ভারতের স্বাধীনতার অন্যতম সাহসী অঙ্গীকার ছিল—রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকের পরিচয় নির্ধারিত হবে না তার জাত, ধর্ম, শ্রেণি, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা লিঙ্গ দিয়ে। স্বাধীনতার মুহূর্তে এই প্রতিশ্রুতি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দেশ তখন বিভাজনের ক্ষত, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং সীমাহীন অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল। তবু নতুন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সামনে যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন রেখেছিল, তার কেন্দ্রে ছিল সমতা।
আজ, স্বাধীনতার ৭৯ বছর পর, সেই অঙ্গীকারের বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে গত মাসে জন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আয়োজিত বিক্ষোভের পর নারী অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে যে অনলাইন আক্রমণ, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং যৌন সহিংসতার হুমকি দেখা গেছে, তা শুধু একটি রাজনৈতিক বিরোধের ঘটনা নয়। এটি গণতন্ত্রে নারীর সমান নাগরিকত্ব কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
নাম পরিচয়ের অধিকার থেকে ভোটের সমতা
স্বাধীনতার আগে ভারতীয় নারীর জন্য নিজের নামে রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করাও সহজ ছিল না। ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতির সময় নির্বাচন কমিশনের কর্মীদের সামনে বড় একটি সমস্যা দেখা দেয়। বিপুলসংখ্যক নারী নিজেদের ব্যক্তিগত নামে নিবন্ধিত হতে চাইছিলেন না; তারা নিজেদের পরিচয় দিতেন কারও মেয়ে, স্ত্রী বা পরিবারের অন্য কোনো পুরুষ সদস্যের সূত্রে।
নির্বাচন কমিশন তখন তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিল—ভোটার হিসেবে নারীর পরিচয় তার নিজের। তিনি কারও স্ত্রী বা কন্যা হিসেবে নয়, একজন স্বতন্ত্র নাগরিক হিসেবে ভোট দেবেন। এই কাজ ছিল বিশাল প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত প্রায় ২৮ লাখ নারী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন, কারণ তারা নিজেদের নামে পরিচিত হতে রাজি হননি।
কিন্তু সেই সময়ের রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন ছিল। নারীকে ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তাকে নিজের নামে, নিজের সিদ্ধান্তে এবং নিজের নাগরিক পরিচয়ে রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
ভারত সেই পথেই ধীরে ধীরে এগিয়েছে। ২০১৯ সালে নারী ও পুরুষের ভোটদানের ব্যবধান কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একসময় যে নারীকে পরিবারের পুরুষের পরিচয়ের মাধ্যমে শনাক্ত করা হতো, তিনি এখন নিজস্ব রাজনৈতিক পছন্দ ও নাগরিক অধিকারের অধিকারী।
কিন্তু সেই অর্জনই আজ নতুন ধরনের আক্রমণের মুখে পড়ছে।
নারীর জন্য আলাদা নৈতিক মানদণ্ড কেন?
জন্তর মন্তরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন নারী পরবর্তী সময়ে অনলাইনে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হন। তাদের নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অশ্লীল গালাগালি এবং ভয়াবহ হুমকি।
এখানে সমস্যাটি শুধু অনলাইন হয়রানি নয়। প্রশ্ন হলো, একই রাজনৈতিক আচরণের মূল্যায়নে নারী ও পুরুষের জন্য কি আলাদা মানদণ্ড তৈরি করা হচ্ছে?
৩১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী একটি ইনস্টাগ্রাম রিলে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নারীদের ‘ভুলপথে পরিচালিত কন্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের ক্ষমা করার কথা বলেন। যারা তার বিরুদ্ধে বা তাকে উদ্দেশ করে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তাদের আচরণকে নারীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। অথচ একই ধরনের ভাষা ব্যবহারকারী পুরুষদের নিয়ে একই মাত্রার নৈতিক বিচার সামনে আসেনি।
এখানেই গণতান্ত্রিক সমতার প্রশ্নটি আরও গভীর হয়ে ওঠে। একজন নারী যদি পুরুষের মতোই রাজনৈতিক প্রতিবাদ করেন, একই ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং একই দাবি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ান, তবে তাকে কেন আলাদা সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বিচার করা হবে?
নারী নাগরিককে ‘কন্যা’ হিসেবে দেখার এই প্রবণতা আপাতদৃষ্টিতে স্নেহপূর্ণ মনে হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে এর মধ্যে পিতৃতান্ত্রিকতার একটি স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ভোটার, প্রতিবাদকারী কিংবা রাজনৈতিক নাগরিক—তার নিজের মতামত ও সিদ্ধান্তের জন্য তাকে অভিভাবকসুলভ পরামর্শের প্রয়োজন আছে, এমন ধারণা সমতার ধারণার সঙ্গে সহজে মেলে না।
প্রতিবাদকে ব্যক্তিগত অপমান বানানোর ঝুঁকি
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিবাদ কখনও আরামদায়ক বিষয় নয়। প্রতিবাদে উত্তেজনা থাকতে পারে, কঠোর ভাষা থাকতে পারে, এমনকি এমন আচরণও থাকতে পারে যা অনেকের কাছে আপত্তিকর। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই রাজনৈতিক মতবিরোধকে ব্যক্তিগত শত্রুতা হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা।
জন্তর মন্তরের ঘটনাকে ব্যক্তিগত আঘাত বা ব্যক্তিগত অসম্মানের জায়গা থেকে দেখলে মূল রাজনৈতিক প্রশ্নটি আড়ালে চলে যায়। তখন প্রতিবাদকারীদের দাবি, তাদের অসন্তোষ এবং তারা যে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্ন তুলেছেন—এসবের পরিবর্তে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে কে কাকে কী বলেছে।
এ ধরনের পরিবর্তন গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক ব্যক্তিগত আনুগত্যের ওপর নয়, জবাবদিহির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
আরও উদ্বেগজনক হলো, অনলাইনে যে ধরনের আক্রমণ নারী বিক্ষোভকারীদের মোকাবিলা করতে হয়েছে, তার মধ্যে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকিও ছিল। রাজনৈতিক মতের বিরোধিতা যখন নারীর শরীর ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সহিংসতার ভাষায় রূপ নেয়, তখন সেটিকে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসভ্যতা বলে পাশ কাটানো যায় না। এটি নাগরিক স্বাধীনতা এবং নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—দুই ক্ষেত্রেই সরাসরি হুমকি।
স্বাধীনতার স্বপ্নকে ছোট হতে দেওয়া যাবে না
ভারতের স্বাধীনতার পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সময় রাষ্ট্র দরজায় দরজায় গিয়ে নারীদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত করার চেষ্টা করেছিল। তখন লক্ষ্য ছিল তাদের বাদ দেওয়া নয়, অন্তর্ভুক্ত করা। আজকের গণতান্ত্রিক ভারত সেই ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে কতটা দূরে সরে যাচ্ছে, সেটিই ভাবার বিষয়।
নারীর নিজের নামে পরিচিত হওয়ার অধিকার একসময় ছিল রাজনৈতিক সমতার ভিত্তি। সেই নামই যদি আজ তাকে অনলাইনে হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, হুমকি কিংবা সামাজিক অপমানের লক্ষ্য বানিয়ে দেয়, তাহলে অর্জিত সমতার ভিত কোথায় দাঁড়িয়ে আছে—এই প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই।
ভারত স্বাধীনতার পর বহু কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে টিকে গেছে। দারিদ্র্য, বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নানা বৈপরীত্য সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে তার যাত্রা থেমে যায়নি। সেই যাত্রার শক্তি ছিল একটি সহজ বিশ্বাস—ভবিষ্যৎ আরও ভালো হতে পারে এবং রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সমান মর্যাদা দেবে।
এই বিশ্বাস কেবল সংবিধানের পাতায় থাকা কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নয়। এটি প্রতিদিনের রাজনৈতিক আচরণে, প্রতিবাদের অধিকার রক্ষায়, নারীর নিজস্ব পরিচয় স্বীকারে এবং ভিন্নমতকে সহ্য করার সক্ষমতায় প্রকাশ পায়।
স্বাধীনতার ৭৯তম বছরে ভারতের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু নারীর নিরাপত্তা বা অনলাইন হয়রানি নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, যে সমতার স্বপ্ন স্বাধীনতার শুরুতে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়েছিল, সেই স্বপ্নকে কি বাস্তব রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও সমানভাবে রক্ষা করা হবে?
সেই প্রতিশ্রুতি দুর্বল হলে ক্ষতি শুধু নারীর হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতীয় গণতন্ত্রের সেই মৌলিক ধারণা—প্রত্যেক নাগরিক নিজের নামে, নিজের কণ্ঠে এবং নিজের অধিকারে রাষ্ট্রের সমান অংশীদার।
প্রিয়ানজলি মালিক 



















