ইরান আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উপসাগরে একটি নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চল ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি নৌপথের মানচিত্রও প্রকাশ করা হবে। এর মধ্যেই সপ্তাহান্তে জাহাজকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার খবরের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বেড়েছে।
নিষিদ্ধ অঞ্চলে ঢুকলেই নিষেধাজ্ঞা
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই বলেছেন, নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চলটি শুরু হবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যকর হওয়া এলাকা থেকে এবং উপসাগরের আরও কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
নতুন এই এলাকায় প্রবেশ করা যেকোনো জাহাজকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা হবে বলে তিনি জানান। তবে নতুন অঞ্চলটির সঠিক সীমা বা অন্যান্য নিয়ম সম্পর্কে ইরান এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
হরমুজে নতুন নৌপথ
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ইরান বলছে, প্রণালিটির জন্য নতুন একটি আন্তর্জাতিক নৌপথের মানচিত্র শিগগিরই অনুমোদন করা হবে।
রেজাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন নৌপথটি ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে এবং এর ব্যবস্থাপনায় ইরানের ভূমিকা থাকবে। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, হুমকি ও কথিত নাশকতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত রাখার নিশ্চয়তা ইরান দেবে না বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
আবার বাড়ছে পাল্টাপাল্টি হামলা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আগস্টের বেশির ভাগ সময় সামরিক তৎপরতায় বিরতি থাকলেও সম্প্রতি আবার পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা অবরোধ কার্যকর রাখতে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর আঞ্চলিক মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র শনিবার তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচল তলানিতে
হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। সাম্প্রতিক ১০ দিনে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। কয়েক মাসের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন পর্যায়।
সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এর প্রভাবে সোমবারও অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।![]()
নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অর্থনীতি
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও তেল রপ্তানির ওপর অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, মুদ্রার অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও বাজার ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে পরিস্থিতির নিয়ম বদলে গেছে। ইরানের স্বার্থ ও নিরাপত্তার ওপর যেকোনো হামলার জবাব আরও দ্রুত ও কঠোরভাবে দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
তবে ইরানের অর্থমন্ত্রী আলি মাদানিজাদেহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরান তার নীতি পরিবর্তন করবে না। দেশের অর্থনীতি সংস্কারের দায়িত্ব ইরান সরকার ও জনগণের—যুক্তরাষ্ট্রের নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খার্গ দ্বীপেও বাড়ছে ঝুঁকি
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ খার্গ দ্বীপের রপ্তানি কেন্দ্র দিয়ে বিদেশে যেত। এপ্রিলের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর অবরোধ শুরু করার পর থেকে এই সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ইরানের তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ বলেছেন, গত কয়েক মাসে খার্গ দ্বীপে প্রায় ৫৫০ বার হামলা হয়েছে। তারপরও দ্বীপটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখনো প্রতিদিন ৯০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহন হচ্ছে এবং বিকল্প পাইপলাইনসহ মোট তেল প্রবাহ সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যায়ে রয়েছে।
তবে ইরানের নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চল এবং হরমুজে নতুন নৌপথের ঘোষণা উপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















