লন্ডনের সবচেয়ে বড় সংকট কেবল বিদেশি অপরাধীদের উপস্থিতি নয়; আরও গভীর সমস্যা হলো, তাদের অবৈধ অর্থকে বৈধতার আবরণ দেওয়ার জন্য শহরের প্রভাবশালী পেশাজীবী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর একাংশ যে নীরব সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এই প্রবণতা থামাতে এখনো সময় আছে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন কেবল নতুন আইন নয়, বরং অর্থের প্রতি আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্গঠন।
জ্যাক ব্রেটলারের মৃত্যুর সাত বছর পরও সেই ঘটনা অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে যায়। ২০১৯ সালে ১৯ বছর বয়সী এই তরুণের মৃত্যুর ঘটনা তখন হয়তো একটি বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু সাংবাদিক প্যাট্রিক র্যাডেন কিফের অনুসন্ধানী বই ‘লন্ডন ফলিং’ সেই ঘটনাকে লন্ডনের অন্ধকার অর্থনৈতিক জগতের একটি জানালা হিসেবে সামনে এনেছে।
ব্রেটলার ছিলেন মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারের সন্তান। মিল হিল স্কুল ছেড়ে তিনি নিজেকে রুশ কোনো ধনকুবের পরিবারের উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি এমন এক জগতে প্রবেশ করেন, যেখানে বিপুল অর্থ, বিলাসবহুল গাড়ি, ক্ষমতাবান মানুষের যোগাযোগ এবং অপরাধী চক্রের উপস্থিতি একই সামাজিক পরিসরে মিলেমিশে থাকে।
শেষ পর্যন্ত সেই জগতই তার জন্য ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
লন্ডনের ঝলমলে মুখের আড়ালে
থেমসের ওপারে, এমআই৬-এর বিপরীতে অবস্থিত বিলাসবহুল রিভারওয়াক টাওয়ারের একটি বারান্দা থেকে পড়ে ব্রেটলারের মৃত্যু হয়। সেটি হত্যা ছিল, নাকি চাপের মুখে আত্মহত্যা—আজও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কিন্তু তার মৃত্যুর তদন্ত নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলো আরও বড় একটি সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে।
লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে সন্দেহজনক উৎসের অর্থ সব সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয় না। বরং বিপুল সম্পদ, অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদ, দামি গাড়ি, বিলাসী রেস্তোরাঁ এবং ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ওঠাবসা অনেক সময় অপরাধের সম্ভাব্য পরিচয়কে ঢেকে দেয়।
পিকাডিলির উত্তরের রাস্তায় দামি গাড়িতে ঘুরে বেড়ানো, সোনার চেইন পরা কিংবা বিপুল অর্থ ব্যয় করা ব্যক্তিদের সবাই অপরাধী—এমন কথা বলার কোনো কারণ নেই। কিন্তু সমস্যাটি হলো, তাদের মধ্যে যারা সংগঠিত অপরাধ, দুর্নীতি কিংবা অবৈধ অর্থের সঙ্গে যুক্ত, তাদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিক্রিয়া প্রায়ই আশঙ্কাজনকভাবে দুর্বল।
আর এখানেই প্রশ্নটি শুধু পুলিশের সক্ষমতার নয়। প্রশ্নটি পুরো শহরের নৈতিক কাঠামোর।
অপরাধীর চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে অর্থের ক্ষমতা
প্রায় এক যুগ আগে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর থাকাকালে মারভিন কিংয়ের একটি মন্তব্য আমাকে নাড়া দিয়েছিল—লন্ডন বিশ্বের অর্থপাচারের রাজধানী।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই মন্তব্যের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। ‘ইনডালজিং ক্লেপ্টোক্রেসি’ নামের একটি গবেষণাধর্মী বইয়ে তিনজন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ দেখিয়েছেন, সিটি অব লন্ডনের ব্যাংক, হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি, জনসংযোগ সংস্থা, আবাসন ব্যবসা এবং আইনজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ কীভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থ ও ক্ষমতাকে বৈধতার আবরণ দিতে সহায়তা করে।
এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সবকিছু যে সরাসরি বেআইনি, তা নয়। বরং আইনের ধূসর অঞ্চলকে ব্যবহার করে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে সন্দেহজনক সম্পদকে এমনভাবে পরিচালনা করা যায় যে শেষ পর্যন্ত তার অপরাধমূলক উৎসটি আর স্পষ্ট থাকে না।
অর্থাৎ, অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশ বনাম অপরাধীর লড়াই নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এমন এক পেশাজীবী শ্রেণি, যারা কখনো কখনো অপরাধীর অর্থকে সুরক্ষিত, পরিচালিত এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার কাজ করে।
এই ব্যবস্থায় অপরাধী অর্থের মালিক একা নয়। তার পাশে থাকে দক্ষ আইনজীবী, হিসাবরক্ষক, আর্থিক পরামর্শক, সম্পত্তি বিশেষজ্ঞ এবং জনসংযোগ পেশাজীবী। তারা হয়তো নিজেদের কাজকে কেবল ‘সেবা’ হিসেবে দেখেন। কিন্তু সেই সেবার ফল যদি দুর্নীতির অর্থকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়, তাহলে নৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ কোথায়?
পুরোনো রোগ, নতুন চেহারা
লন্ডনের সঙ্গে অবৈধ অর্থ ও বিতর্কিত ধনসম্পদের সম্পর্ক নতুন নয়।
উনিশ শতকের অ্যান্থনি ট্রলোপের ‘দ্য ওয়ে উই লিভ নাউ’ উপন্যাসে প্রতারক অগাস্টাস মেলমোটে বিপুল অর্থ ও আতিথেয়তার মাধ্যমে লন্ডনের অভিজাত সমাজে প্রবেশ করেছিল। ইতিহাসের আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনেক প্রভাবশালী পরিবার দাসব্যবসা থেকে অর্জিত সম্পদের ওপর নিজেদের সামাজিক অবস্থান তৈরি করেছে।
বিংশ শতকের শুরুতে অস্ত্র ব্যবসায়ী বাসিল জাহারফও অভিজাত সমাজে অবাধে চলাফেরা করতেন। বিতর্কিত সম্পদের মালিক হয়েও তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছিলেন।
তাহলে আজকের পরিস্থিতি নিয়ে এত অস্বস্তি কেন?
কারণ অপরাধ ও ক্ষমতার সম্পর্কের চরিত্র বদলেছে। একসময় অপরাধীদের সামাজিক পরিসর ছিল আলাদা। আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক অপরাধী ও অভিজাত সমাজের দূরত্ব অনেক কমে গেছে। সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এখন পূর্ব লন্ডনের কোনো অন্ধকার পানশালায় লুকিয়ে থাকার প্রয়োজন বোধ করেন না। তিনি হয়তো পশ্চিম লন্ডনের বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় বসেন, অভিজাত ক্লাবের সদস্য হন এবং এমন সামাজিক পরিচয় তৈরি করেন যা তাকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে তুলে দেয়।
মিশা গ্লেনি তার ‘ম্যাকমাফিয়া’ বইয়ে যে নতুন ধরনের অপরাধী বিশ্বের কথা তুলে ধরেছিলেন, সেটিই হয়তো এর সবচেয়ে কার্যকর ব্যাখ্যা। আধুনিক অপরাধী শুধু ভয় দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করতে চায় না; সে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও কিনতে চায়।
আর লন্ডন সেই গ্রহণযোগ্যতা কেনার জন্য অসাধারণ একটি বাজার।

‘সবাই তো এমনই’—এই যুক্তি বিপজ্জনক
এই পরিস্থিতির সমর্থনে সবচেয়ে সহজ যুক্তি হলো—এতে নতুন কী আছে?
ব্রিটিশ সমাজে অর্থ, ক্ষমতা ও অপরাধের সম্পর্ক তো বহু পুরোনো। পৃথিবীর অন্য বড় আর্থিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও কি খুব আলাদা? তাহলে লন্ডন একা কেন নৈতিকতার ভার নেবে?
এই যুক্তির কিছু বাস্তব ভিত্তি আছে। আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা এমনভাবে পরস্পরনির্ভর হয়ে উঠেছে যে এক দেশ একাই অবৈধ অর্থের বিরুদ্ধে লড়াই করে বড় পরিবর্তন আনতে পারবে—এমন ধারণা সরলীকৃত।
কিন্তু এই বাস্তবতা আত্মসমর্পণের অজুহাত হতে পারে না।
ব্রিটেন যদি শুধু এই যুক্তিতে বসে থাকে যে অবৈধ অর্থের প্রবাহ বন্ধ করলে তার আর্থিক কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাহলে দেশটি নিজের জন্য একটি ভয়ংকর পরিচয় বেছে নেবে—বিশ্বের ধনী ও ক্ষমতাবান অপরাধীদের সেবা দেওয়ার নিরাপদ ঠিকানা।
এমন অর্থের পরিমাণও সামান্য নয়। বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড অবৈধ অর্থ লন্ডনের আর্থিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে—এমন অনুমান রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, এই অর্থ থেকে পাওয়া ফি ও ব্যবসার বিনিময়ে একটি সমাজ তার নৈতিক বিশ্বাস কতটা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত?
নৈতিকতার জায়গা অর্থনীতির বাইরে নয়
অবৈধ অর্থের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া মানে লন্ডনের আন্তর্জাতিক আর্থিক ভূমিকা ধ্বংস করা নয়। বরং একটি বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক কেন্দ্রের জন্য স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় সম্পদ।
প্রয়োজন হলো এমন একটি মধ্যপন্থা, যেখানে ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক পুঁজির জন্য লন্ডন উন্মুক্ত থাকবে, কিন্তু সহিংস অপরাধী, দুর্নীতিবাজ এবং তাদের অর্থের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হবে না।
এ জন্য কিছু পদক্ষেপ স্পষ্ট।
যারা অর্থপাচার ও দুর্নীতির বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করেন, তাদের শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। বিশেষ করে বিপুল অর্থসম্পদের মালিকদের দায়ের করা মানহানির মামলার ভয় যেন সত্য প্রকাশের পথে বাধা না হয়।
ক্লেপ্টোক্রেসি বা দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকগোষ্ঠীর অর্থকে বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে পেশাদার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট করপোরেট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়ও বিবেচনায় আনতে হবে।
রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রেও আরও কঠোর যাচাই প্রয়োজন। কেউ রাজনৈতিক দলকে বিপুল অর্থ দিয়েছেন কিংবা দাতব্য কাজে অর্থ ব্যয় করেছেন—এটিই তার সম্পদের উৎস বা চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন বন্ধ করে দিতে পারে না।
একই সঙ্গে সম্পত্তি ও কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে আরও স্বচ্ছতা দরকার। কার নামে বাড়ি, কার মালিকানায় কোম্পানি, কার অর্থ কোথা থেকে এসেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়, তাহলে অপরাধীদের জন্য দরজা খোলা থাকে।
সবশেষে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলতেই হবে। কোনো তদন্ত যদি অর্থ, সামাজিক অবস্থান কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত নয়
বর্তমান ব্রিটেনে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—সবকিছুর প্রতি এক ধরনের সর্বগ্রাসী সংশয়।
রাজনীতিবিদদের নিয়ে কেলেঙ্কারি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের লোভ, জনজীবনে অর্থের প্রভাব, বিভিন্ন বিতর্কিত ব্যক্তির উত্থান—এসব দেখে অনেকে ধরে নিচ্ছেন, সবাই একই রকম। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা, পেশাজীবী—কেউই নাকি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
এমন ধারণা বাস্তবতার মতো শোনালেও এটি আসলে বিপজ্জনক।
কারণ সবাই একই রকম নয়। এখনও অসংখ্য সৎ মানুষ আছেন—রাজনীতি, ব্যবসা, আইন, সাংবাদিকতা, প্রশাসন কিংবা সাধারণ জীবনের প্রতিটি স্তরেই। সবাই দ্রুত অর্থবান হতে চান না। সবাই সন্দেহজনক সম্পদের সামনে নৈতিক প্রশ্নকে বিসর্জন দেন না।
সমস্যা হলো, সৎ মানুষের নীরবতা যদি অসৎদের দাপটের কাছে জায়গা ছেড়ে দেয়, তাহলে ধীরে ধীরে পুরো সমাজের মানদণ্ড বদলে যায়।
দুই শতাব্দী আগে অ্যালেক্সিস দ্য তকভিল সতর্ক করেছিলেন, সংশয়ের সময়ে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি ও মহৎ কোনো লক্ষ্য অনুসরণের বদলে দৈনন্দিন আকাঙ্ক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে। সেই সতর্কতার প্রাসঙ্গিকতা আজও অস্বীকার করা কঠিন।
লন্ডনের পতন অনিবার্য নয়। কিন্তু শহরটি কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সাফল্যের সংজ্ঞা আমরা কীভাবে নির্ধারণ করি তার ওপর।
শুধু যত বেশি অর্থ, তত বেশি সাফল্য—এই ধারণা কোনো আধুনিক সমাজের জন্য যথেষ্ট নয়। একটি আর্থিক রাজধানীর মূল্য তার ব্যাংকের আকার, বিলাসবহুল সম্পত্তির দাম কিংবা ধনীদের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। তার মূল্য নির্ভর করে মানুষ কতটা বিশ্বাস করে যে আইন সবার জন্য সমান এবং অপরাধী অর্থ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ছায়ায় নিরাপদ থাকবে না।
লন্ডনের সামনে এখনো সেই পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে। প্রয়োজন শুধু নতুন নিয়ম নয়—অর্থের প্রতি আমাদের পুরোনো মুগ্ধতার বিরুদ্ধে একটি নৈতিক অবস্থান।
কারণ কোনো শহর তখনই সত্যিকার অর্থে পতনের দিকে যায়, যখন তার মানুষ অন্যায় দেখে প্রতিবাদ করা বন্ধ করে দেয় এবং অবৈধ সম্পদের পাশে দাঁড়িয়ে শুধু বলে—এভাবেই তো পৃথিবী চলে।
ম্যাক্স হেস্টিংস 


















