারী গ্রুপ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে এবং মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার হবে এই অর্থ দ্রুত দেশে ফেরত না। ওই চিহ্নিত পাচারকারী গ্রুপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বেক্সিমকো, বসুন্ধরা, এস আলম, আরামিট, নাবিল, ওরিয়ন ইত্যাদি। এই অর্থ ফেরত আনতে খুবই তৎপর দেখা গিয়েছিল তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস এবং বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আহসান মনসুরকে। এই টাকা ফেরত আনার কথা বলে তারা শুরু করল ঘনঘন বিদেশ ভ্রমণ। এ ব্যাপারে বাটপার লরিয়েট ইউনূসকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল আর এক বাটপার তৎকালীন গভর্নর আহসান মনসুর। তার স্বল্পকালীন মেয়াদে সে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ বার বিদেশে গেছে। আর ইউনুস গিয়েছিল ১৫ মাসে ১৫ বার।

কিন্তু তার মেয়াদকালে কোন টাকা উদ্ধার হয়েছিল কিনা সেটা আমরা জানতে পারিনি। ইউনুস নিজেও লন্ডন যাওয়ার আগে বলেছিল তার প্রায়োরিটি হবে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে দেখা করে সেখানে পাচারকৃত টাকা ফেরত আনতে জোরালো পদক্ষেপ নেবেন। ব্যাপারটা যে কত জরুরী ছিল সেটা বোঝানোর জন্য তিনি তার সফর সঙ্গীদের মধ্যে গভর্নর আহসান মনসুর এবং তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেনকে সঙ্গে নিয়ে যান। পরে জানা গেল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কোন বৈঠক নির্ধারিত ছিল না। এমনকি গভর্নর বা দুদক চেয়ারম্যানরাও ওখানে তাদের কাউন্টার পারটদের সঙ্গে কোন মিটিং করেননি। পুরো ব্যাপারটা ছিল ভাঁওতাবাজি। এর উদ্দেশ্য ছিল নিজের ব্যক্তিগত সফরকে সরকারি হিসেবে দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে সেখানে যাওয়া এবং তৎকালীন বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে তার দায়মুক্তির ব্যবস্থা করা। যেটা আমরা পরবর্তীতে সবাই দেখেছি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে এদেশে জবাবদিহিতা করতে হয় না। এ কারণে ক্ষমতাসীন যে কেউ ইচ্ছা করলে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা ধ্বংস করতে পারে এবং তাকে কখনোই বিচারের সম্মুখীন হতে হয় না। এ কারণেই আহসান মনসুর বা ইউনুস ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা যে খুব কঠিন সেটা তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ পাবলিকলি স্বীকার করেছিলেন। কারণ খুব সোজা। ওই তথাকথিত আইন কানুনের পশ্চিমা দেশগুলো বাস্তবে টাকা পাচারকারীদের সেই দেশে স্বাগত জানায়। তা না হলে সব পাচারকারী সেখানে যায় কেন? ওদের চরিত্র প্রস্টিটিউটদের থেকেও খারাপ। ওদের প্রধান উদ্দেশ্য হল যে যেখান থেকে পারো টাকা পয়সা নিয়ে আমাদের কাছে আসো, আমরা তোমাদেরকে সেলটার দিব। তাদের মোটো হল, ‘মানি ইজ গড, নো মেটার হাউ ইট ইস আর্নড’।
আমার মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, এই চিহ্নিত পাচারকারীদের যখন শনাক্ত করা গেছে এবং তাদের অধিকাংশই দেশে আছে তখন তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেন; তারা কিভাবে জেলের বাইরে আছে? গতকালের যে ৪২ পাচারকারীর লিস্ট দেওয়া হয়েছে সেখানেও তাদের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। কিন্তু তাদের কাউকে এ পর্যন্ত জেলে নেয়া হয়েছে এরকম শুনিনি।
প্রশ্ন হল, এত গুরুতর অপরাধ করার পরেও এরা পার পেয়ে যায় কিভাবে? উত্তরটা সহজ। অভিযোগ আছে ইউনুসসহ এ পর্যন্ত যতগুলো সরকার এসেছে তারা সবাই এই দুর্বৃত্তদের কাছ থেকে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে। (ইউনুসের সৃষ্টি করা এনসিপির ছাত্র নেতারা বড় সুবিধা নিয়েছে এদের কাছ থেকে একথা কে না জানে।

ব্যবসায়ী নামক এই দুর্বৃত্তদের আরেকটি কমন ক্যারেক্টারিস্টিক হল এরা এদের অবৈধ সম্পদ রক্ষার জন্য মিডিয়ায় বিনিয়োগ করে। আর তাদের ভাড়া করা সাংবাদিক নামক এই দুর্বৃত্তরাই তখন এদের রক্ষা করতে উঠেপড়ে লাগে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বসুন্ধরা, ওরিয়ন, নাবিল, যমুনা ইত্যাদি।
এর মধ্যে নতুন যোগ হয়েছে আনিসুর রহমান গরকি নামে আরেক দুর্বৃত্ত। ইউনূসের আমলে দুদকে করা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলো সেই সময়ে সব প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। পরে দেখা গেল এই দুর্বৃত্ত ইউনুসের সুবিধাভোগী প্রেস উইংয়ের সম্প্রতি লঞ্চ করা ডেইলি ওয়াদা নামে একটি ইংরেজি অনলাইন দৈনিকে বিনিয়োগ করেছে। এদের উদ্দেশ্য হলো ঘৃণিত ইউনুসকে কিভাবে রক্ষা করা যায় এবং তার সরকারের আমলে নেওয়া বিতর্কিত আলোচনাগুলোকে ধামাচাপা দেওয়া।
আরশাদ মাহমুদ 


















