০৫:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
সিরিয়ার সুয়াইদায় দখলের আতঙ্ক, ‘আমরা জানি তারা আসছে’ উন্নয়নের দৌড়ে আকাশ ছুঁছে মিয়ামির আকাশরেখা, বাড়ছে ঝুঁকির আশঙ্কাও আবর্জনার ঝুড়ি মাথায় পপুলিস্ট নেতার চ্যালেঞ্জার, ব্রিটিশ উপনির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রে ‘কাউন্ট বিনফেস’ ভোটার তালিকায় অভিবাসীদের নাম খুঁজে কঠোর হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন মুসলিম রাজনীতিকদের উত্থানে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষের নতুন ঢেউ দুই রাজনীতি, দুই ইসরায়েল: মার্কিন নির্বাচনে মধ্যপন্থার কঠিন পরীক্ষা অভিবাসন অভিযানে বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ, মার্কিন এজেন্টদের বিরুদ্ধে গুরুতর তথ্য তীব্র তাপপ্রবাহ ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি: ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যে ‘কম আস্থা’ ছিল সিআইএর, তবু বদলানো হয় বিমান বিদ্যুৎমন্ত্রী বললেন, লোডশেডিং কমানোর সুযোগ নেই; গ্যাস সংকটে শিল্পে উৎপাদন ক্ষতি ৪০ শতাংশ

দুই রাজনীতি, দুই ইসরায়েল: মার্কিন নির্বাচনে মধ্যপন্থার কঠিন পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখন এমন এক সময় চলছে, যখন মধ্যপন্থা ক্রমেই দুই বিপরীত মেরুর চাপে সংকুচিত হয়ে আসছে। একদিকে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজমের উত্থান, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রায় প্রশ্নাতীতভাবে সমর্থন করা রিপাবলিকান রাজনীতি—এই দুই প্রবণতা আমেরিকার রাজনৈতিক বিতর্ককে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বাস্তববাদী অবস্থান নেওয়াই সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।

আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল এই ভারসাম্যকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের অবস্থান শুধু একটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী হিসাব নয়; এটি আমেরিকান রাজনীতিতে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, ইহুদি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি সমাধান নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের ভবিষ্যৎ অবস্থানেরও একটি পরীক্ষা।

এল-সাইয়েদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি যেন নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো একটি অংশকে অন্যটির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে না দেন। তিনি একই সঙ্গে ফিলিস্তিনপন্থী, আরব-আমেরিকানদের প্রতিনিধি, মুসলিম ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং ইসরায়েল ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সমর্থক হতে পারেন। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তববাদী অবস্থান।

ইসরায়েল প্রশ্নে স্পষ্টতা কেন জরুরি

The playbook to win Jewish voters in Michigan

মিশিগানের ইহুদি ভোটারদের উদ্দেশে শুধু নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া যথেষ্ট নয়। একজন রাজনীতিক তাদের উপাসনালয় রক্ষা করবেন, ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও মৌলিক প্রশ্ন হলো, ইহুদি জনগণের নিজেদের রাষ্ট্রে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে তিনি স্বীকার করেন কি না।

এল-সাইয়েদ ইতিমধ্যে এমন একটি অবস্থান নিয়েছেন, যা এই বিভাজন অতিক্রম করার সুযোগ তৈরি করে। তিনি বলেছেন, ইসরায়েলি ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য সমানভাবে শান্তি, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকা উচিত। এই বক্তব্যকে সামনে আনা তার জন্য রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

কারণ ইসরায়েলি সরকারের নীতির সমালোচনা করা এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বা ইহুদি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। একইভাবে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে থাকা এবং হামাসের কর্মকাণ্ডকে উপেক্ষা করাও এক বিষয় নয়।

এই পার্থক্যগুলো মুছে ফেলার কারণেই মার্কিন রাজনৈতিক বিতর্ক অনেক সময় বাস্তব সমাধানের বদলে পরিচয়ভিত্তিক সংঘাতে পরিণত হয়।

বামপন্থী রাজনীতির জন্যও আত্মসমালোচনা জরুরি

মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টির বামপন্থী অংশের একটি বড় দুর্বলতা হলো, ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার সময় হামাসের ভূমিকা নিয়ে অনেকেই প্রায় নীরব থাকেন। অথচ হামাস শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি রাজনৈতিক প্রতীক নয়; তার নিজস্ব কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপথে প্রভাব ফেলেছে।

দুই দশকেরও বেশি আগে আরব বিশ্বের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি উদ্যোগ সামনে এসেছিল। ২০০২ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন যুবরাজ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ ইসরায়েলের ১৯৬৭ সালের সীমারেখায় প্রত্যাবর্তনের বিনিময়ে আরব দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাব দেন। পরবর্তী সময়ে বৈরুত সম্মেলনে আরব শান্তি উদ্যোগ গৃহীত হয়, যেখানে দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল।

How Many Arabs Live Between the Jordan River and the Sea? A Mystery No One Wants to Solve - Israel News

কিন্তু সেই সময়ই নেটানিয়ায় একটি হোটেলে পাসওভার অনুষ্ঠানে হামাসের আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৩০ জন নিহত এবং ১৪০ জনের বেশি আহত হন। এই ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ইতিহাসকে শুধু এক পক্ষের সিদ্ধান্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা অবশ্যই করা যায় এবং করা উচিত। বিশেষ করে বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ এবং বেসামরিক মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। কিন্তু হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে একটি কার্যকর শান্তির কাঠামো তৈরি করা সম্ভব নয়।

দুই জনগোষ্ঠীর জন্য দুই রাষ্ট্রই কি বাস্তবসম্মত পথ?

আজ ভূমধ্যসাগর ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে প্রায় সমসংখ্যক ইহুদি ও ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। কোনো একটি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দিয়ে অন্যটির জন্য একচেটিয়া জাতীয় ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এই কারণেই দুই রাষ্ট্র, দুই জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ—এই ধারণাটি এখনো সবচেয়ে বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক ভিত্তিগুলোর একটি। এটি হয়তো সহজ সমাধান নয়। বরং বর্তমান বাস্তবতায় এর পথে বাধা আগের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু বিকল্প হিসেবে যদি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা কল্পনা করা হয় যেখানে শুধু ইহুদিরাই জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখবে, অথবা শুধু ফিলিস্তিনিরাই রাখবে, তাহলে সংঘাতের অবসানের বদলে স্থায়ী সংঘর্ষের সম্ভাবনাই বাড়বে।

শান্তির জন্য প্রয়োজন একচেটিয়া অধিকারের ধারণা প্রত্যাখ্যান করা। ইহুদিদের নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিও অস্বীকার করা যায় না।

এখানেই এল-সাইয়েদের রাজনৈতিক সুযোগ। তিনি যদি ধারাবাহিকভাবে বলেন যে দুই জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ তাদের পারস্পরিক সম্মতিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত, তাহলে তিনি একই সঙ্গে নিজের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান বজায় রাখতে পারেন এবং মধ্যপন্থী ইহুদি ও অন্যান্য ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারেন।

এআইপ্যাক ও মার্কিন রাজনীতির সংকট

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী লবির ভূমিকা। এল-সাইয়েদের প্রাইমারি নির্বাচনে এআইপ্যাকের সুপার প্যাক ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় করে তাকে পরাজিত করার চেষ্টা করেছিল। ফলে তার ক্ষোভ থাকা অস্বাভাবিক নয়।

Israel, anti-Semitism and 2020 fight on display as AIPAC gathers - POLITICO

কিন্তু সেই ক্ষোভ যেন তার রাজনৈতিক বিচারবোধকে নিয়ন্ত্রণ না করে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রিডম্যানের দীর্ঘদিনের সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা এআইপ্যাক সম্পর্কে তার যুক্তি হলো, সংগঠনটি একসময় আমেরিকান স্বার্থ ও মূল্যবোধের সঙ্গে ইসরায়েলপন্থী অবস্থানকে সমন্বয় করার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে। দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান থেকে ইসরায়েলি সরকারের সরে আসা, মার্কিন রাজনীতিতে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে রিপাবলিকান ও ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের ওপর বেশি নির্ভরতা এবং ইরান পরমাণু চুক্তি নিয়ে কঠোর অবস্থান—এসব ক্ষেত্রেই এআইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

বিশেষ করে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যদি এমন বাস্তবতা তৈরি হয় যে ভবিষ্যতে একটি পৃথক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন ভৌগোলিকভাবে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কার্যত অর্থহীন হয়ে যাবে।

তাই ইসরায়েলকে সমর্থন করা মানেই বর্তমান ইসরায়েলি সরকারের প্রতিটি নীতিকে সমর্থন করা নয়। একইভাবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থন করাও হামাসের প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া নয়। এই মৌলিক পার্থক্যটি মার্কিন রাজনৈতিক বিতর্কে যত বেশি স্পষ্ট হবে, ততই বাস্তবসম্মত শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হবে।

মধ্যপন্থার ভোটই শেষ কথা বলতে পারে

মিশিগানের নির্বাচনে এল-সাইয়েদের সামনে তাই একটি কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণ। তাকে একদিকে প্রগতিশীল ও ফিলিস্তিনপন্থী ভোটারদের ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে ইহুদি, মধ্যপন্থী এবং এমন ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে হবে যারা ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারকে সমর্থন করেন কিন্তু বর্তমান ইসরায়েলি সরকারের সব নীতির সঙ্গে একমত নন।

এই অবস্থায় তার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে খুব সরল: ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি—উভয় জনগোষ্ঠীর সমান শান্তি, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে এবং যেকোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতেই হতে হবে।

এতে তার প্রো-ফিলিস্তিনি অবস্থান দুর্বল হয় না। বরং সেটি আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ইহুদি ভোটারদের জন্যও এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে তাদের জনগোষ্ঠীর জাতীয় অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে না।

Abdul El-Sayed wins Michigan's Democratic Senate primary, notching a Midwest victory for the left

অন্যদিকে আমেরিকান ইহুদিদেরও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। ইসরায়েলকে সমর্থন করা এবং একটি নির্দিষ্ট ইসরায়েলি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা এক জিনিস নয়। কোনো লবির রাজনৈতিক ক্ষমতা এতটা বড় হওয়া উচিত নয় যে আমেরিকান ইহুদিদের নিজেদের মূল্যবোধ ও যুক্তিবোধের বাইরে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট সরকারের অবস্থানকে অনুসরণ করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ইসরায়েল বা ফিলিস্তিনের নয়। এটি আমেরিকার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্নও। এমন এক সময়ে যখন মার্কিন রাজনীতি চরম মেরুকরণের দিকে যাচ্ছে, তখন মধ্যপন্থী ও বাস্তববাদী অবস্থান হারিয়ে গেলে তার মূল্য শুধু একটি নির্বাচনে নয়, দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়তে পারে।

এল-সাইয়েদের জন্য তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের পথ হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি বিতর্কে নিজেকে টেনে না নিয়ে একটি নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করা—দুই জনগোষ্ঠীর জন্য দুই রাষ্ট্র, উভয়ের আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং পারস্পরিক সম্মতিতে শান্তির পথ।

তারপর আবার মিশিগানের মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া।

কারণ শেষ পর্যন্ত একজন সিনেট প্রার্থীর দায়িত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে অবস্থান জানানো নয়; তাকে তার নিজের রাজ্যের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রা এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে হবে। আর সেই জায়গাতেই মধ্যপন্থা হয়তো তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সিরিয়ার সুয়াইদায় দখলের আতঙ্ক, ‘আমরা জানি তারা আসছে’

দুই রাজনীতি, দুই ইসরায়েল: মার্কিন নির্বাচনে মধ্যপন্থার কঠিন পরীক্ষা

০৪:০০:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখন এমন এক সময় চলছে, যখন মধ্যপন্থা ক্রমেই দুই বিপরীত মেরুর চাপে সংকুচিত হয়ে আসছে। একদিকে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজমের উত্থান, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রায় প্রশ্নাতীতভাবে সমর্থন করা রিপাবলিকান রাজনীতি—এই দুই প্রবণতা আমেরিকার রাজনৈতিক বিতর্ককে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বাস্তববাদী অবস্থান নেওয়াই সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।

আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল এই ভারসাম্যকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের অবস্থান শুধু একটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী হিসাব নয়; এটি আমেরিকান রাজনীতিতে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, ইহুদি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি সমাধান নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের ভবিষ্যৎ অবস্থানেরও একটি পরীক্ষা।

এল-সাইয়েদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি যেন নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো একটি অংশকে অন্যটির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে না দেন। তিনি একই সঙ্গে ফিলিস্তিনপন্থী, আরব-আমেরিকানদের প্রতিনিধি, মুসলিম ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং ইসরায়েল ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সমর্থক হতে পারেন। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তববাদী অবস্থান।

ইসরায়েল প্রশ্নে স্পষ্টতা কেন জরুরি

The playbook to win Jewish voters in Michigan

মিশিগানের ইহুদি ভোটারদের উদ্দেশে শুধু নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া যথেষ্ট নয়। একজন রাজনীতিক তাদের উপাসনালয় রক্ষা করবেন, ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও মৌলিক প্রশ্ন হলো, ইহুদি জনগণের নিজেদের রাষ্ট্রে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে তিনি স্বীকার করেন কি না।

এল-সাইয়েদ ইতিমধ্যে এমন একটি অবস্থান নিয়েছেন, যা এই বিভাজন অতিক্রম করার সুযোগ তৈরি করে। তিনি বলেছেন, ইসরায়েলি ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য সমানভাবে শান্তি, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকা উচিত। এই বক্তব্যকে সামনে আনা তার জন্য রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

কারণ ইসরায়েলি সরকারের নীতির সমালোচনা করা এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বা ইহুদি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। একইভাবে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে থাকা এবং হামাসের কর্মকাণ্ডকে উপেক্ষা করাও এক বিষয় নয়।

এই পার্থক্যগুলো মুছে ফেলার কারণেই মার্কিন রাজনৈতিক বিতর্ক অনেক সময় বাস্তব সমাধানের বদলে পরিচয়ভিত্তিক সংঘাতে পরিণত হয়।

বামপন্থী রাজনীতির জন্যও আত্মসমালোচনা জরুরি

মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টির বামপন্থী অংশের একটি বড় দুর্বলতা হলো, ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার সময় হামাসের ভূমিকা নিয়ে অনেকেই প্রায় নীরব থাকেন। অথচ হামাস শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি রাজনৈতিক প্রতীক নয়; তার নিজস্ব কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপথে প্রভাব ফেলেছে।

দুই দশকেরও বেশি আগে আরব বিশ্বের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি উদ্যোগ সামনে এসেছিল। ২০০২ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন যুবরাজ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ ইসরায়েলের ১৯৬৭ সালের সীমারেখায় প্রত্যাবর্তনের বিনিময়ে আরব দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাব দেন। পরবর্তী সময়ে বৈরুত সম্মেলনে আরব শান্তি উদ্যোগ গৃহীত হয়, যেখানে দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল।

How Many Arabs Live Between the Jordan River and the Sea? A Mystery No One Wants to Solve - Israel News

কিন্তু সেই সময়ই নেটানিয়ায় একটি হোটেলে পাসওভার অনুষ্ঠানে হামাসের আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৩০ জন নিহত এবং ১৪০ জনের বেশি আহত হন। এই ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ইতিহাসকে শুধু এক পক্ষের সিদ্ধান্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা অবশ্যই করা যায় এবং করা উচিত। বিশেষ করে বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ এবং বেসামরিক মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। কিন্তু হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে একটি কার্যকর শান্তির কাঠামো তৈরি করা সম্ভব নয়।

দুই জনগোষ্ঠীর জন্য দুই রাষ্ট্রই কি বাস্তবসম্মত পথ?

আজ ভূমধ্যসাগর ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে প্রায় সমসংখ্যক ইহুদি ও ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। কোনো একটি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দিয়ে অন্যটির জন্য একচেটিয়া জাতীয় ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এই কারণেই দুই রাষ্ট্র, দুই জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ—এই ধারণাটি এখনো সবচেয়ে বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক ভিত্তিগুলোর একটি। এটি হয়তো সহজ সমাধান নয়। বরং বর্তমান বাস্তবতায় এর পথে বাধা আগের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু বিকল্প হিসেবে যদি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা কল্পনা করা হয় যেখানে শুধু ইহুদিরাই জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখবে, অথবা শুধু ফিলিস্তিনিরাই রাখবে, তাহলে সংঘাতের অবসানের বদলে স্থায়ী সংঘর্ষের সম্ভাবনাই বাড়বে।

শান্তির জন্য প্রয়োজন একচেটিয়া অধিকারের ধারণা প্রত্যাখ্যান করা। ইহুদিদের নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিও অস্বীকার করা যায় না।

এখানেই এল-সাইয়েদের রাজনৈতিক সুযোগ। তিনি যদি ধারাবাহিকভাবে বলেন যে দুই জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ তাদের পারস্পরিক সম্মতিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত, তাহলে তিনি একই সঙ্গে নিজের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান বজায় রাখতে পারেন এবং মধ্যপন্থী ইহুদি ও অন্যান্য ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারেন।

এআইপ্যাক ও মার্কিন রাজনীতির সংকট

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী লবির ভূমিকা। এল-সাইয়েদের প্রাইমারি নির্বাচনে এআইপ্যাকের সুপার প্যাক ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় করে তাকে পরাজিত করার চেষ্টা করেছিল। ফলে তার ক্ষোভ থাকা অস্বাভাবিক নয়।

Israel, anti-Semitism and 2020 fight on display as AIPAC gathers - POLITICO

কিন্তু সেই ক্ষোভ যেন তার রাজনৈতিক বিচারবোধকে নিয়ন্ত্রণ না করে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রিডম্যানের দীর্ঘদিনের সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা এআইপ্যাক সম্পর্কে তার যুক্তি হলো, সংগঠনটি একসময় আমেরিকান স্বার্থ ও মূল্যবোধের সঙ্গে ইসরায়েলপন্থী অবস্থানকে সমন্বয় করার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে। দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান থেকে ইসরায়েলি সরকারের সরে আসা, মার্কিন রাজনীতিতে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে রিপাবলিকান ও ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের ওপর বেশি নির্ভরতা এবং ইরান পরমাণু চুক্তি নিয়ে কঠোর অবস্থান—এসব ক্ষেত্রেই এআইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

বিশেষ করে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যদি এমন বাস্তবতা তৈরি হয় যে ভবিষ্যতে একটি পৃথক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন ভৌগোলিকভাবে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কার্যত অর্থহীন হয়ে যাবে।

তাই ইসরায়েলকে সমর্থন করা মানেই বর্তমান ইসরায়েলি সরকারের প্রতিটি নীতিকে সমর্থন করা নয়। একইভাবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থন করাও হামাসের প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া নয়। এই মৌলিক পার্থক্যটি মার্কিন রাজনৈতিক বিতর্কে যত বেশি স্পষ্ট হবে, ততই বাস্তবসম্মত শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হবে।

মধ্যপন্থার ভোটই শেষ কথা বলতে পারে

মিশিগানের নির্বাচনে এল-সাইয়েদের সামনে তাই একটি কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণ। তাকে একদিকে প্রগতিশীল ও ফিলিস্তিনপন্থী ভোটারদের ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে ইহুদি, মধ্যপন্থী এবং এমন ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে হবে যারা ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারকে সমর্থন করেন কিন্তু বর্তমান ইসরায়েলি সরকারের সব নীতির সঙ্গে একমত নন।

এই অবস্থায় তার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে খুব সরল: ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি—উভয় জনগোষ্ঠীর সমান শান্তি, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে এবং যেকোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতেই হতে হবে।

এতে তার প্রো-ফিলিস্তিনি অবস্থান দুর্বল হয় না। বরং সেটি আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ইহুদি ভোটারদের জন্যও এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে তাদের জনগোষ্ঠীর জাতীয় অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে না।

Abdul El-Sayed wins Michigan's Democratic Senate primary, notching a Midwest victory for the left

অন্যদিকে আমেরিকান ইহুদিদেরও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। ইসরায়েলকে সমর্থন করা এবং একটি নির্দিষ্ট ইসরায়েলি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা এক জিনিস নয়। কোনো লবির রাজনৈতিক ক্ষমতা এতটা বড় হওয়া উচিত নয় যে আমেরিকান ইহুদিদের নিজেদের মূল্যবোধ ও যুক্তিবোধের বাইরে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট সরকারের অবস্থানকে অনুসরণ করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ইসরায়েল বা ফিলিস্তিনের নয়। এটি আমেরিকার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্নও। এমন এক সময়ে যখন মার্কিন রাজনীতি চরম মেরুকরণের দিকে যাচ্ছে, তখন মধ্যপন্থী ও বাস্তববাদী অবস্থান হারিয়ে গেলে তার মূল্য শুধু একটি নির্বাচনে নয়, দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়তে পারে।

এল-সাইয়েদের জন্য তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের পথ হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি বিতর্কে নিজেকে টেনে না নিয়ে একটি নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করা—দুই জনগোষ্ঠীর জন্য দুই রাষ্ট্র, উভয়ের আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং পারস্পরিক সম্মতিতে শান্তির পথ।

তারপর আবার মিশিগানের মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া।

কারণ শেষ পর্যন্ত একজন সিনেট প্রার্থীর দায়িত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে অবস্থান জানানো নয়; তাকে তার নিজের রাজ্যের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রা এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে হবে। আর সেই জায়গাতেই মধ্যপন্থা হয়তো তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।