ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সংলাপের অনুপস্থিতিই যেন একটি স্বতন্ত্র নীতি। গত মাসে দুই দেশের ১১৭ জন বিশিষ্ট অধিকারকর্মী ও সাবেক কর্মকর্তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে চিঠি দিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি ছিল স্পষ্ট—অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও পরিবেশসহ বহু অভিন্ন সংকট মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জরুরি।
কিন্তু এই আহ্বানে বাস্তব পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ দিল্লির পক্ষ থেকে সংলাপ বন্ধ রাখাটা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জটিলতার ফল নয়; বরং এটি নিজেই একটি রাজনৈতিক অবস্থান। পাকিস্তানের প্রতি ভারতের বর্তমান মনোভাবের মধ্যে আপস বা নীতিগত পরিবর্তনের কোনো দৃশ্যমান ইঙ্গিত নেই।
সংলাপ ফিরলেও কি বদলাবে সম্পর্ক?
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ইতিহাস বলছে, দুই দেশ কথা বলেছে কি না, তার ওপর সম্পর্কের মৌলিক চরিত্র খুব একটা নির্ভর করেনি। আলোচনার টেবিল খোলা থাকলেও দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও নিরাপত্তা-সংকট বহাল থেকেছে। যেন সম্পর্কটির ভেতরেই দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতার একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে।
তবে এই সম্পর্ক যে চিরকাল এমনই থাকবে, তা নয়। সমস্যাগুলোর জটিলতা যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী দুই দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে ভারতের নীতিগত অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দিল্লিই সাম্প্রতিক সময়ে আনুষ্ঠানিক সংলাপ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পাকিস্তানের প্রতি কঠোর অবস্থান অবশ্য ভারতের জন্য নতুন কিছু নয়। দেশটির অধিকাংশ সরকারই পাকিস্তানকে নিয়ে কঠোর নীতি অনুসরণ করেছে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির আমলে এই অবস্থান নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০১৪ সালে তাঁর ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান নীতিতে কঠোরতা, অনমনীয়তা এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যার সুস্পষ্ট নজির ভারতের আগের সরকারগুলোর মধ্যে খুব কমই দেখা যায়।
জাতীয়তাবাদ, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জনসমর্থন
এই নীতিকে বোঝার জন্য ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকটিও দেখতে হবে। দেশভাগের আগের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, মুসলিম সমাজ ও পাকিস্তান সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাশ্মীরের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত—সবকিছু মিলিয়ে একটি পুরোনো রাজনৈতিক স্মৃতিকে নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হয়েছে।
আফগানিস্তানে দুই দফা যুদ্ধের পর দক্ষিণ এশিয়ায় যে সশস্ত্র জঙ্গিবাদ ও কাশ্মীরকেন্দ্রিক প্রতিরোধের প্রবাহ তৈরি হয়েছে, সেটিও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। একই সঙ্গে এসব ঘটনা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য রাজনৈতিকভাবে কার্যকর একটি পরিবেশ তৈরি করেছে।
জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি সাধারণত ক্ষোভ, ভয় ও নিরাপত্তাহীনতাকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। এ ধরনের রাজনীতি প্রায়ই একটি দৃশ্যমান শত্রু তৈরি করে এবং জনগণের ঐতিহাসিক ক্ষত, অতীতের স্মৃতি ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষাকে উসকে দেয়। মোদি এই প্রক্রিয়াকে আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগ, গণমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কার্যকর ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
সন্ত্রাসী হামলার রাজনৈতিক ব্যবহার
২০১৬ সালের পাঠানকোট হামলার পর থেকে ভারতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাগুলোকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বৃহত্তর রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। নিরাপত্তার বাস্তব উদ্বেগকে ঐতিহাসিক সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে ভারতীয় জনমনে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব আরও কঠোর হয়েছে।

এখানে নিরাপত্তা কেবল নিরাপত্তা নীতির বিষয় থাকেনি; এটি রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠনেরও একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে অনেক সময় সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রশ্ন
সংলাপ এড়িয়ে যাওয়ার আরেকটি দিক হলো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক কাঠামো বজায় রাখতে চেয়েছে, যেখানে দিল্লির প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি থাকবে।
কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেই কাঠামো কার্যকর হয়নি। পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদার রাষ্ট্র হিসেবে কথা বলার অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে দিল্লির জন্য এটি শুধু কূটনৈতিক বিরোধ নয়, আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রশ্নও।
ভারত যদি একটি ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর কূটনৈতিক কিংবা সামরিকভাবে নিজের ইচ্ছা পুরোপুরি চাপিয়ে দিতে না পারে, তাহলে চীনের মতো অনেক বড় শক্তির মোকাবিলায় তার আঞ্চলিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি মোকাবিলা করার বদলে সংলাপের অনুপস্থিতি অনেকটা রাজনৈতিক আড়াল হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে ভারতের একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, সেটিও বজায় থাকে।
কাশ্মীর ও পানি—নতুন বাস্তবতা তৈরির চেষ্টা?
সংলাপ না থাকলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হয় বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষেত্রে। কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত ইতিমধ্যে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা না থাকায় এসব পরিবর্তন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সুযোগও সীমিত থাকে।

পানি নিয়েও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সিন্ধু পানি চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে চুক্তিটি শুধু দ্বিপক্ষীয় বিরোধে চাপ তৈরির উপায় হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ বাস্তবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে চুক্তি স্থগিত বা পরিবর্তনের দায় পাকিস্তানের ওপর চাপানোর প্রচেষ্টাও এই রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও জটিল করেছে। এ ধরনের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যে প্রকৃত আলোচনার জায়গা আরও সংকুচিত হয়।
বৃহত্তর ভূরাজনীতির ছায়া
ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশের বিরোধ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি, ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা—সবকিছুই এই সম্পর্কের ওপর নতুন ভূরাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
বিশ্বব্যবস্থা যখন আরও প্রতিযোগিতামূলক ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে, তখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সীমিত দ্বন্দ্বও বৃহত্তর নিরাপত্তা সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নটি আগের তুলনায় আরও বেশি আন্তর্জাতিক মাত্রা পাচ্ছে।

সংলাপের জন্য পরিবর্তন জরুরি
এই পরিস্থিতিতে শুধু আলোচনার আহ্বান জানালেই হবে না। সংলাপ সফল করতে দুই পক্ষকেই তাদের অবস্থানে পরিবর্তন আনতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ভারতের, কারণ সংলাপ বন্ধ করার উদ্যোগটি মূলত দিল্লির দিক থেকেই এসেছে।
বাস্তবতা হলো, আলোচনার দরজা বন্ধ রেখে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু করাও যথেষ্ট হবে না। যদি পুরোনো অবস্থান, অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক হিসাব অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে নতুন সংলাপও আগের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের সংকট তাই কেবল কাশ্মীর, সন্ত্রাসবাদ, পানি কিংবা সীমান্তের প্রশ্ন নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জনগণের সামনে শত্রুর একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ধারণা তৈরি করার প্রবণতা। এসব জায়গায় পরিবর্তন না এলে সংলাপের দরজা খুললেও তার গন্তব্য হবে আবারও শূন্যের দিকে।
তৌকির হুসেইন 


















