যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের পর ইরান নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত হয়েছে বলে নতুন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরির কথাও ভাবতে পারে।
গত কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে হামলা চালিয়ে সামরিক সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক হত্যা করেছে। যদিও সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্রা এখনো সীমিত, মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইরানের আরও বড় পদক্ষেপের সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন মূল্যায়ন
মার্কিন কর্মকর্তাদের ব্রিফ করা গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাসের বিচ্ছিন্ন ও পাল্টাপাল্টি সংঘাত ইরানকে নিজেদের সামরিক শক্তি সম্পর্কে আরও বাস্তবসম্মত ধারণা দিয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও দেশটির নেতৃত্ব এখন নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে আগের তুলনায় বেশি আত্মবিশ্বাসী।
মার্কিন কংগ্রেসের গোয়েন্দা কমিটির সদস্য জেসন ক্রো বলেন, ইরান উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়লেও দেশটির নেতৃত্ব মনে করে, তারা সেই ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অনুসরণ করছে। তার মতে, ইরানের নেতৃত্ব এখন তুলনামূলকভাবে বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং দেশটির কাছে এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের বাড়তি চাপ
গোয়েন্দা মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে ইরান এখন আরও স্পষ্ট ধারণা অর্জন করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ইরান মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বড় ধরনের নতুন হামলা চালাতে গিয়ে চাপের মুখে পড়তে পারে, বিশেষ করে মার্কিন গোলাবারুদের মজুত কমে আসায়। ফলে তেহরান সংঘাত দীর্ঘায়িত করার সুযোগ দেখছে।
নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে চাপে রাখার চেষ্টা
কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন, অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত যুদ্ধ টেনে নেওয়ার ব্যাপারে ইরানের আগ্রহ থাকতে পারে। হরমুজ প্রণালির ওপর বিধিনিষেধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে বলে তেহরান মনে করছে।
ইরান-সংশ্লিষ্ট প্রচার তৎপরতারও ইঙ্গিত মিলেছে। মেটা সম্প্রতি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ইরান থেকে পরিচালিত একটি ছোট নেটওয়ার্কের কথা জানিয়েছে, যেখানে মার্কিন রাজনীতি নিয়ে পোস্ট করা হচ্ছিল। কিছু কনটেন্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি এবং সেখানে রিপাবলিকানবিরোধী বক্তব্য ছিল।
সাইবার হামলার ঝুঁকিও থাকছে

ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের বিরুদ্ধে জুলাইয়ের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক পানি ব্যবস্থায় সাইবার হামলার অভিযোগ উঠেছিল। এসব হামলায় কোনো পানি ব্যবস্থা পান করার জন্য অনিরাপদ হয়ে পড়েনি। তবে কিছু ক্ষেত্রে কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ নিতে হয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতেও আগ্রহ দেখিয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো জ্বালানি অবকাঠামো সফলভাবে আক্রান্ত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে যুদ্ধের প্রতি মার্কিন জনসমর্থন দুর্বল করতে সাইবার হামলা ইরানের জন্য কার্যকর হাতিয়ার হয়ে থাকতে পারে।
ট্রাম্প আপাতত আলোচনায় নেই
ট্রাম্প এখনই আলোচনার পথে এগোচ্ছেন না। তিনি মনে করছেন, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে হরমুজ প্রণালি ও ভবিষ্যতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, স্বল্পমেয়াদে নিষেধাজ্ঞার চাপ বরং ইরানের পাল্টা উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প দ্রুত ও decisive বিজয়ের প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু ছয় মাস পর মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে ইরানের স্থিতিস্থাপকতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে বেশি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি বা স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তারা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















