ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পে নাইকির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে সুইস ক্রীড়া জুতা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘অন’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরিচিত মুখের এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন তারকার পৃষ্ঠপোষকতা বদলের ঘটনা নয়, বরং ক্রীড়া সামগ্রীর বাজারে নাইকির প্রতিদ্বন্দ্বীরা কতটা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে, সেই বিষয়টিও সামনে এনেছে।
এমবাপ্পে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে ১০ গোল করেন। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২—যা রেকর্ড। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই তিনি ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফলে তাঁর মতো একজন খেলোয়াড়ের ব্র্যান্ড পরিবর্তন ক্রীড়া সামগ্রীর বাজারে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।
তবে এমবাপ্পে নাইকি ছেড়েছেন কোম্পানিটির আর্থিক দুর্বলতার কারণে—এমনটা বলা হচ্ছে না। বরং ‘অন’ তাঁকে চুক্তির পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ এবং কোম্পানির শেয়ার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এমবাপ্পেকে দলে টানতে ‘অন’ যে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত, এই সিদ্ধান্ত তারই ইঙ্গিত।
এতদিন মূলত দৌড়ের জুতার জন্য পরিচিত ‘অন’ এখন ফুটবলের মতো বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোর একটি বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। আর সেই বিস্তারের জন্য এমবাপ্পের মতো আন্তর্জাতিক তারকাকে বেছে নেওয়া প্রতিষ্ঠানটির উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয়টি স্পষ্ট করছে।
নাইকির জন্য একের পর এক চাপ
এমবাপ্পের বিদায়ের সময়ই নাইকি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। দীর্ঘ পতনের পর প্রতিষ্ঠানটি এসঅ্যান্ডপি ১০০ সূচক থেকে বাদ পড়ছে। ২০০৮ সাল থেকে এই সূচকের সদস্য থাকার পর এবার এআই-ভিত্তিক ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি কোম্পানি জায়গা করে নিচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাইকির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সমস্যাগুলোও। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এলিয়ট হিলকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটিকে ঘুরে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে। এর আগে সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার কৌশল নিয়ে কোম্পানিটি সমস্যায় পড়েছিল। হিল দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্রীড়া পোশাক ও দৌড়ের জুতার ব্যবসায় নতুন করে জোর দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বিশেষ করে দৌড়ের জুতার বাজারে ‘অন’ ও ‘হোকা’র মতো ব্র্যান্ড দ্রুত পরিচিতি বাড়িয়েছে। একসময় যেসব প্রতিষ্ঠানকে তুলনামূলক ছোট বা বিশেষায়িত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হতো, তারাই এখন নাইকির বাজারে চাপ তৈরি করছে।
চীনের বাজারেও চ্যালেঞ্জ
নাইকির জন্য আরেকটি বড় সমস্যা চীনের বাজার। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বাজারে স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। এর ফলে নাইকির বিক্রিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
কোম্পানির সাম্প্রতিক পূর্বাভাসও বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা দেয়নি। এ বছরের এপ্রিলে নাইকি জানিয়েছিল, পরবর্তী প্রান্তিকের পাশাপাশি পুরো ২০২৬ সালেও বিক্রি কমতে পারে। এর পর ওয়াল স্ট্রিটে বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক কোম্পানিটির বিষয়ে তাদের মূল্যায়ন কমিয়ে দেন।
সেই ঘোষণার দিন নাইকির শেয়ারের দাম প্রায় ১৬ শতাংশ কমে যায় এবং ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। পরে দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশের সময় কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ম্যাট ফ্রেন্ডও জানান, আগামী ছয় মাসে ব্যবসার পরিবেশে বড় ধরনের উন্নতির প্রত্যাশা করছে না প্রতিষ্ঠানটি।
সব মিলিয়ে নাইকির শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্সেও এই চাপের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
নতুন প্রজন্মকে কাছে টানার চেষ্টা
এই পরিস্থিতিতে নাইকি পরিচালনা পর্ষদেও নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা যুক্ত করছে। গত সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটির বোর্ডে নিয়োগ পেয়েছেন আলেক্সান্দ্র আরনো। ৩৪ বছর বয়সী আরনো বিলাসপণ্য প্রতিষ্ঠান এলভিএমএইচের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী বার্নার্ড আরনোর ছেলে।
আলেক্সান্দ্র বর্তমানে এলভিএমএইচের ওয়াইন ও স্পিরিটস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এর আগে তিনি জার্মান লাগেজ প্রস্তুতকারক রিমোয়ার ব্যবসায়িক পুনর্গঠনে কাজ করেছিলেন, যে পরিবর্তনকে সফল হিসেবে দেখা হয়।
তাঁকে বোর্ডে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে নাইকি নতুন প্রজন্মের ভোক্তা, ব্র্যান্ড এবং ব্যবসায়িক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামনে বড় প্রশ্ন
নাইকির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ক্রীড়া ব্র্যান্ডটি কীভাবে আবার তার পুরোনো গতি ফিরিয়ে আনবে।
এমবাপ্পের মতো তারকার চলে যাওয়া এককভাবে নাইকির আর্থিক সমস্যার কারণ নয়। কিন্তু ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ‘অন’ ও ‘হোকা’র মতো প্রতিদ্বন্দ্বীরা বাজারে নিজেদের জায়গা বাড়াচ্ছে, চীনে স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো শক্তিশালী হচ্ছে এবং নাইকির বিক্রি ও শেয়ারদর নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ রয়েছে।
ফলে এমবাপ্পের ‘অন’-এ যোগদানের ঘটনা নাইকির জন্য একটি প্রতীকী বার্তা হয়ে উঠেছে। ক্রীড়া সামগ্রীর বাজারে শুধু পণ্যের বিক্রি নয়, তারকা খেলোয়াড়, তরুণ ক্রেতা এবং ব্র্যান্ডের সাংস্কৃতিক প্রভাব—সব ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা বাড়ছে। নাইকিকে এখন প্রমাণ করতে হবে, পরবর্তী প্রজন্মের ক্রীড়াবিদ ও ক্রেতাদের কাছে তারা এখনও আগের মতো আকর্ষণীয় অবস্থান ধরে রাখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















