ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে যখন আকাশে রুশ ড্রোন হামলার সতর্কসংকেত বাজছে, তখনও একটি প্রসূতি হাসপাতালে থেমে নেই জীবনের স্বাভাবিক আয়োজন। চারদিকে যুদ্ধের ভয়, আকাশপথে হামলার আশঙ্কা—তার মধ্যেই মায়ের কোল আলো করে জন্ম নিচ্ছে নতুন শিশু।
৩২ বছর বয়সী আলিয়োনা বোহাতিরেঙ্কো এমনই এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। হাসপাতালে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর কোলে নবজাতক মেয়েকে নিয়ে তিনি বলেন, “আমি বিমান হামলার সতর্কসংকেতের মধ্যেই সন্তান জন্ম দিয়েছি!” তাঁর কথায় ছিল বিস্ময়, আবার এক ধরনের অভ্যস্ততাও। তাঁর কাছে যুদ্ধের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়া স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু দীর্ঘদিনের হামলার কারণে এমন পরিস্থিতির সঙ্গেও মানুষ যেন ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সতর্কসংকেতের মধ্যেই প্রসব
কিয়েভের একটি সরকারি প্রসূতি হাসপাতালে চিকিৎসকেরা ঝুঁকি নিয়েই বোহাতিরেঙ্কোর সন্তান প্রসব করান। তখন শহরের আকাশে রুশ ড্রোন হামলার আশঙ্কা ছিল। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর প্রসবের শেষ সময়ে হাসপাতালের আশপাশে কোনো বিস্ফোরণ ঘটেনি।
একই হাসপাতালে গত বুধবার ২৬ বছর বয়সী ইউলিয়া ইশচুকও সন্তান জন্ম দেন। তাঁর স্বামী ভিতালি ইশচুক একজন সেনাসদস্য। তিনি জানান, রাত তিনটার দিকে ইউলিয়ার প্রসববেদনা শুরু হলে তাঁরা বুঝতে পারেন সন্তান পৃথিবীতে আসার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতিতে কিছুই প্রস্তুত ছিল না।
বাইরে তখন হামলা চলছিল। তাঁদের মনে হয়েছিল, বাড়িটি হয়তো ধ্বংস হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন এবং হাসপাতালে পৌঁছাতে সক্ষম হন। সেখানেই নিরাপদে জন্ম নেয় তাঁদের সন্তান ইয়ারোস্লাভ।
কিয়েভে দিন-রাত হামলার আতঙ্ক
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে আকাশপথের হামলা এখন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গত আগস্টের শেষ দিক থেকে কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় হামলা প্রায় সার্বক্ষণিক হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে রাতের বেলায় হামলা বেশি হতো, এখন দিনের বিভিন্ন সময়েও আকাশে ড্রোনের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
এর ফলে কয়েক লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ, পানি ও গরমের ব্যবস্থা নিয়েও তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্বেগ। শীত ঘনিয়ে এলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাশিয়া দাবি করছে, তাদের হামলার লক্ষ্য সামরিক স্থাপনা। অন্যদিকে ইউক্রেনের অভিযোগ, এসব হামলার উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং সরকারকে ভূখণ্ড ছাড়তে বাধ্য করা।
সন্তান জন্মের পরও নিরাপত্তার চিন্তা
যুদ্ধের কারণে নবজাতক সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ কোথায় কাটাবেন, সেই প্রশ্নও এখন নতুন বাবা-মায়ের সামনে।
ইউলিয়ার স্বামী ভিতালি বলেন, তাঁদের এমন একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে হবে যেখানে সত্যিকার অর্থে নিরাপত্তা পাওয়া যায়। শুধু কোনো স্কুল বা দোকানের নিচের বেসমেন্টকে আশ্রয়কেন্দ্র বলা যায় না।
আলিয়োনাও বলছেন, ছোট সন্তানকে নিয়ে কিয়েভে শীত কাটানো কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়ে তাঁরা ভাবছেন। বিদেশে চলে যাওয়ার কথা তিনি এখনই ভাবছেন না। তবে শীতের পরিস্থিতি দেখে অন্য কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
“কেউ সন্তান জন্ম দিতে চায় না”
যুদ্ধ শুধু মানুষের বর্তমান জীবনকেই বদলে দিচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ নিয়েও মানুষের সিদ্ধান্ত।
হাসপাতালে নতুন করে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজলে কয়েকজন গর্ভবতী নারী তাঁদের স্বামী বা সঙ্গীদের সঙ্গে নিচের আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান। ২৯ বছর বয়সী ইউলিয়া কুখার বলেন, প্রসূতি বিভাগে তিনি খুব অল্প কয়েকজন নারীকে দেখেছেন।
তাঁর কথায় যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—“কেউ সন্তান জন্ম দিতে চায় না।”
কুখার নিজে তৃতীয় সন্তানের মা হতে চলেছেন। তাঁর আগের দুটি সন্তান মেয়ে। একসময় তিনি ছেলে সন্তান চেয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা তাঁকে সেই ইচ্ছা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কারণ ছেলে বড় হলে তাকে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
যুদ্ধের ভয় তাই শুধু আজকের বিস্ফোরণ বা ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের পরিবার পরিকল্পনা, সন্তান জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়েও।
ইউক্রেন এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা সংকটের মুখে। অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে যুদ্ধের আগেই দেশটিতে জন্মহার কমছিল। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেনাবাহিনীতে পুরুষদের যোগদান, নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
তবু যুদ্ধের মধ্যেও শিশুর জন্ম থেমে নেই। বোমার শব্দ, সতর্কসংকেত আর অনিশ্চয়তার মাঝেও কিয়েভের হাসপাতালগুলোতে নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আসছে। এসব শিশু যেন ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যেও মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছা ও ভবিষ্যতের আশার এক নীরব প্রতীক হয়ে উঠছে।
যুদ্ধ যেখানে জীবন কেড়ে নিচ্ছে, সেখানেই কিছু মানুষ নতুন জীবনকে পৃথিবীতে স্বাগত জানাচ্ছেন—আকাশে হামলার সতর্কসংকেত বেজে উঠলেও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















