০১:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
খুলনায় দৈনিক প্রবাহ কার্যালয়ে হামলা, কর্মীকে মারধরের অভিযোগ মাদ্রাসাছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদে সংঘর্ষ, ফরিদপুরে নিহত ১ পরিবার কার্ডের জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, দক্ষিণ সুরমায় ইউএনও কার্যালয়ে তালা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধনের দাবি, রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা ৫ পরীক্ষার্থী, শিক্ষক ১১ জন—তবু এসএসসিতে কেউ পাস করেনি লালমনিরহাটে বোমা বিস্ফোরণে উত্তপ্ত জাজিরা, সংঘর্ষে বৃদ্ধ নিহত, আহত ১০ ১০টি আইসিইউ বেডে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের চিকিৎসা, রংপুরে সংকটে মুমূর্ষু রোগীরা লন্ডনকে অপরাধের অর্থের রাজধানী হতে দেওয়া যাবে না বিশ্বকাপ নিয়ে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসভঙ্গের’ অভিযোগ, ফিফায় বাড়ছে বিরোধ ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন বার্তা, সেপ্টেম্বরে তারেক রহমানের দিল্লি সফরে খুলছে সম্ভাবনার দুয়ার

১০টি আইসিইউ বেডে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের চিকিৎসা, রংপুরে সংকটে মুমূর্ষু রোগীরা

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষা কখনো কখনো হয়ে উঠছে জীবন-মৃত্যুর লড়াই। উত্তরাঞ্চলের আট জেলার প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র এই হাসপাতালে একসঙ্গে ভর্তি থাকেন গড়ে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার রোগী। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশের নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন হতে পারে। অথচ হাসপাতালটির আইসিইউতে শয্যা রয়েছে মাত্র ১০টি।

ফলে প্রতিদিনই আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার জন্য ১৫ থেকে ২০ জন রোগীর আবেদন আসে। কিন্তু শয্যা সীমিত হওয়ায় সবাইকে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয় না। অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা অনেক রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। কারও কারও মৃত্যু হয় আইসিইউ শয্যা পাওয়ার আগেই।

এই পরিস্থিতি শুধু একটি হাসপাতালের শয্যা-সংকটের চিত্র নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের সরকারি নিবিড় চিকিৎসাব্যবস্থার বড় একটি দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

একটি শয্যার অপেক্ষায় কাটে মূল্যবান সময়

গুরুতর অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে আইসিইউতে চিকিৎসা পাওয়ার সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, কিডনি জটিলতা কিংবা দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীর অবস্থা যেকোনো মুহূর্তে অবনতি হতে পারে। কিন্তু রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় আইসিইউ শয্যা এতটাই কম যে অনেক রোগীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

আইসিইউর অপেক্ষায় রমেক হাসপাতালে মৃত্যুর মিছিল

আইসিইউ বিভাগের পরিদর্শক চিকিৎসক তৌহিদ সরকার ডলার জানান, প্রতিদিন অনেক রোগীর জন্য আইসিইউ শয্যার আবেদন আসে। কিন্তু সীমিত শয্যা, জনবল ও জায়গার কারণে সবাইকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।

তাঁর মতে, উত্তরাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে আইসিইউর শয্যা, চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল এবং অবকাঠামো—সবই বাড়ানো জরুরি।

অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা রোগীদের করুণ পরিণতি

আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষমাণ ১২ জন রোগীর একটি তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাঁদের বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত আইসিইউতে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাননি। স্বজনদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই অপেক্ষার নির্মম অভিজ্ঞতা।

রংপুর নগরীর ধাপ সাতগাড়া এলাকার মহসেনা বেগম গুরুতর বুকে ব্যথা নিয়ে হৃদ্‌রোগ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা দ্রুত আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিন দিন অপেক্ষা করেও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে স্থানান্তরের পর বুধবার তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্য শফিকের ভাষ্য, সময়মতো আইসিইউ সহায়তা পেলে হয়তো আরও কিছুদিন বাঁচানো সম্ভব হতো।

কুড়িগ্রামের ৭২ বছর বয়সী রাইছা বেগমও স্ট্রোকের পর প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। কয়েক দিন পর তাঁকে অচেতন অবস্থায় ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছিল, তখন তাঁর আইসিইউ প্রয়োজন নেই।

কিন্তু পরদিনই কিডনি বিভাগের চিকিৎসকেরা তাঁকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তখন শয্যা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।

কুড়িগ্রামের চিলমারীর সৌন্দর্যনগর এলাকার ৪৫ বছর বয়সী বিউটি বেগমের ঘটনাটিও আরও বেদনাদায়ক। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছিল। জরুরি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত হলেও অস্ত্রোপচারের পর আইসিইউ প্রয়োজন হবে—এ কারণে শয্যা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি।

পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করেও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি। ৩ জুন দুপুরের দিকে মারা যান বিউটি বেগম।

তাঁর স্বজন নূর আলম জানান, বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। তাঁর অভিযোগ, অপেক্ষার সময় কয়েকটি আইসিইউ শয্যা খালি হলেও বিউটি বেগমকে সেখানে নেওয়া হয়নি।

দুর্ঘটনায় আহত রোগীরও অপেক্ষার শেষ হয়নি

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর ৮০ বছর বয়সী মোহাম্মদ সোবহান সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। ১ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

কিন্তু শয্যার জন্য অপেক্ষা করতে করতে পরদিন ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।

নাতনি হ্যাপি বেগম বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আইসিইউতে নেওয়ার মতো শয্যা পাওয়া যায়নি। তাঁর প্রশ্ন, এত বড় একটি হাসপাতালে মাত্র ১০টি আইসিইউ শয্যা দিয়ে কীভাবে এত মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব?

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের ৬৫ বছর বয়সী খায়বর হোসেনও হৃদ্‌রোগ বিভাগে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসকেরা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর নাম অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হলেও শয্যা পাওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

রংপুর সদর উপজেলার আজহারুল ইসলামের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। কিডনি সমস্যা, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসকেরা একাধিকবার আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। দুই দিন অপেক্ষা করেও শয্যা না পাওয়ায় শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যেতে বাধ্য হয় পরিবার।

দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের ৭০ বছর বয়সী আবদুল হালিমের পরিবার অবশ্য পাঁচ দিন অপেক্ষার পর আইসিইউ শয্যা পেয়েছিল। তাঁর ছেলে মোহাম্মদ জয়নুলের অভিযোগ, হাসপাতালে সেবা পেতে অর্থ বা প্রভাবের প্রয়োজন হয়। তিনি অপেক্ষমাণ আরও কয়েকজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও দেখেছেন বলে জানান।

দরিদ্র রোগীদের সামনে বেসরকারি চিকিৎসার দেয়াল

সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসরকারি চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়। রংপুরের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা থাকলেও প্রতিদিনের চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে।

স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও গুড হেলথ হাসপাতালে আইসিইউ সেবা রয়েছে। সেখানে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মেরাজুল মোহসিন জানান, তাঁদের আইসিইউতে ১২টি শয্যা রয়েছে। রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিনের খরচ ২০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

ফলে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সামনে তৈরি হচ্ছে এক কঠিন বাস্তবতা। সরকারি হাসপাতালে শয্যা নেই, আবার বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যয় বহন করার ক্ষমতাও নেই। মাঝখানে আটকে যাচ্ছে গুরুতর অসুস্থ রোগীর জীবন।

শুধু শয্যা বাড়ালেই কি সমাধান হবে?

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, আইসিইউর শয্যা বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও শুধু শয্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত জায়গা, চিকিৎসক, নার্স, কারিগরি জনবল ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো।

হাসপাতালে বর্তমানে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশের আইসিইউ প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিদিন আইসিইউর জন্য আবেদন করা রোগীদের নাম ও যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। কোনো শয্যা খালি হলে অপেক্ষমাণ তালিকা অনুযায়ী পরবর্তী রোগীকে ফোন করে জানানো হয় বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসক তৌহিদ সরকার ডলার অর্থ বা প্রভাবের ভিত্তিতে শয্যা বরাদ্দের অভিযোগও নাকচ করেছেন। তাঁর দাবি, শয্যা বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই।

জায়গার অভাবে সম্প্রসারণও কঠিন

রংপুর স্বাস্থ্য বিভাগের উপপরিচালক চিকিৎসক মো. ওয়াজেদ আলী জানান, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০টি আইসিইউ শয্যা একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিটের অংশ। কিন্তু বর্তমান স্থাপনায় অতিরিক্ত শয্যা বসানোর মতো জায়গা নেই।

তাঁর ভাষ্য, পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া গেলে শিশু হাসপাতালের আইসিইউ শয্যাগুলোও সেখানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া যেত।

তিনি জানান, রংপুরের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে কিছু আইসিইউ শয্যা রয়েছে। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও তিনটি আইসিইউ শয্যা আছে, যদিও সেগুলোর সেবা এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি।

আনসার নিয়োগের তথ্য চেয়ে ৪৯৫ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য  অধিদপ্তর | খবর | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

প্রতিটি জেলায় আইসিইউ গড়ার পরিকল্পনা

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, উত্তরাঞ্চলের আইসিইউ সংকট কমাতে শুধু রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর নির্ভর করলে হবে না। জেলা পর্যায়েই নিবিড় চিকিৎসার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চিকিৎসক ওয়াজেদ আলী বলেন, এত বড় একটি বিভাগের মানুষের জন্য বর্তমান আইসিইউ সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি বরাদ্দের আওতায় চলতি অর্থবছর থেকেই বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

চিকিৎসার সুযোগ যেন অপেক্ষার পরীক্ষায় পরিণত না হয়

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জন্য শেষ ভরসার অন্যতম প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই ভরসার জায়গাতেই যদি একজন সংকটাপন্ন রোগীকে একটি আইসিইউ শয্যার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সমস্যাটি কেবল অবকাঠামোর নয়—এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতার প্রশ্ন।

একটি আইসিইউ শয্যা হয়তো একটি সংখ্যামাত্র। কিন্তু সেই শয্যার অপেক্ষায় থাকা প্রতিটি রোগীর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, অসহায় স্বজনদের আকুতি এবং বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা।

রংপুরের বাস্তবতা তাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে—উত্তরাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো এখন আর বিলাসিতা নয়, জরুরি প্রয়োজন। সময়মতো নিবিড় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে যে জীবনগুলো বাঁচানো সম্ভব, সেগুলো যেন কেবল একটি শয্যার অভাবে হারিয়ে না যায়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

খুলনায় দৈনিক প্রবাহ কার্যালয়ে হামলা, কর্মীকে মারধরের অভিযোগ

১০টি আইসিইউ বেডে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের চিকিৎসা, রংপুরে সংকটে মুমূর্ষু রোগীরা

১২:৫১:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষা কখনো কখনো হয়ে উঠছে জীবন-মৃত্যুর লড়াই। উত্তরাঞ্চলের আট জেলার প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র এই হাসপাতালে একসঙ্গে ভর্তি থাকেন গড়ে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার রোগী। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশের নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন হতে পারে। অথচ হাসপাতালটির আইসিইউতে শয্যা রয়েছে মাত্র ১০টি।

ফলে প্রতিদিনই আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার জন্য ১৫ থেকে ২০ জন রোগীর আবেদন আসে। কিন্তু শয্যা সীমিত হওয়ায় সবাইকে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয় না। অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা অনেক রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। কারও কারও মৃত্যু হয় আইসিইউ শয্যা পাওয়ার আগেই।

এই পরিস্থিতি শুধু একটি হাসপাতালের শয্যা-সংকটের চিত্র নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের সরকারি নিবিড় চিকিৎসাব্যবস্থার বড় একটি দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

একটি শয্যার অপেক্ষায় কাটে মূল্যবান সময়

গুরুতর অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে আইসিইউতে চিকিৎসা পাওয়ার সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, কিডনি জটিলতা কিংবা দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীর অবস্থা যেকোনো মুহূর্তে অবনতি হতে পারে। কিন্তু রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় আইসিইউ শয্যা এতটাই কম যে অনেক রোগীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

আইসিইউর অপেক্ষায় রমেক হাসপাতালে মৃত্যুর মিছিল

আইসিইউ বিভাগের পরিদর্শক চিকিৎসক তৌহিদ সরকার ডলার জানান, প্রতিদিন অনেক রোগীর জন্য আইসিইউ শয্যার আবেদন আসে। কিন্তু সীমিত শয্যা, জনবল ও জায়গার কারণে সবাইকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।

তাঁর মতে, উত্তরাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে আইসিইউর শয্যা, চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল এবং অবকাঠামো—সবই বাড়ানো জরুরি।

অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা রোগীদের করুণ পরিণতি

আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষমাণ ১২ জন রোগীর একটি তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাঁদের বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত আইসিইউতে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাননি। স্বজনদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই অপেক্ষার নির্মম অভিজ্ঞতা।

রংপুর নগরীর ধাপ সাতগাড়া এলাকার মহসেনা বেগম গুরুতর বুকে ব্যথা নিয়ে হৃদ্‌রোগ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা দ্রুত আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিন দিন অপেক্ষা করেও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে স্থানান্তরের পর বুধবার তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্য শফিকের ভাষ্য, সময়মতো আইসিইউ সহায়তা পেলে হয়তো আরও কিছুদিন বাঁচানো সম্ভব হতো।

কুড়িগ্রামের ৭২ বছর বয়সী রাইছা বেগমও স্ট্রোকের পর প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। কয়েক দিন পর তাঁকে অচেতন অবস্থায় ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছিল, তখন তাঁর আইসিইউ প্রয়োজন নেই।

কিন্তু পরদিনই কিডনি বিভাগের চিকিৎসকেরা তাঁকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তখন শয্যা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।

কুড়িগ্রামের চিলমারীর সৌন্দর্যনগর এলাকার ৪৫ বছর বয়সী বিউটি বেগমের ঘটনাটিও আরও বেদনাদায়ক। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছিল। জরুরি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত হলেও অস্ত্রোপচারের পর আইসিইউ প্রয়োজন হবে—এ কারণে শয্যা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি।

পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করেও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি। ৩ জুন দুপুরের দিকে মারা যান বিউটি বেগম।

তাঁর স্বজন নূর আলম জানান, বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। তাঁর অভিযোগ, অপেক্ষার সময় কয়েকটি আইসিইউ শয্যা খালি হলেও বিউটি বেগমকে সেখানে নেওয়া হয়নি।

দুর্ঘটনায় আহত রোগীরও অপেক্ষার শেষ হয়নি

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর ৮০ বছর বয়সী মোহাম্মদ সোবহান সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। ১ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

কিন্তু শয্যার জন্য অপেক্ষা করতে করতে পরদিন ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।

নাতনি হ্যাপি বেগম বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আইসিইউতে নেওয়ার মতো শয্যা পাওয়া যায়নি। তাঁর প্রশ্ন, এত বড় একটি হাসপাতালে মাত্র ১০টি আইসিইউ শয্যা দিয়ে কীভাবে এত মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব?

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের ৬৫ বছর বয়সী খায়বর হোসেনও হৃদ্‌রোগ বিভাগে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসকেরা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর নাম অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হলেও শয্যা পাওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

রংপুর সদর উপজেলার আজহারুল ইসলামের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। কিডনি সমস্যা, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসকেরা একাধিকবার আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। দুই দিন অপেক্ষা করেও শয্যা না পাওয়ায় শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যেতে বাধ্য হয় পরিবার।

দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের ৭০ বছর বয়সী আবদুল হালিমের পরিবার অবশ্য পাঁচ দিন অপেক্ষার পর আইসিইউ শয্যা পেয়েছিল। তাঁর ছেলে মোহাম্মদ জয়নুলের অভিযোগ, হাসপাতালে সেবা পেতে অর্থ বা প্রভাবের প্রয়োজন হয়। তিনি অপেক্ষমাণ আরও কয়েকজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও দেখেছেন বলে জানান।

দরিদ্র রোগীদের সামনে বেসরকারি চিকিৎসার দেয়াল

সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসরকারি চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়। রংপুরের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা থাকলেও প্রতিদিনের চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে।

স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও গুড হেলথ হাসপাতালে আইসিইউ সেবা রয়েছে। সেখানে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মেরাজুল মোহসিন জানান, তাঁদের আইসিইউতে ১২টি শয্যা রয়েছে। রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিনের খরচ ২০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

ফলে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সামনে তৈরি হচ্ছে এক কঠিন বাস্তবতা। সরকারি হাসপাতালে শয্যা নেই, আবার বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যয় বহন করার ক্ষমতাও নেই। মাঝখানে আটকে যাচ্ছে গুরুতর অসুস্থ রোগীর জীবন।

শুধু শয্যা বাড়ালেই কি সমাধান হবে?

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, আইসিইউর শয্যা বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও শুধু শয্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত জায়গা, চিকিৎসক, নার্স, কারিগরি জনবল ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো।

হাসপাতালে বর্তমানে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশের আইসিইউ প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিদিন আইসিইউর জন্য আবেদন করা রোগীদের নাম ও যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। কোনো শয্যা খালি হলে অপেক্ষমাণ তালিকা অনুযায়ী পরবর্তী রোগীকে ফোন করে জানানো হয় বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসক তৌহিদ সরকার ডলার অর্থ বা প্রভাবের ভিত্তিতে শয্যা বরাদ্দের অভিযোগও নাকচ করেছেন। তাঁর দাবি, শয্যা বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই।

জায়গার অভাবে সম্প্রসারণও কঠিন

রংপুর স্বাস্থ্য বিভাগের উপপরিচালক চিকিৎসক মো. ওয়াজেদ আলী জানান, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০টি আইসিইউ শয্যা একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিটের অংশ। কিন্তু বর্তমান স্থাপনায় অতিরিক্ত শয্যা বসানোর মতো জায়গা নেই।

তাঁর ভাষ্য, পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া গেলে শিশু হাসপাতালের আইসিইউ শয্যাগুলোও সেখানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া যেত।

তিনি জানান, রংপুরের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে কিছু আইসিইউ শয্যা রয়েছে। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও তিনটি আইসিইউ শয্যা আছে, যদিও সেগুলোর সেবা এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি।

আনসার নিয়োগের তথ্য চেয়ে ৪৯৫ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য  অধিদপ্তর | খবর | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

প্রতিটি জেলায় আইসিইউ গড়ার পরিকল্পনা

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, উত্তরাঞ্চলের আইসিইউ সংকট কমাতে শুধু রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর নির্ভর করলে হবে না। জেলা পর্যায়েই নিবিড় চিকিৎসার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চিকিৎসক ওয়াজেদ আলী বলেন, এত বড় একটি বিভাগের মানুষের জন্য বর্তমান আইসিইউ সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি বরাদ্দের আওতায় চলতি অর্থবছর থেকেই বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

চিকিৎসার সুযোগ যেন অপেক্ষার পরীক্ষায় পরিণত না হয়

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জন্য শেষ ভরসার অন্যতম প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই ভরসার জায়গাতেই যদি একজন সংকটাপন্ন রোগীকে একটি আইসিইউ শয্যার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সমস্যাটি কেবল অবকাঠামোর নয়—এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতার প্রশ্ন।

একটি আইসিইউ শয্যা হয়তো একটি সংখ্যামাত্র। কিন্তু সেই শয্যার অপেক্ষায় থাকা প্রতিটি রোগীর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, অসহায় স্বজনদের আকুতি এবং বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা।

রংপুরের বাস্তবতা তাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে—উত্তরাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো এখন আর বিলাসিতা নয়, জরুরি প্রয়োজন। সময়মতো নিবিড় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে যে জীবনগুলো বাঁচানো সম্ভব, সেগুলো যেন কেবল একটি শয্যার অভাবে হারিয়ে না যায়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।