ভারতকে ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরের যে লক্ষ্য সামনে রাখা হয়েছে, সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর একটি হলো দক্ষ মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদ গড়ে তোলার কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র শিক্ষা। অথচ দেশের সশস্ত্র বাহিনী থেকে প্রতিবছর অবসর নেওয়া হাজারো নারী-পুরুষের জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় যুক্ত করা হয়নি। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর আওতায় সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞ ও যোগ্য সাবেক সদস্যদের ‘প্রফেসর অব প্র্যাকটিস’ হিসেবে নেওয়ার উদ্যোগ থাকলেও এর বাইরে সম্ভাবনার বড় একটি অংশ এখনও অনাবিষ্কৃত।
ভারতের শিক্ষা খাতে সংস্কারের নতুন পর্যায়ে প্রবেশের এই সময়ে তাই প্রতিরক্ষা বাহিনীর মানবসম্পদকে শিক্ষায় যুক্ত করার একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করা জরুরি। এটি শুধু অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের দ্বিতীয় কর্মজীবনের সুযোগ তৈরি করবে না; একই সঙ্গে স্কুল, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও উচ্চশিক্ষায় বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রশিক্ষকের ঘাটতিও কমাতে পারে।
গ্রাম ও প্রান্তিক শিক্ষায় বড় সম্ভাবনা
অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের যোগ্যতা একরকম নয়। তাঁদের মধ্যে যেমন উচ্চশিক্ষিত কর্মকর্তা রয়েছেন, তেমনি বিভিন্ন কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করা বিপুলসংখ্যক সদস্যও আছেন। এই বৈচিত্র্যকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পিতভাবে চিহ্নিত করে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া দরকার।
আগের তুলনায় এখন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিচের স্তরের সদস্যদের মধ্যেও শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেক বেড়েছে। নৌ ও বিমানবাহিনীর বহু সদস্য চাকরির পাশাপাশি দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সেনাবাহিনীর শিক্ষা শাখার সদস্যদেরও চাকরির সময় উচ্চশিক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকে। তাঁদের একটি অংশ বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকার গ্রামীণ স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কাজ করতে পারেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সম্ভাবনাও রয়েছে। অবসর নেওয়ার পর বহু সদস্য তাঁদের নিজ গ্রাম বা শহরে ফিরে যান। কেউ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, কেউ পারিবারিক সম্পত্তি দেখাশোনা করেন। তাঁদের মধ্যে যাঁদের স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে, তাঁদের প্রয়োজনীয় শিক্ষণ-পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিয়ে স্কুলশিক্ষক হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব। এর জন্য প্রত্যেকের ক্ষেত্রে প্রচলিত শিক্ষক প্রশিক্ষণের একই কাঠামো প্রয়োগ করতেই হবে—এমন নয়; বরং তাঁদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা বিবেচনায় সংক্ষিপ্ত ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
কারিগরি শিক্ষায় সামরিক দক্ষতার ব্যবহার
আধুনিক সামরিক বাহিনীর একটি বড় শক্তি হলো প্রযুক্তিগত দক্ষতা। সেনাবাহিনীর সিগন্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার সদস্যরা যে ধরনের প্রযুক্তিগত কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তার অনেকটাই বেসামরিক কারিগরি শিক্ষায় সরাসরি কাজে লাগানো যায়। নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রযুক্তিবিদদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
জাহাজ, বিমান, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম নিয়ে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থাকা এসব অবসরপ্রাপ্ত সদস্যকে শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও শিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শিক্ষক বা প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান বিশেষভাবে মূল্যবান হতে পারে।
এমনকি তিন বাহিনীর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে যাঁরা আগে থেকেই প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁদের জন্য আরও বড় সুযোগ রয়েছে। তাঁদের রয়েছে প্রশিক্ষণ পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন এবং নির্দিষ্ট দক্ষতা শেখানোর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি তাঁদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষণ-পদ্ধতির কোর্স চালু করে, তাহলে এই দক্ষতাকে বেসামরিক শিক্ষাব্যবস্থায় দ্রুত রূপান্তর করা সম্ভব।
উচ্চশিক্ষায় কর্মকর্তাদের সম্ভাবনা
সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনার পরিসর আরও বিস্তৃত। সাধারণত তিন বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা ৫৪ থেকে ৫৬ বছর বয়সের মধ্যে অবসর নেন। আবার ব্যক্তিগত বা পেশাগত কারণে কেউ কেউ ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সেই স্বেচ্ছা অবসর নেন। তাঁদের একটি বড় অংশ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং প্রশাসন, কৌশল, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

অনেক কর্মকর্তার শিক্ষাদান বা প্রশিক্ষণ পরিচালনার অভিজ্ঞতাও থাকে। এসব তথ্য সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তরগুলোর মাধ্যমে সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে কাজ করার আগ্রহের ভিত্তিতে তাঁদের কলেজ, কারিগরি প্রতিষ্ঠান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দায়িত্বে যুক্ত করা যেতে পারে। যাঁরা একাডেমিক পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে আগ্রহী এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতা রাখেন, তাঁদের অধ্যাপক হিসেবেও নিয়োগের সুযোগ থাকা উচিত।
সমস্যা হলো, করপোরেট খাত অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের দক্ষতাকে তুলনামূলকভাবে দ্রুত গ্রহণ করলেও শিক্ষা খাত এখনও একইভাবে এগিয়ে আসেনি। এর পেছনে কম বেতন এবং সরকারি পর্যায়ে সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ অন্যতম কারণ। ফলে সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেওয়া যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা খাতকে আকর্ষণীয় দ্বিতীয় কর্মজীবনে পরিণত করতে হলে নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রথম শর্ত হলো প্রতিরক্ষা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিক্ষা ও গবেষণা কাউন্সিল, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীদের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও ইউনিট পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। পুনর্বাসন অধিদপ্তরের সমন্বয়ে নিয়মিত যোগাযোগের একটি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
এরপর প্রয়োজন হবে কোন প্রতিষ্ঠানে কতজন শিক্ষক বা প্রশিক্ষক দরকার, তাঁদের কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের কী অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে—এসব নির্ধারণ করা। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এই উদ্যোগে যুক্ত করতে হবে। উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা যত বাড়ছে, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে তাদের অংশগ্রহণ তত গুরুত্বপূর্ণ।
এটি কেবল চাকরির পুনর্বাসন কর্মসূচি হওয়া উচিত নয়। এর বৃহত্তর লক্ষ্য হওয়া উচিত জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি। সামরিক জীবনের শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, নেতৃত্ব, কঠোর পরিশ্রম এবং সংকট মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তরুণদের শিক্ষাজীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অবশ্যই সামরিক সংস্কৃতিকে হুবহু শ্রেণিকক্ষে স্থানান্তর নয়; বরং তার ইতিবাচক মূল্যবোধকে আধুনিক শিক্ষাদর্শের সঙ্গে সমন্বয় করাই হবে মূল উদ্দেশ্য।

একটি নতুন জাতীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ
অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের বেসামরিক জীবনে পুনর্বাসনের প্রশ্নটি নতুন নয়। অতীতে সরকারি চাকরি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে তাঁদের পার্শ্ববর্তী কর্মজীবনের সুযোগ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। একই ধরনের একটি সুপরিকল্পিত পথ শিক্ষা খাতেও তৈরি করা যেতে পারে।
এর ফলে একদিকে অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের দক্ষতা অব্যবহৃত থাকবে না, অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পাবে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষক ও প্রশিক্ষক। সবচেয়ে বড় লাভ হতে পারে তরুণ প্রজন্মের। এমন এক সময়ে, যখন ভারতের বিপুলসংখ্যক তরুণ ভবিষ্যৎ নিয়ে দিকনির্দেশনা খুঁজছে, তখন জীবনের বড় অংশ দেশসেবায় কাটানো অভিজ্ঞ মানুষদের জ্ঞান ও মূল্যবোধ তাঁদের সামনে নতুন অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
ভারতের উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার লক্ষ্য কেবল অবকাঠামো, প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করবে না। শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতার মূল জায়গা হবে মানুষ। সেই মানুষ তৈরির প্রক্রিয়ায় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক জনবলকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা তাই একটি পুনর্বাসন উদ্যোগের চেয়ে অনেক বেশি—এটি জাতীয় মানবসম্পদ বিনিয়োগের একটি কৌশলগত পথ।
লেখকঃ অর্জুন সুব্রামানিয়াম, অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল এবং হায়দরাবাদের কৌটিল্য স্কুল অব পাবলিক পলিসির ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি।
অর্জুন সুব্রামানিয়াম 



















