বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা আমদানির সমস্যা কিংবা তীব্র গরমে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে সংকটের অর্ধেক চিত্রই দেখা হবে। এর গভীরে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কতটা কমেছে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা, বিনিয়োগ ও আস্থার সংকট কীভাবে সেই সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে?
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের অনেক ওপরে। অথচ ২০২৬ সালের আগস্টে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ মিলছে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। নেত্রকোনার কিছু এলাকায় গ্রাহক পর্যায়ে ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের তথ্য এসেছে। গোপালগঞ্জে ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে কোনো কোনো সময়ে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না’—এমন নয়। সমস্যা হচ্ছে, প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধ, আমদানি চালু রাখা এবং সেই বিদ্যুৎ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা একসঙ্গে চাপে পড়েছে।
৫ আগস্ট ২০২৪: সংকটের শুরু নয়, কিন্তু বড় মোড়
৫ আগস্ট ২০২৪-কে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের একমাত্র জন্মমুহূর্ত বলা তথ্যগতভাবে ঠিক হবে না। কারণ গ্যাসের ঘাটতি, আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা, বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া, ভর্তুকির চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আগেই তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই পুরোনো দুর্বলতাগুলো নতুন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরবরাহগত বিঘ্ন ঘটায় এবং বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা বাড়ায়। এর প্রভাব রাজস্ব আদায়েও পড়ে।
বিশ্বব্যাংকও ২০২৫ সালের এপ্রিলের মূল্যায়নে বলেছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ঋণ ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; একই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়েছে।
অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সমস্যাটি শুধু সরকার বদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রভাব পড়েছে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায় এবং ব্যবসায়িক আস্থার ওপর।
রাষ্ট্রের আয় কমলে বিদ্যুৎ খাত কেন বিপদে পড়ে?
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস, কয়লা, এলএনজি ও তেল কিনতে হয়। বাংলাদেশের বড় অংশের জ্বালানি আমদানি করতে হয়। সেই আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন।
বৈদেশিক মুদ্রা আসে প্রধানত রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে। একই সঙ্গে সরকারকে বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি আমদানির সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর বকেয়া পরিশোধ করতে হয়।
এখানে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ে → বিনিয়োগ কমে → শিল্প ও আমদানি কমে → অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হয় → কর আদায় কমে → সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা কমে → ভর্তুকি ও বকেয়া পরিশোধে চাপ বাড়ে → বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহকারীদের অর্থপ্রাপ্তি বিলম্বিত হয় → জ্বালানি কেনা কঠিন হয় → বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে → লোডশেডিং বাড়ে → শিল্প উৎপাদন আরও কমে।
এটি একটি ‘দুষ্টচক্র’।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ মূল্যায়ন এই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে সরাসরি তুলে ধরেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-রাজস্ব জিডিপির ৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে যায়। সংস্থাটি বলেছে, দুর্বল কর-অনুবর্তিতা, সরকারি ক্রয়ে বিঘ্ন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রাজস্ব কর্তৃপক্ষের কর্মবিরতির মতো বিষয় এতে ভূমিকা রেখেছে। একই সময়ে বিদ্যুতের ব্যয় পুনরুদ্ধার ঘাটতি ও বকেয়া পরিশোধের কারণে সরকারের বর্তমান ব্যয় বেড়েছে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে সরকারের রাজস্ব সংকটের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
‘সরকারের প্রতি আস্থা নেই’—এর অর্থ কী?
এখানে ‘আস্থা’ বলতে শুধু রাজনৈতিক সমর্থন বোঝায় না। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, ব্যাংক, ঋণদাতা ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আস্থা মানে—একটি সরকার কি দীর্ঘমেয়াদি নীতি ধরে রাখতে পারবে? চুক্তি কি কার্যকর থাকবে? আইনশৃঙ্খলা কি স্থিতিশীল থাকবে? বিনিয়োগ করা অর্থ নিরাপদ থাকবে? বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনা ও ফেরত নেওয়া যাবে? সরকার তার দেনা সময়মতো পরিশোধ করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনিশ্চিত হলে বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করেন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের ২০২৬ সালের বিনিয়োগ পরিবেশ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ এখনও অবকাঠামোগত ঘাটতি, সীমিত অর্থায়ন ব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব, করের সমস্যা ও দুর্নীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই প্রতিবেদনে বিচারব্যবস্থার ধীরগতি এবং চুক্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রে সমস্যার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর কাছে বাংলাদেশের সমস্যা শুধু রাজনৈতিক নয়; রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যখন দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ঝুঁকির মূল্য আরও বেড়ে যায়।
বিনিয়োগ কমলে সরকারের আয়ও কমে
বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালের এপ্রিলেই সতর্ক করেছিল যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ঋণ ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাসও তারা দিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং প্রকৃত হিসাবে তা ঋণাত্মক ছিল। ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা এতটাই গভীর হয়েছে যে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে।
এখানে বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে অর্থনীতির আরেকটি যোগসূত্র তৈরি হয়।
ব্যাংক বিনিয়োগে টাকা দিতে পারছে না → নতুন কারখানা কম হচ্ছে → উৎপাদন কমছে → কর্মসংস্থান ও করযোগ্য আয় কমছে → সরকারের রাজস্ব বাড়ছে না → জ্বালানি আমদানির জন্য সরকারি অর্থের চাপ বাড়ছে → বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা কি বাংলাদেশ পাচ্ছে না?
বাস্তবতা একটু বেশি জটিল।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। বরং বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ উন্নয়ন সহযোগীরা এখনও বাংলাদেশকে সহায়তা করছে। কিন্তু সেই সহায়তা আগের মতো শুধু অর্থ দিয়ে সমস্যাকে ঢেকে রাখার মডেল নয়; এখন আর্থিক সংস্কার, রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, জ্বালানি খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬ সালের জুনে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের জরুরি অর্থায়ন অনুমোদন করে। এর মধ্যে ৭১৩ মিলিয়ন ডলার জরুরি ব্যয়, জীবিকা সহায়তা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানিসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা সচল রাখতে ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ ‘বিশ্ব বাংলাদেশকে কোনো সাহায্য করছে না’—এটি সঠিক নয়।
বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো: বাংলাদেশকে এখন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেই সহায়তা এমন একটি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য, যেখানে রাজস্ব দুর্বল, ব্যাংকিং খাত চাপের মধ্যে এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল আর্থিক দায় জমেছে।
বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া এখন রাষ্ট্রীয় আর্থিক ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের পাঁচটি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মোট লোকসানের প্রায় ৭০ শতাংশের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় ও অপর্যাপ্ত গ্রাহক মূল্য জড়িত ছিল। এর ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বকেয়া জমে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের জন্য জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ সমপরিমাণ ভর্তুকি দিয়েছে; এর প্রায় অর্ধেকই গেছে বকেয়া পরিশোধে।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
কারণ এর অর্থ হলো, সরকার শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য অর্থ খরচ করছে না; পুরোনো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার জমে থাকা দায় মেটাতেও রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ফলে সরকারের হাতে উন্নয়ন, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জ্বালানি আমদানির জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।
ঋণমানও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একটি দেশের ঋণমান আন্তর্জাতিক বাজারে সেই দেশের ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান এখন বিনিয়োগযোগ্য স্তরের অনেক নিচে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এসঅ্যান্ডপি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমান ‘বি প্লাস’ বহাল রেখে দৃষ্টিভঙ্গি ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছে।
এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ বিদেশ থেকে ঋণ পাবে না। বরং অর্থ হলো—বাজারভিত্তিক ঋণ তুলতে গেলে ঝুঁকির মূল্য বেশি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বলেছে, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত খুব কম এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিষেবার পরিমাণ রাজস্বের ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশের সমান ছিল—যা সরকারি অর্থের ওপর অত্যন্ত বড় চাপ সৃষ্টি করে।
এ অবস্থায় সরকার যদি আরও বেশি ঋণ নেয়, তার একটি অংশ দিয়ে পুরোনো ঋণের সুদ ও বকেয়া মেটাতে হবে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে নতুন বিনিয়োগ বা জ্বালানি আমদানির জন্য অর্থের জায়গা আরও সংকুচিত হতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা ও প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে বিদ্যুৎ সংকটও কেন বাড়ে?
বিদ্যুৎ খাত অত্যন্ত বড় একটি অবকাঠামোগত ব্যবস্থা। বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাসক্ষেত্র, এলএনজি টার্মিনাল, কয়লা আমদানি, বন্দর, রেলপথ, জাতীয় গ্রিড, উপকেন্দ্র—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়। কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান। প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীর হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারী নতুন প্রকল্পে ঝুঁকি নিতে চান না। ব্যাংকও ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে ওঠে।
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ হলো—বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই এখন পুলিশি নিরাপত্তা চাইছে। কোথাও ১৭ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে; কোথাও কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
নেত্রকোনায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ এতটাই বেড়েছে যে অফিস ঘেরাও, ভাঙচুর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এখানে সংকটটি একটি পূর্ণ চক্রে পরিণত হচ্ছে:
বিদ্যুৎ নেই → মানুষের ক্ষোভ → আইনশৃঙ্খলার চাপ → প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত → অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত → বিনিয়োগ কমে → রাজস্ব কমে → জ্বালানি কেনার আর্থিক সক্ষমতা কমে → আবার বিদ্যুৎ সংকট।
তবে কি ৫ আগস্টের আগের সবকিছু ভালো ছিল?

না। এই বিশ্লেষণকে সেই অর্থে নেওয়া উচিত হবে না।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা, বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং রাজস্ব-জিডিপির নিম্ন অনুপাত—সবই আগের সময়ের উত্তরাধিকার।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই দুর্বলতাগুলো নতুন অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ভাষায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন ঘটিয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
সুতরাং ৫ আগস্টকে ‘বিদ্যুৎ সংকটের জন্মদিন’ বলা ভুল; বরং বলা যায়, এটি এমন একটি রাজনৈতিক মোড়, যার পর বাংলাদেশের পুরোনো অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আরও দ্রুত প্রকাশ্যে আসে।
সবচেয়ে বড় বিপদ: বিদ্যুৎ সংকট এখন অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের ভয়াবহতা এখানেই।
যদি বিদ্যুৎ না থাকে, শিল্প উৎপাদন কমে। শিল্প উৎপাদন কমলে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রপ্তানি কমলে ডলার কম আসে। ডলার কমলে জ্বালানি আমদানি কঠিন হয়। জ্বালানি কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও কমে।
এটি একটি আত্মবিধ্বংসী অর্থনৈতিক চক্র।
এ কারণেই বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের জরুরি অর্থায়নের একটি অংশ সরাসরি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানির জন্য ব্যবহারযোগ্য করেছে।
তাহলে কি বাংলাদেশ এই সংকট থেকে বের হতে পারবে?
পারবে—কিন্তু শুধু আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে নয়।
সরকারকে একই সঙ্গে পাঁচটি জায়গায় কাজ করতে হবে।
প্রথমত, গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কয়লা ও জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া দ্রুত কমাতে হবে।
চতুর্থত, রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল স্পষ্টভাবে বলছে, বাংলাদেশের নিম্ন রাজস্ব আহরণ রাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার একটি বড় দুর্বলতা।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।
কারণ বিনিয়োগকারীকে শুধু বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে হবে না। তাকে নিশ্চিত করতে হবে—আইন কাজ করবে, চুক্তি কার্যকর হবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিরাপদ থাকবে, বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যাবে এবং সরকার নীতি হঠাৎ বদলাবে না।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বলেছে, সুশাসন ও স্বচ্ছতা উন্নত করা বিনিয়োগ পরিবেশ শক্তিশালী এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পূর্বশর্ত।
শেষ কথা: বাংলাদেশের অন্ধকার আসলে শুধু বিদ্যুতের নয়
আজ যে মানুষটি ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না, তার কাছে বিষয়টি খুব সরল—কারেন্ট নেই।
কিন্তু রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সেই অন্ধকারের পেছনে রয়েছে অনেকগুলো স্তর।
বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই।
জ্বালানি কেনার প্রয়োজন আছে, কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়।
বৈদেশিক মুদ্রা দরকার, কিন্তু রপ্তানি ও বিনিয়োগের গতি কম।
সরকারের টাকা দরকার, কিন্তু রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত দুর্বল।
সরকারকে বকেয়া পরিশোধ করতে হয়, কিন্তু বিদ্যুৎ খাতে আগের বকেয়া জমে আছে।
বিদেশি বিনিয়োগ দরকার, কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি বাড়ায়।
আন্তর্জাতিক সহায়তা দরকার, কিন্তু সেই সহায়তা এখন সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত।
এই কারণেই বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু ‘লোডশেডিং’ বলা যথেষ্ট নয়। এটি একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা, রাজস্ব, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিনিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সংকট।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন এই সংকটের সবকিছুর জন্য এককভাবে দায়ী—এমন প্রমাণ নেই। কিন্তু ওই পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রতিষ্ঠানগত অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগের মন্থরতা ও রাজস্ব দুর্বলতার যে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে, তা পুরোনো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দুর্বলতাকে আরও তীব্র করেছে—এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামনে তাই আসল পরীক্ষা বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ানো নয়; রাষ্ট্রের ওপর আস্থা ফিরিয়ে এনে অর্থনীতিকে এমন অবস্থায় নেওয়া, যাতে সরকার সময়মতো জ্বালানি কিনতে পারে, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে পারে, বকেয়া পরিশোধ করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীকেও বলতে পারে—বাংলাদেশে টাকা বিনিয়োগ করলে তা নিরাপদ।
সেই আস্থা ফিরলে বিদ্যুতের সংকটও ধীরে ধীরে কমবে। আস্থা না ফিরলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও বাংলাদেশকে বারবার একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি কেনার টাকা কোথায়?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















