তারেক রহমানের একজন উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, তারেক রহমান যে কোনো সময় ভারতে যাবেন। তিনি ভারতে যাবেন এটাই স্বাভাবিক। দুই দিন আগেও এক সাংবাদিক বন্ধুকে বলছিলাম, ট্যাবলয়েড পত্রিকা বা ওই ধরনের কোনো মিডিয়া আউটলেট নিউজ করতে পারে ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে যাবেন না’। প্রথম আলোর মতো একটি প্রথম সারির পত্রিকা কেন তার যাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে নিউজ করল?
ওই সাংবাদিক বন্ধু আমাকে বলে, আরও অনেকেই তো করছে। তুমি কীভাবে মনে করছ তিনি যাবেন? হাসতে হাসতে তাকে বলেছিলাম যে ইউনূস সেভেন সিস্টার খেয়ে দেওয়ার জন্য হুংকার দিয়েছিলেন—ব্যাংককে তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখনি?
তাছাড়া তারেক রহমানের দেশে ফেরা, নির্বাচনে জেতা, প্রধানমন্ত্রী হওয়া এমনকি রাজনীতিতে তাঁর অনেকটা ফিরে আসা সবকিছু ঘনিষ্ঠভাবে লক্ষ্য করার পরে কেন মনে করবে তিনি ভারতে যাবেন না? তাছাড়া প্রতিবেশী ও বৃহৎ শক্তি সব সময়ই ছোট রাষ্ট্রের জন্য ভিন্ন বাস্তবতা। রাষ্ট্রের চেয়ারে বসে এ বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। যেমন শ্রীলঙ্কায় গিয়ে দেখা যায়—মিডল ক্লাসের ছেলে মেয়েদের বড় অংশই চায়নাকে পছন্দ করে, এমনকি তারা ইংরেজির পাশাপাশি এখন অনেকে ম্যান্ডারিন শেখে। তারপরও তাদের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ভারত সরকার “ভারত মহাসাগরে” ফেলে দিচ্ছে না? অর্থাৎ বড় রাষ্ট্রও প্রতিবেশীকে অস্বীকার করতে পারে না।

তবে পত্রিকা বা সাংবাদিক যদি সরকারের কোনো হাইপ তোলার কাজে ব্যবহার হয় সেটা ভিন্ন। বর্তমানের ক্ষমতাসীন বা বিরোধী গোষ্ঠী মিলে এই যে “জুলাই শক্তি”—এদের মূল পুঁজি কিন্তু ভারতবিরোধিতা। এমনকি এদের যে ইনফ্লুয়েন্সাররা বা যে মিডিয়া আউটলেটের সম্পাদক বা সাংবাদিকরা পরে স্বীকার করেছেন, তারা জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের পক্ষে কাজ করেছেন। এদেরও কাজের শুরুটা খেয়াল করলে দেখা যাবে—তারা ভারতবিরোধিতা, বয়কট ভারত এই দিয়েই আন্দোলন শুরু করেছিল। কারণ, একটি স্টেবল সরকার ও অর্থনৈতিকভাবে দেশকে সুস্থির রাখা সরকারের বিরুদ্ধে শুরুতে অন্য কোনো ট্যাগ লাগানোর সুযোগ ছিল না। তাই ভারতবিরোধিতার পুঁজিটাকেও তো রক্ষা করতে হবে।
তবে তারেক রহমানের আসন্ন ভারত সফরের দুটি অংশ। প্রথম অংশ তিনি ভারতে যাচ্ছেন ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে। দ্বিতীয় অংশ ভারত তাঁকে আগেই সপরিবারে ভারত সফর করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
অর্থাৎ শেষের অংশটুকু দ্বিপাক্ষিক। আর এই দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েরই চেষ্টা থাকবে নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষা। আরও সহজ করে বলা যায় যেমন ত্রিবেদী ও তারেক রহমান বৈঠক শেষে ব্রিকসে যাওয়া নিয়ে কিছু বলা হলো না—বলা হলো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও হাদির হত্যাকারীর ফেরত দেওয়ার বিষয় আলোচনা হয়েছে।
এর একদিন পরে মানুষ জানতে পারল এতদিন যে না যাওয়ার হাইপ পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য মাধ্যম তুলেছিল বাস্তবতা তার বিপরীতে। বাংলাদেশ সরকারপ্রধান ভারতে যাচ্ছেন।
ঠিক তেমনি ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনায় তিস্তা পানি চুক্তি, গঙ্গার পানি, বর্ডার নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ, বাণিজ্য সহজীকরণ, ডিজেল ও বিদ্যুৎ এগুলোই আলোচনা হবে।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বলে একটা শব্দ বারবার উচ্চারণ হচ্ছে কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্লিপ অব টাং হিসেবে প্রথমে যে শব্দটি বের হয়েছিল “শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন”। বাস্তবতা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেটাই। কারণ তাঁর প্রত্যর্পণ করার সুযোগ কোথায় ভারত সরকারের? তিনি সেখানে তো বন্দী নন, তিনি সম্মানিত রাষ্ট্রীয় অতিথি। তাই প্রত্যর্পণ আইনে যে তিনি পড়েন না সেটা বাংলাদেশের ইউনূস সরকারও বুঝতেন, আর বর্তমান সরকার তো বোঝেই।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত মি. ত্রিবেদী বলেছেন, ইস্যু যত আসে ততই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়। প্রকৃত অর্থে অভিজ্ঞ রাজনীতিকের কথা।
তবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য কিছু ইস্যু তো সমাধান এ মুহূর্তে দরকার। যেমন গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। জ্বালানি মন্ত্রী ভারতকে বলেছেন, ডিজেল দিতে। পশ্চিমবঙ্গে এতদিন মমতা সরকার থাকায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা চুক্তি করতে পারেনি। চুক্তির সবকিছুই করা আছে—এখন শুধু সই করলেই হয়ে যায়। জ্বালানি-বিদ্যুৎ ক্রাইসিস এখন সারা বিশ্বে। তাই সেটা না হয় পরে হলো—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অন্তত যেন তাঁর দেশের মানুষের জন্য তিস্তা চুক্তিটি সই করে আসতে পারেন—এই ইস্যু তো গণতন্ত্রের বিউটি হিসেবে সলভ হতে পারে। আর যাই হোক প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর তিস্তা চুক্তি ছাড়া ফিরে এলে কী সফলতা আসবে? বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের কাছে বাংলাদেশের জনগণ তো স্বাভাবিকভাবে এ আশাটুকু করবে।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 


















